নাই-বা হলো মিছিল!

Author Topic: নাই-বা হলো মিছিল!  (Read 769 times)

Offline maruppharm

  • Hero Member
  • *****
  • Posts: 1227
  • Test
    • View Profile
নাই-বা হলো মিছিল!
« on: November 11, 2013, 11:59:16 AM »
সামান্য শোরগোল শুনেই কারও চোখ হয়তো গেছে রাজপথে। না, মনের ভুল। এ আসলে হরতালে হেঁচকি তোলা কিছু সাধারণ মানুষের পথচলতি আওয়াজ। বিজয় মিছিল হয়নি। ক্রিকেটে অসাধারণ কিছু করলে না হয় সেটা হতে পারত (না, নিউজিল্যান্ডকে ধবলধোলাই করলেও হবে না)। কে একজন সিদ্দিকুর রহমান দিল্লিতে কী করেছেন, তাতে ঢাকার রাজপথ গরম কেন হবে?
খেলাটা গলফ। প্রায় ৯০ শতাংশ বাংলাদেশির কাছে অপরিচিত। এই খেলাটা খেলেন বলেই ক্রিকেটার সাকিব-তামিম-নাসিরদের মতো তারকাদ্যুতি সিদ্দিকুর রহমানের গায়ে নেই। খুবই স্বাভাবিক, দিল্লিতে কাল তিনি যখন হিরো ওপেন গলফের শিরোপা জিতলেন, সারা দেশে আনন্দের হিল্লোল বইল না। কিন্তু জাতীয় পতাকাটা ঠিকই গৌরব বোধ করল। ক্রিকেটাররা খেলেন একটা দল হিসেবে, ফুটবলাররাও তা-ই, গোটা দল বহন করে জাতীয় পতাকা। গলফে একাই জাতীয় পতাকা বহন করেন সিদ্দিকুর। কাল যেমন হিরো ওপেনের ভাষ্যকারেরা বারবার তাঁকে বলছিলেন, বাংলাদেশের পতাকাবাহক (ফ্ল্যাগ বেয়ারার অব বাংলাদেশ)! আর কী অসাধারণভাবেই না লাল-সবুজ পতাকাকে চার দিন ধরে সবচেয়ে উঁচুতে রাখলেন সিদ্দিকুর।
সাড়ে ১২ লাখ ডলার পুরস্কার মূল্যের এই টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ড অর্থাৎ ৭ নভেম্বর প্রথম দিনটি সিদ্দিকুর শেষ করেছিলেন শীর্ষে থেকে। খেলেছিলেন পারের চেয়ে ৬ শট কম (৬৬ শট)। দ্বিতীয় রাউন্ডেও তা-ই। তৃতীয় রাউন্ডে খেলেছেন ৬৭ শট, কিন্তু শীর্ষচ্যুত হননি। কাল চতুর্থ রাউন্ড মানে চতুর্থ বা শেষ দিনের খেলাই ছিল তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, ২০১০ সালে ব্রুনাই থেকে প্রথম এশিয়ান ট্যুর জয়ের পর আর কোনো শিরোপা জিততে পারছিলেন না শেষ দিনটা খুবই বাজে হয়ে যাচ্ছিল বলে। কালও নিজের সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স হলো তাঁর। ১৮ হোল শেষ করতে পারের চেয়ে বেশি খেললেন ৩ শট (৭৫)। কিন্তু শিরোপাকে দূরে যেতে দেয়নি আগের তিন রাউন্ডের দুর্দান্ত ফল। সব মিলিয়ে পারের চেয়ে ১৪ শট কম খেলে জিতলেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পেশাদার শিরোপা, ভারতেরই এসএসপি চৌরাসিয়া ও অনির্বাণ লাহিড়িকে মাত্র এক শটের ব্যবধানে হারিয়ে।

শেষ রাউন্ডের খেলাটা ছিল চরম নাটকীয়। শীর্ষে থেকেই শুরু করেন সিদ্দিকুর, পারের চেয়ে ১৭ শট কম, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চৌরাশিয়া ৪ শট পিছিয়ে। বরাবরের মতোই আক্রমণাত্মক শুরু। শুরুটা ভালো হলেও তাড়াহুড়োয় ১৫তম হোলে লাগিয়ে ফেলেন ৭ শট। স্কোর সমান হয়ে যায় অন্য তিনজনের সঙ্গে। ১৭ নম্বর হোলে দারুণ একটা বার্ডি করে আবার শীর্ষে উঠে আসেন। অনির্বাণ লাহিড়ি ও চৌরাসিয়া দ্রুতই উঠে আসছিলেন তাঁর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে। এক শট কম খেলে শেষ করেন অনির্বাণ। চৌরাসিয়া ১৮তম বা শেষ হোলটিতে একটি বার্ডি করলেই ছুঁয়ে ফেলেন সিদ্দিকুরকে, কিন্তু তিনি মাত্র চার ফুট দূর থেকে বার্ডি করতে পারলেন না। পারলে দুজনের শট হতো সমান, তখন শিরোপা নির্ধারিত হতো প্লে-অফে। সিদ্দিকুর শেষ বা ১৮তম হোলে পারের সমান শট খেলেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যান। ব্যবধান মাত্র এক শটের! সিদ্দিকুর ১৪-আন্ডার ২৭৪, অনির্বাণ ও চৌরাসিয়া ১৩-আন্ডার ২৭৫।

