যেভাবে রাসুল (সা.) মেরাজে গেলেন

Author Topic: যেভাবে রাসুল (সা.) মেরাজে গেলেন  (Read 559 times)

Offline shilpi1

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 135
    • View Profile
নবুওয়াত প্রাপ্তির ১০তম বছর। রজব মাসের ২৭ তারিখ রাত। নিরব নিঝুম মক্কা নগরী। হযরত খাদীজা ও আবু তালেবের মৃত্যুতে মানসিকভাবে বেদনাহত প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সা.)।

দিনদিন বেড়ে চলেছে কুরাইশদের নির্যাতন-নিপীড়ন। এমন দুঃখ ঘেরা দুঃসময়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্রাম করছিলেন হযরত উম্মে হানী (রা.) এর ঘরে।

ঘরের ছাদ অবিশ্বাস্যভাবে খণ্ডিত হলো। নেমে এলেন চিরচেনা জিবরাইল। সঙ্গে হযরত মিকাইল (আ.)। তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে গেলেন মসজিদে হারামে কাবার কাছে। সেখান থেকে যমযম কূপের কাছে। দুই ফেরেস্তা মিলে বিদীর্ণ করলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্ষ মুবারক। আত্মাকে ধুয়ে দেওয়া হলো যমযমের পানি দিয়ে। সঙ্গে নিয়ে আসা একটি স্বর্ণের পেয়ালায় রাখা ঈমান ও হিকমত ঢেলে দেওয়া হলো তার মনোজগতে। মেরাজে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি আপাতত সম্পন্ন।

প্রস্তুত বোরাক। কাবার আঙিনা থেকে তিনি আরোহণ করলেন বোরাকের পিঠে। খচ্চরের চেয়ে আকারে খানিক বড় এবং গাধার চেয়ে কিছুটা ছোট আকৃতির বেহেশতী বাহন। দৃষ্টির সীমানা পর্যন্ত তার এক কদমের গতি। রাসুল তার পিঠে বসলেন। বোরাক ছুটে চললো মসজিদে আকসার দিকে। ইসলামের প্রথম কিবলা রাসুলের আগমনে ধন্য হলো। সেখানে দু রাকাত নামাজ। তারপর ঊর্ধ্বাকাশে রওনা। সঙ্গী শুধুই জিবরাইল। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রথম আকাশ। জিবরাইল এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেমে গেলেন ফটকের কাছে। পরিচয় নিশ্চিত হয়ে প্রবেশের অনুমতি। এভাবে পরিচয় প্রদানের প্রক্রিয়া চললো সাত আসমানের সাতটি স্তরে। দেখা হলো নবীদের সঙ্গে। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.) এর সঙ্গে, দ্বিতীয় আসমানে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে, তৃতীয় আকাশে হযরত ইউসুফ (আ.) এর সঙ্গে, চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরীস (আ.) এর সঙ্গে, পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ.) এর সঙ্গে, ষষ্ঠ আকাশে হযরত মূসা (আ.) এর কাছে আর সর্বশেষ আকাশে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সঙ্গে- একে একে সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন হযরত জিবরাইল (আ.)। সালাম দিচ্ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাক্ষাৎ হওয়া নবীরা সবাই ‘স্বাগতম হে নেককার ভাই, নেককার নবী’ বলে অভ্যর্থনা জানালেন কুল মাখলুকাতের শ্রেষ্ঠতম মানুষটিকে।

আসমানি স্তরসমূহে সাক্ষাৎ পর্ব শেষ। এবার জিবরাইল নিয়ে গেলেন সিদরাতুল মুনতাহা দেখাতে। আকাশের ঊর্ধ্বজগতে বিস্ময়কর একটি গাছ। মুসলিম শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, উপরজগত থেকে যেসব হুকুম অবতীর্ণ হয়, সেগুলো প্রথমে সিদরা নামক এ গাছ পর্যন্ত আসে। তারপর সেখান থেকে ফেরেশতারা সেগুলো পৃথিবীতে পৌঁছে দেন। একইভাবে দুনিয়া থেকে যেসব নেক কিংবা বদ আমল ঊর্ধ্বজগতে যায়, সেগুলোও প্রথমে সিদরা পর্যন্ত গিয়ে থেমে যায়। তারপর সেখান থেকে উপরজগতে উঠিয়ে নেওয়া হয়। উপরজগত এবং এই নিচের ভূমণ্ডল এ দুইয়ের মাঝে এ গাছটিই যেন সীমানা। এই সিদরার ওপারের কেউ নিচে নামেন না এবং নিচের কেউ সিদরা পার হতে পারেন না।

তিরমিযী শরীফে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া আর কেউ আজ পর্যন্ত এর ওপরে যেতে পারেননি। এক বর্ণনায় এসেছে, সিদরার ওপারে সারা দুনিয়ার সমগ্র বিদ্যা ও জ্ঞানের পরিসমাপ্তি। এর ওপর জগতে কী রয়েছে ফেরেশতারাও তা জানেন না। যেহেতু এ গাছের মাধ্যমেই ওপর এবং নিচের জগতের ব্যবধান করে দেওয়া হয়েছে, কাজেই তাকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ বলা হয়।

সিদরাতুল মুনতাহা, আকাশের কেবলা বায়তুল মামুর, মাকামে মুসতাওয়া, বিস্ময়কর চারটি প্রবাহিত ঝর্ণাধারাসহ আল্লাহ পাকের অসীম কুদরতের নানা নিদর্শন দেখা শেষ হলো। জান্নাত দেখানো হলো, জাহান্নাম এবং এর কিছু শাস্তির বাস্তব নমুনাও দেখলেন আজকের সম্মানিত অতিথি, এ পরিভ্রমণের মধ্যেই শুনলেন ভাগ্যলিপি লেখার কলমধ্বনি। জিবরাইলের সঙ্গলাভ এখানেই সমাপ্তি। বোরাক বাহনেরও এখানে যাত্রাবিরতি।

নেমে এল নতুন বাহন। এর নাম রফরফ। সামনে শুধুই নূরের পর্দা। রহস্যময় গহীন জগৎ। ভয় পাচ্ছিলেন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। রফরফ ছুটলো প্রচণ্ড দ্রুততায়। হাজার হাজার নূরের পর্দা হারিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টির সীমানায়। থেমে গেল রফরফ। ভয় ও আনন্দ এবং কৃতজ্ঞতায় অবনত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় মাথা নত করলেন। এক মহান শক্তিমান পরম রবের একান্ত নৈকট্য ও সান্নিধ্যের বিরল ও দুর্লভ সম্মানে তিনি ভূষিত হলেন। আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে তার প্রিয়তম ও সম্মানিত অতিথির জন্য উপহার দেওয়া হলো। বিনয়মাখা কৃতজ্ঞতায় এসব গ্রহণ করলেন প্রিয়তম নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীনসহ জমহুরে উলামায়ে কেরামের মতে- রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ পাককে নিজের চর্মচোখে দেখেছেন। এ মতটিই মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সত্য। কারণ এক হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন? তখন তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি মিরাজের রাতে আমার রবকে দেখেছিলাম।

মুসনাদে ইমাম আহমদে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি আল্লাহ পাককে দেখেছি। খাসায়েসে কুবরা, ইমাম তাবরানী এবং হাকীম তিরমিযী হযরত আনাস রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি সুমহান নূর তথা আল্লাহ পাকের নূর দেখেছি। তারপর আল্লাহ পাক কোনো মাধ্যম ছাড়াই আমার কাছে ওহী পাঠালেন (আমার সঙ্গে কথা বললেন)।

ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু এর একটি মারফু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মিরাজের রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বচক্ষে এবং আত্মিকভাবে- দুইভাবেই তিনি আল্লাহ পাকের দর্শন লাভ করেছেন। তবে মহান আল্লাহ পাক নিজের কুদরতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চোখের দেখা এবং হৃদয়ের অনুভবকে এতোই একাত্ম করে দিয়েছিলেন যে, দুটোর মধ্যে কোনো তফাত ছিল না। (সীরাতুল মুস্তফা-১/৩২২)

হযরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে জানা যায়, আল্লাহ পাক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে এ কথোপকথনে তাকে বললেন, ‘আমি আপনাকে আমার হাবীব এবং খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছি। সমগ্র মানবজাতির জন্য আপনাকে সুসংবাদবাহক এবং ভীতিপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছি। আপনার হৃদয়কে প্রশস্ত করে দিয়েছি এবং আপনার বোঝা হালকা করেছি। আপনার আওয়াজকে সমুন্নত করেছি। আমার তাওহীদের সঙ্গে আপনারও রিসালাত এবং আবদিয়্যাত এর উল্লেখ করা হয়। আপনার উম্মতকে আমি সর্বোত্তম উম্মত, মধ্যমপন্থি উম্মত, ন্যায়পন্থি উম্মত বানিয়েছি। সম্মান ও মর্যাদার বিচারে আপনার উম্মতকে অগ্রগামী এবং প্রকাশ ও অস্তিত্বের বিচারে উত্তরসূরি বানিয়েছি। আপনার উম্মতের কিছু লোককে আমি এমনভাবে সৃষ্টি করেছি যাদের হৃদয়টাই ইঞ্জিল হয়ে থাকবে (অর্থাৎ তাদের অন্তর এবং হৃদয়জগতজুড়ে আল্লাহ পাকের কালাম লেখা থাকবে)। আপনার অস্তিত্ব এবং উপস্থিতিকে আমি নূর ও রূহ হিসেবে সর্বপ্রথম নবী হিসেবে সৃষ্টি করেছি আর প্রেরণ হিসেবে সর্বশেষ নবী বানিয়ে পাঠিয়েছি। আপনাকে সূরা ফাতেহা এবং সূরা বাকারার শেষাংশ দান করেছি, যা আপনার আগের কোনো নবীকে দেইনি। আমি আপনাকে হাউজে কাউসার দিয়েছি এবং আপনার উম্মতকে বিশেষ আটটি বিষয় দান করেছি, উপাধি হিসেবে ইসলাম এবং মুসলমান, হিজরত, জিহাদ, নামাজ, সদকা, রমজানের সিয়াম, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ, আপনাকে বিজয়ী এবং খাতামুল আম্বিয়া বানিয়েছি (অর্থাৎ নবী হিসেবে সর্বপ্রথম এবং শেষ হিসেবে সম্মানিত করেছি)।’

মুসলিম শরীফের হাদীস অনুযায়ী, আল্লাহ পাক তখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিন ধরনের নেয়ামত দান করেছেন। নামাজ, সূরা বাকারার শেষ আয়াতের বিষয়বস্তু দান করেছেন। এ বিষয়গুলোতে আল্লাহ পাক এ উম্মতের জন্য তার রহমত, করুণা, অনুগ্রহ, সহজ হুকুম এবং ক্ষমা ও মাগফিরাতের পাশাপাশি কাফেরদের বিপক্ষে বিজয় এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দান করেছেন। এ বিষয়গুলোকে দু’আর বর্ণনাভঙ্গিতে এ উম্মতকে শেখানো হয়েছে। যেন এর মধ্যে বলে দেওয়া হয়েছে, সূরা বাকারার শেষে যে দুআ তোমাদের তালকীন দেওয়া হয়েছে সেগুলো তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা করো, আমি তোমাদের এ দুআ এবং প্রার্থনা কবুল করবো।
ফিরতি পথে দেখা হলো হযরত মূসার (আ.) সঙ্গে। পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম শুনে সচকিত হলেন তিনি। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, এতগুলো পারবেনা আপনার উম্মত। যান, রবের কাছ থেকে কমিয়ে নিয়ে আসুন। বারবার ঘটতে থাকলো একই ঘটনা। পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে হ্রাস হতে হতে শেষ পর্যন্ত বাকি থাকলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। মূসা নবী এবারও তাকে কমিয়ে আনতে বললেন। মুখ খুললেন আমাদের নবী। তিনি জানালেন, ‘আবারও যেতে আমার লজ্জা হচ্ছে।’ এভাবেই হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সূচনা। সঙ্গে অবতীর্ণ হলো পাঁচ ওয়াক্তের নামাজে ‘পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব’ প্রাপ্তির ঘোষণা।

খুব সংক্ষেপে এটাই মিরাজের সংকলন ও বর্ণনা। মিরাজ বা ইসরার এ মহিমান্বিত ভ্রমণের প্রতিটি স্তর ও ঘটনায় অনেক ইশরা ও শিক্ষা লুকিয়ে রয়েছে। প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী ও প্রিয় চাচার মৃত্যুতে শোকাহত এবং এরপর তায়েফ থেকে রক্তাক্ত হয়ে ফিরে আসা আহত নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে এ মিরাজ সবচেয়ে মূল্যবান সম্মান। অন্য সব নবীর সঙ্গে এখানেই নির্ণিত হয় তার ঈর্ষণীয় পার্থক্য ও অবস্থান। মিরাজের পরপরই তিনি হিজরত করেন। অবসান হয় মক্কী জীবনের যন্ত্রণাময় অসহনীয় সময়, মদীনার মানুষের অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তায় সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়। এরপরের ইতিহাস শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। যুগ যুগ পরও আজও মিরাজ রজনীর সেই পবিত্র উপহার নামাজ বিশ্ববাসী মুসলমানের জন্য অমূল্য উপহার।