সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা – একটি স্বকীয়ভাবধারা জাতিব্যবস্থার অত্যাবশ্যকীয় কাঠামো

Author Topic: সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা – একটি স্বকীয়ভাবধারা জাতিব্যবস্থার অত্যাবশ্যকীয় কাঠামো  (Read 605 times)

Offline najnin

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 134
  • Test
    • View Profile
কয়েকমাস আগে নীলক্ষেতে পুরাতন বই-এর দোকানে পেয়ে গেলাম ডঃ সিকান্দার আলি ইব্রাহীমের ‘রিপোর্টস অন ইসলামিক এডুকেশান এন্ড মাদ্রাসা এডুকেশান ইন বেঙ্গল’ বইটির পঞ্চম খন্ড। সেখানে অন্যান্য খন্ডগুলোতে কি কি আছে তাও বলা আছে। মোট পাঁচখন্ডে ১৮৬১ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ইসলামিক শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সরকারের মোট ৪০টি শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

মূল ইতিহাসটা এরকম। বৃটিশরা আসার পর মাদ্রাসাশিক্ষা তুলে দিতে চেয়েছিল বেঙ্গল সরকারের ডিরেক্টর। কিন্তু ভারত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত প্রিন্সিপাল লি এর বিপরীতে ছিলেন। ১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত নানা বিতর্ক হয়েছিল এ নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ১৮৬১ সালে এসে তারা সবাই সমঝোতায় পৌঁছালেন যে মাদ্রাসা শিক্ষা থাকবে, কিন্তু সেখানে আধুনিক শিক্ষাও সন্নিবেশিত হবে। এছাড়াও অবলুপ্ত হলো ফার্সি, চালু হলো ইংরেজী। বৃটিশ কোম্পানী কর্তৃক শাসিত ভারতে তারা নতুনভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে এমনভাবে যার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘ভারতীয় রক্ত-মাংসের মানুষ, কিন্তু রুচি, চিন্তা-চেতনায় হবে ইংরেজ’ এমন এক জাতি। বলাই বাহুল্য, যেকোন দেশের শিক্ষাব্যবস্থাই ঠিক করে দেবে সেদেশের মানুষগুলো কেমন হবে। বৃটিশরা ঠিক সেই কাজটিই করেছে এবং তাতে যে তারা ১০০শতভাগ সফল এটা বলার আর কোন অপেক্ষা রাখে না। কারণ, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের কাঠামোতেই তৈরি হয়েছে স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা। সেই সুবাদে বর্তমান বাংলাদেশেও তাই। এজন্যে আমরা এখনো রক্ত মাংসে বাঙালী, কিন্তু রুচি, চিন্তা-চেতনায় বৃটিশ বা ইউরোপীয়ান। হাল আমলে যুক্ত হয়েছে আমেরিকান সংস্কৃতি, এছাড়াও রয়েছে ভারতের আঞ্চলিক হিন্দী সংস্কৃতির প্রভাব। নিজেদের যেটুকু বাঙ্গালীত্ব বা মুসলমানিত্ব বা হিন্দুত্ব তা দিনে দিনে কেবল খুইয়েই চলেছি। আমরা এখনো আমাদের নিজস্ব হতে পারিনি।

গত কয়দিন ধরে পড়ছিলাম চাণক্য সেনের উপন্যাস ‘পিতা পুত্রকে ‘। বইটিতে ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৭ সালের ভারতের রাজনীতির অনেক কথাই উঠে এসেছে পুত্রকে বলা পিতার বয়ানে। পিতা সেখানে ততকালীন বৃটিশ-ভারতীয় পত্রিকা স্টেটসম্যানের একজন সাংবাদিক। পরবর্তীতে অন্য একটি পত্রিকার সম্পাদক। বইটির শেষ পৃষ্ঠায় একটি গুরুত্বপুর্ণ ইতিহাসবিষয়ক মন্তব্য ছিল। বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র আমেরিকাই পেরেছিল মাদার কান্ট্রির কৃষ্টি-কালচার বদলিয়ে নিজের মতো শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতি গড়ে তুলতে। অন্যান্য আর অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো আমরা ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশও পারিনি বৃটিশ ধারা থেকে বেরোতে। ইন ফ্যাক্ট আমরা সেটা চাইনি, আজো চাইনা। আজো আমরা কতটা ইংরেজ হতে পারবো, কতটা পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ধারণ করতে পারবো তারই প্রতিযোগিতা করি এবং এক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়াদের করতালি দেই, পুরষ্কৃত করি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর আমরা বাংলা ভাষাতে সবকিছু ট্র্যান্সলেট করতে চেয়েছি, কিন্তু কোন বাঙালী সিস্টেম চালু করার চিন্তা করিনি, চালু হয়নি কোন বাংলা আইন। মুসলিম আইন কেবল পারিবারিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। আজকাল সম্পত্তির বিষয়েও আমরা বৃটিশ বা আমেরিকানদের অনকরণ করতে চাইছি। আমাদের বাঙালী পরিচয়ের বাইরে যে মুসলিম বা হিন্দু পরিচয় আছে সেটা খুব বেশি মাত্রাতেই উপেক্ষিত। হ্যাঁ, এটাই সত্যি। বৃটিশরা চালু করেছিল সেকুলার এবং ইসলামিক নামক দুটো শিক্ষাব্যবস্থা। আমরা ১৯৪৭ সালের পর থেকে ২০১৩, প্রায় ৬৫ বছর পরেও দুটো ভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার উপরেই আছে। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২-৭৪ সালে করা ডঃ কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশনে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করে তাকে সাধারণ সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার করার প্রস্তাব করা হয়েছে, ধর্মীয় শিক্ষাকে মাধ্যমিক স্তরে ঐচ্ছিক করার সুপারিশ করা হয়েছে, কিন্তু বাংলা, ইংরেজি, গণিতকে আবশ্যিক করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে সাধারণ স্কুল, মাদ্রাসা সবখানেই সাধারণ স্কুলের প্রাথমিক সিলেবাসকেই অনুসরণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ সেই সাধারণ শিক্ষার সিলেবাসে ধর্মীয় স্পিরিচুয়াল শিক্ষার অনুপস্থিতি খুবই প্রকট। কেবল দুনিয়াবী শিক্ষাটার উপরেই জোর দেয়া হয়েছে, এবং মাদ্রাসাগুলোর ধর্মীয় শিক্ষাকে কেবল বৃত্তিমূলক শিক্ষা হিসেবে চালু রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এটা যে পুরোমাত্রায় সেকুলার শিক্ষাপদ্ধতি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে ওআইসির পক্ষ থেকে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর উপর জোর তাগিদ দেয়া হচ্ছিল। সব মুসলিম দেশের নেতারা বুঝতে পারছিল তাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি সম্বন্ধে। এই শিক্ষাব্যবস্থা যে ইসলামের মূল স্পিরিট থেকে মুসলিম মননকে আলাদা করে দিচ্ছে এটা সবাই বুঝতে পারছিল। সে সুবাদে ১৯৭৭ সালে ডঃ বারীর শিক্ষা কমিশন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরামর্শে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখে যে রিপোর্ট দেয়, সে অনুযায়ী গঠন করা হয় কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে অনার্স লেভেলে ফ্যাকাল্টি অফ ইসলামিক স্টাডিজের অধীনে পূর্নাংগ কুরআন হাদীস শেখানো, চর্চা এবং এ নিয়ে গবেষণা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ফ্যাকাল্টি অফ আর্টস-এর অধীনে ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইসলামী অর্থনীতি, মুসলিম প্রশাসনসহ লোক প্রশাসন চালু আছে। এছাড়া বিজ্ঞান ফ্যাকাল্টিসহ প্রতিটি ফ্যাকাল্টির যেকোন বিষয়ের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রথম বর্ষে আরবী ভাষা, বাংলা এবং আরবী ব্যাতীত অন্য যেকোন ভাষা এবং ইসলামী আকীদা-আখলাক এরকম তিনটি বিষয় সম্পন্ন করতে হবে। মোদ্দাকথা, পার্থিব শিক্ষার সাথে ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষার একটা সমন্বয় গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু এই প্রচেষ্টা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে আলাদাই থাকা গেছে, বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেএরপরে কোন সমন্বিত পার্থিব-ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী ভাষা, ইসলামী ইতিহাস এসব কিছু বিষয়ে অনার্স, মাস্টার্স চালু থাকলেও সেখানে সার্বজনীনভাবে চর্চা হয় সেকুলারিজমের। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই অবস্থা। স্কুল-কলেজ-মাদ্রসাগুলোতে এখনো পর্যন্ত আলাদা আলাদা শিক্ষাব্যবস্থাই চালু রয়েছে। এ সরকারের আমলে কম্পিউটার-বিজ্ঞান-গণিত শিক্ষার উপরে জোর দেয়া হলেও ধর্মীয় শিক্ষা সেই ডঃ কুদরত-ই-খুদা কমিশনের মতোই ঐচ্ছিক করে দেয়া হয়েছে। আবার কওমী শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবী উঠছে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধর্মীয় শিক্ষা আরো বেশি বেশি করে চালু করা দরকার, অন্তত শিক্ষাজীবনের প্রথম বার বছরের মধ্যে বাংলা-ইংরেজীর পাশাপাশি আরবী ভাষায় বেশ ভালরকমের ব্যুতপত্তি অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে এটা আমাদের সরকারগুলো এখনো ভালভাবে অনুধাবন করেনি। আমাদের সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ইসলামী আইন, ইসলামী লোকপ্রশাসনব্যবস্থা এসব চালু হয়নি, যার ফলশ্রতিতে আমাদের রাষ্ট্রিয়-সামাজিক ব্যবস্থায়, চিন্তা-চেতনায় এখনো বৃটিশ ভাবধারা বা হাল আমলে আমেরিকান ভাবধারা বা নতুনভাবে সাংস্কৃতিকভাবে হিন্দীর প্রভাব খুব সহজেই আমাদেরকে গ্রাস করছে। এজন্যে আমাদের শিশুরা অনায়াসেই মিথ্যা বলা, অন্যায় চিন্তা করা, ভুল সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে উঠছে, অপসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বা আকৃষ্ট হচ্ছে, শিক্ষিত সার্টিফিকেটধারী হচ্ছে, কিন্তু ঘুষ-দূর্নীতি-অনৈতিকতায় অভ্যস্ত জাতি হিসেবে গড়ে উঠছে। মোদ্দাকথা সকল মুসলিম বা হিন্দু বাঙালী সবাই সঠিক আত্ম-পরিচয়হীনভাবে গড়ে উঠছে। এ অবস্থা দিনের পর দিন চলতে পারে না, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও আমরা আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের একটি পূর্ণাংগ ইসলামিক-আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, এ ব্যর্থতা আমাদের সবার, বিশেষ করে সকল বাঙালী শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিদের, শিক্ষকদের, রাজনীতিবিদদের।