হোক এক শটের ব্যবধান। তার পরও তো দিল্লির এই টুর্নামেন্টে উড়ল বাংলাদেশের বিজয় পতাকা। এই জয়ের মাহাত্ম্য ২ লাখ ২৫ হাজার ডলার পুরস্কার (১ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা) বা রাজপথের মিছিলে মাপা যাবে না। বিশ্বের গলফ মানচিত্রে বাংলাদেশকে এটি চেনাবে সগৌরবে। কে জানে, এ মাসেই (২১-২৪ নভেম্বর) অস্ট্রেলিয়ায় গলফের বিশ্বকাপে আরও উঁচুতে পতাকা ওড়ানোর আত্মবিশ্বাসটা হয়তো দিল্লিতেই পেয়ে গেলেন। সেই আশাবাদই শোনা গেল বাংলাদেশের সেরা গলফারের কণ্ঠে, ‘এটা আমাকে বিশ্বকাপ গলফে ভালো করতে অনেক সাহায্য করবে।’

এ বছর এর আগে দুবার দিল্লি গলফ ক্লাবে খেলেছেন। ফল ভালো হয়নি। সেইল ওপেনে হয়েছিলেন তৃতীয়, প্যানাসনিক ওপেনে দশম। তাই এবার যাওয়ার আগে জয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেননি। শুধু বলে গিয়েছিলেন, ‘খেলার স্টাইলটা বদলেছি। দেখা যাক কী হয়!’ সেই ‘কী হয়’টা শেষ পর্যন্ত ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পেশাদার শিরোপা হয়ে ধরা দিল। ২৯ বছর বয়সী গলফারের শিরোপা ক্যারিয়ারের হয়তো বাঁক বদলে দিল এটা। টুর্নামেন্টে শুরু করেছিলেন এশিয়ার অর্ডার অব মেরিটে নয়ে থেকে, উঠে গেলেন তিনে।

র‌্যাঙ্কিংয়ে এই উল্লম্ফনের চেয়েও বড় সত্যটা হলো, সিদ্দিকুর এখন বদলে যাওয়া খেলোয়াড়। আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। ঝুঁকিহীন খেলে প্রাইজমানি পাওয়ার চিন্তা করেন না। এখন জয়ই পাখির চোখ। তাই বেশি অনুশীলন বাদ দিয়ে নিজের শক্তি ধরে রাখার দিকে জোর দিচ্ছেন। কোচ চোনরাত সাসিওয়াংয়ের কড়া নির্দেশে প্রতিদিন ভোরে যাচ্ছেন জিমে।

২০১০ সালে ব্রুনাই ওপেন জয়ের পর তিনটি বছর ছিলেন শিরোপাশূন্য। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিলেন। আর কখনো শিরোপা  জেতা হয় কি না সংশয় এসে পড়েছিল। অবশেষে ইন্ডিয়ান ওপেনের সুবর্ণজয়ন্তীতে আবার দেখলেন সাফল্যের সরণি। ‘আমি ভীষণ খুশি আজকের এই জয়ে। ব্রুনাইতে জয়ের পর সত্যিই আরেকটা জয়ের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিলাম, এই সপ্তাহটা আমার জীবনের সেরা সময়’—এটা টুর্নামেন্টের শেষ হোলের স্নায়ুকাতর সিদ্দিকুর নন, বুকের পাথরভার নেমে যাওয়া একজন চ্যাম্পিয়ন গলফার। যাঁর মধ্যে অনেকেই দেখছে বাংলাদেশের ‘টাইগার উডস’কে। দেখছে এক জীবনযোদ্ধাকে—যিনি পৃথিবীর উচ্চবিত্ত খেলাটিকে এনে তুলেছেন এই ‘নিম্নবিত্ত’ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে।

শুরুতে বলবয়, একটা রড দিয়ে বানানো ক্লাব (স্টিক) নিয়ে গলফ কোর্সে পা ফেলা। ২০০৭ সালে পেশাদার সার্কিটে নামা। তারপর...দুটি পেশাদার শিরোপা। সিদ্দিকুর এ দেশের এক রূপকথার নায়ক। রাজপথে তাঁর সাফল্যে নাই-বা হলো মিছিল!
Md Al Faruk
Assistant Professor, Pharmacy