News:

Daffodil International University Forum contains information about Open Text material, which is only intended for the significant learning purposes of the university students, faculty, other members, and the knowledge seekers of the entire world and is hoped that the offerings will aide in the distribution of reliable information and data relating to the many areas of knowledge.

Main Menu

হিমোফিলিয়া রোগীর পরিবারগুলোর চাপা কান্না

Started by fatemayeasmin, April 07, 2019, 11:30:52 AM

Previous topic - Next topic

fatemayeasmin


হিমোফিলিয়া হলে কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই হাঁটু, পায়ের গোড়ালি ফুলে যায়। ছবি: হিমোফিলিয়া সোসাইটির সৌজন্যে

২৯ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে সংগ্রামের ইতিহাস শোনালেন বাবা নুরুল ইসলাম। ছেলে হিমোফিলিয়া রোগী। ছেলের শৈশবে এই রোগের নাম শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিল পুরো পরিবার। তবে থমকে যায়নি। এই রোগের ইতিবৃত্ত জানার জন্যই নুরুল ইসলাম গড়ে তোলেন একটি সংগঠন। নাম হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ। বর্তমানে তিনি এ সোসাইটির সভাপতি।

হিমোফিলিয়া হলো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণজনিত জন্মগত রোগ। এটি ছেলেদের হয়। আর মেয়েরা হয় বাহক, অর্থাৎ মেয়েরা জিন বহন করে। মায়ের কাছ থেকে সন্তানদের মধ্যে এর বিস্তার হয়। ছেলের বেলায় রোগটি প্রকাশ পায়। তবে রোগটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক নয়।

নুরুল ইসলামের ছেলে বর্তমানে দেশের বাইরে থাকেন। বিয়ে করেছেন। নুরুল ইসলামের পরিবার এই ছেলের পাশে ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। তবে এ রোগ নিয়ে নুরুল ইসলামের পরিবারের ইতিহাস এখানেই থেমে নেই। তাঁর মেয়ে এ রোগের বাহক। বর্তমানে ৩২ বছর বয়সী মেয়েও দেশের বাইরে থাকেন। এই মেয়ের ছেলেও একই রোগে আক্রান্ত। এ কারণে পরিবারটির সংগ্রাম চলছেই।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, হিমোফিলিয়া রোগীদের রক্তক্ষরণ দীর্ঘক্ষণ ধরে হতে থাকে। রক্ত জমাট বাঁধার উপকরণ ফ্যাক্টর এইটের ঘাটতির জন্য হিমোফিলিয়া 'এ' এবং ফ্যাক্টর নাইনের ঘাটতির জন্য হিমোফিলিয়া 'বি' হয়। বংশানুক্রমের বাইরেও প্রতি তিনজন রোগীর মধ্যে অন্তত একজন নতুন করে আক্রান্ত হয়।

নুরুল ইসলামের সঙ্গে গত মঙ্গলবার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এসেছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করা আবু সায়ীদ আরিফ। প্রথমে মনে হয়েছিল তিনি নুরুল ইসলামের সঙ্গে হয়তো এমনিই সঙ্গ দিতে এসেছেন। তবে জানা গেল অন্য ইতিহাস। আবু সায়ীদের শ্বশুর মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন হিমোফিলিয়া সোসাইটির প্রথম সভাপতি। তিনি নিজেই ছিলেন রোগী। ২০০১ সালে ৫৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি। তবে রোগের ধারাবাহিকতায় মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর মেয়ে হয়েছেন হিমোফিলিয়ার বাহক। অর্থাৎ আবু সায়ীদ ও তাঁর স্ত্রীর তিন বছর চার মাস বয়সী ছেলে হয়েছে রোগী। জন্মের পর ছয় মাস বয়সেই এই বাবা-মা জানতে পারেন ছেলের সমস্যার কথা। তাঁদের আরেক মেয়ে আছে, তবে প্রায় আড়াই বছর বয়সী মেয়ে রোগটির বাহক কি না—তা জানতে যেতে হবে দিল্লি। দেশে এটি জানার কোনো উপায় নেই।

দেশে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো তথ্য নেই। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার জনে একজনের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই হিসাব ধরে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব হিমোফিলিয়ার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১০ হাজার ৬৪০ জনের মতো হিমোফিলিয়া রোগী রয়েছে। তবে হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ এ পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৭০০ জন রোগী চিহ্নিত করে সমিতিতে নিবন্ধন করেছে। অর্থাৎ বেশির ভাগ রোগী চিহ্নিতকরণের আওতার বাইরেই রয়ে গেছে।

