কিংবদন্তি ম্যান্ডেলার জীবনালেখ্য

Author Topic: কিংবদন্তি ম্যান্ডেলার জীবনালেখ্য  (Read 619 times)

Offline diljeb

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 164
    • View Profile
 নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় রাষ্ট্রনায়কদের একজন, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে বহু বর্ণভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, প্রখর রসবোধ, তিক্ততা ভুলে বৈরি প্রতিপক্ষের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মত উদারতা এবং বর্ণাঢ্য ও নাটকীয় জীবন কাহিনী মিলিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

বর্ণবাদের অবসানের পর ১৯৯৪ সালের ১০ মে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। এর মাত্র এক দশক আগেও সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল এক অকল্পনীয় ঘটনা।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৩ সালে তাঁকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।

তরুণ বিপ্লবী
১৯১৮ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম। তার বাবা ছিলেন ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের থেম্বো রাজকীয় পরিবারের কাউন্সিলর। বাবা নাম রেখেছিলেন রোলিহ্লাহলা ডালিভুঙ্গা মানডেলা। স্কুলের এক শিক্ষক তার ইংরেজী নাম রাখলেন নেলসন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার আপামর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘মাদিবা’।

তরুণ বয়সে নেলসন ম্যান্ডেলা চলে আসেন জোহানেসবার্গে, সেখানে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুব শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে।

একই সঙ্গে তিনি কাজ শুরু করেন একজন আইনজীবী হিসেবেও। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা অলিভার টাম্বোর সঙ্গে মিলে তিনি তার অফিস খোলেন জোহানেসবার্গে।

১৯৬০ সালে শার্পভিলে কৃষ্ণাঙ্গ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে ৬৯ জন নিহত হলে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আদৌ আর লাভ হবে কিনা সে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

এ সময় এক বক্তৃতায় নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, সরকার যখন নিরস্ত্র এবং প্রতিরোধবিহীন মানুষের ওপর পাশবিক আক্রমণ চালাচ্ছে, তখন সরকারের সঙ্গে শান্তি এবং আলোচনার কথা বলা নিস্ফল।

এএনসি সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করলে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নেলসন ম্যান্ডেলাকে গ্রেপ্তার করা হয়, বিচারে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার কুখ্যাত রুবেন দ্বীপে তার দীর্ঘ কারাজীবন।

২৭ বছর পর মুক্তি
কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা এবং এএনসির শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ টাউনশিপগুলোতে বর্ণবাদবিরোধী লড়াই অব্যাহত থাকে। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান শ’ শ’ কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ।

নেলসন মানডেলার মুক্তির জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর কারাভোগের পর ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি পান।

সেদিন কারাগারের সামনে দেয়া বক্তৃতায় নেলসন ম্যান্ডেলা তার সমর্থকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন সেই কথা, যা তিনি তাঁর বিচারের সময় আদালতে বলেছিলেন।

মান্ডেলা বলেন, এমন এক দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে সব জাতি, সব বর্ণের মানুষ সমান সুযোগ নিয়ে এক সঙ্গে থাকতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘এটা এমন এক আদর্শ, যেটির আশায় আমি বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু যদি দরকার হয়, এই আদর্শের জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।’

পুরনো দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেছনে ফেলে নতুন আফ্রিকা গড়ার কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা অতীতের তিক্ততার প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে তার সাবেক শ্বেতাঙ্গ নিপীড়কদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেন। শুরু হলো এক নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার পথ চলা।

মুক্তির পর দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের সঙ্গে নতুন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হয়, যেখানে সব বর্ণ এবং সব জাতির সমানাধিকার থাকবে। এর পথ ধরেই ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা।

রাজনৈতিক জীবনের মতো, নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রথমবারের মত বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার প্রথম স্ত্রী ইভলিন মেস। কিন্তু এই বিয়ে বেশিদিন টিকেনি।

দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা উইনি ম্যান্ডেলার সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তটি ছিল তার জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তগুলোর একটি। ৮০তম জন্মদিবসে তিনি তৃতীয়বার বিয়ে করেন মোজাম্বিকের সাবেক ফার্স্ট লেডি গ্রাসা মার্শেলকে।

বিশ্ব শান্তির প্রতীক
অবসরে যাওয়ার পরও নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যস্ততা থামেনি, স্বাধীনতা এবং বিশ্ব শান্তির এক আইকন বা প্রতীকে পরিণত হয়েছেন তিনি। সুতরাং তার ডাক পড়তে থাকে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে।

তার এক ছেলে মারা গিয়েছিলেন এইডসে। এ ঘটনার পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় এইডস প্রতিরোধ এবং এর চিকিৎসা নিয়ে সোচ্চার হন।

বাকি জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি দারিদ্র দূরীকরণ এবং এইডস নিরাময়ের লক্ষ্যে প্রচারণায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

নেলসন ম্যান্ডেলাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাকে কিভাবে মনে রাখলে খুশী হবেন তিনি? তার উত্তর ছিল, ‘আমি চাই আমার সম্পর্কে এ রকম কথাই বলা হোক, এখানে এমন এক মানুষ শায়িত আছেন, যিনি পৃথিবীতে তার কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। আমি চাই এটুকুই বলা হোক আমার সম্পর্কে।’


Source: http://www.rtnn.net//newsdetail/detail/8/10/74547#.UqFei9IW2HY