ভুক্তভোগী রোগীদের পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হিমোফিলিয়া রোগীর কোথাও কেটে গেলে বা সামান্য আঘাত পেলে এই রোগীর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। কোনো কারণ ছাড়াই হাঁটু, পায়ের গোড়ালি ফুলে যাওয়া, দাঁতের মাড়ি, পাকস্থলী, মস্তিষ্ক, ঘাড়, গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। পেশিতে রক্তক্ষরণের ফলে কালো কালো দাগ দেখা যায়। রোগটির স্থায়ী নিরাময়যোগ্য কোনো চিকিৎসা নেই। তবে উপসর্গের তাৎক্ষণিকভাবে উপশমের ব্যবস্থা আছে। যে ফ্যাক্টরগুলোর ঘাটতির জন্য রোগটি হচ্ছে, তা শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে দিয়ে চিকিৎসা করানো যায়। তবে এ চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অন্যদিকে, যথাযথ চিকিৎসার অভাবে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে বা পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়।


রক্তক্ষরণের ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে কালো কালো দাগ দেখা যায়। ছবি: হিমোফিলিয়া সোসাইটির সৌজন্যে

নুরুল ইসলাম জানান, যেহেতু রোগটি চিহ্নিত হচ্ছে না, ফলে গ্রামাঞ্চলে মনে করা হয় রোগীকে জিন-ভূতে ধরেছে। আর এ ধরনের সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না বলে রোগী একসময় পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবারের বোঝা হয়ে যাচ্ছে।

অভিভাবক হিসেবে অসহায়ত্বের কথা জানালেন আবু সায়ীদ আরিফ। তিনি বললেন, অভিভাবকদের সব সময় সতর্ক থাকতে হয়, যাতে সন্তান কোনোভাবেই ব্যথা না পায়। আর ব্যথা পেয়ে গেলে বা উপসর্গ দেখা দিলে অপেক্ষা করার সময় থাকে না। বিনা মূল্যে ইনজেকশন সব সময় পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও সেই ইনজেকশন কে পুশ করবে, তা নিয়েও চিন্তার অন্ত থাকে না। এ ছাড়া এ রোগে দুটি চিকিৎসাপদ্ধতি আছে। একটি হচ্ছে, রোগীর যে ঘাটতি, তা পূরণে নিয়মিত চিকিৎসা করে যাওয়া। এতে রোগী উন্নত মানের জীবন যাপন করতে পারে। আরেকটি হচ্ছে উপসর্গ দেখা দিলে তার চিকিৎসা করা, এতে রোগীর জীবনধারণ করে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়। খরচের কথা চিন্তা করে বেশির ভাগ অভিভাবককেই উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।

মাত্র ছয়জন রোগী নিয়ে রাজধানীতে হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ (১৫২/১, গ্রিন রোড) ১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু করে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত এ সমিতি ১৯৯৬ সালে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব হিমোফিলিয়ার সদস্যপদ লাভ করেছে। এই সোসাইটি বর্তমানে রোগী চিহ্নিতকরণ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব হিমোফিলিয়া থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া ফ্যাক্টর ইনজেকশন বিনা মূল্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগে সরবরাহের মাধ্যমে রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসকদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণে সহায়তা করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সোসাইটির পক্ষ থেকে হিমোফিলিয়া তথ্য ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করেছে।


হিমোফিলিয়া সোসাইটির সৌজন্যে

সোসাইটির দেওয়া তথ্য বলছে, এখানে নিবন্ধিত রোগীর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারে। সেটিও শুধু রোগীর বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই। এই রোগের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হিমোফিলিয়া সোসাইটি প্রতিবছর ১৭ এপ্রিল হিমোফিলিয়া দিবস পালন করে।

হিমোফিলিয়া সোসাইটির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৯২ জন হেমাটোলজিস্ট চিকিৎসক আছেন। কোনো চিকিৎসকের পক্ষে এই রোগীদের এককভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব না। ফিজিওথেরাপিস্টসহ পুরো একটি দলের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন হয়, যা দেশের রোগীরা পাচ্ছেন না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ও হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক এম এ খান প্রথম আলোকে বলেন, হিমোফিলিয়া রোগটি একটি বংশগত রোগ এবং রোগীকে জীবনব্যাপী চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। তবে এ রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এখন পর্যন্ত সরকারি খরচে রোগীরা চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে না। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে বারবার বিষয়টি জানানো হচ্ছে। কেননা সরকারের উদ্যোগ ছাড়া এ রোগীর চিকিৎসা করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব না। উন্নত বিশ্বে সরকারের পক্ষ থেকে এই রোগীরা যাতে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পায় তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে।

হিমোফিলিয়া সোসাইটির পক্ষ থেকে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সহায়তা চেয়ে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। লিখিত ওই আবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবে সোসাইটি আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারি খরচে হিমোফিলিয়া রোগীদের চিকিৎসাব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন, যা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বাজেটে বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর নিবন্ধন করে সরকারিভাবে চিকিৎসার সুযোগ থাকলে ভুক্তভোগী রোগী ও পরিবারগুলোর ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমত।