লাহোর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ ও স্বাধীনতাত্তর বাংলার রাজনীতি

Author Topic: লাহোর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ ও স্বাধীনতাত্তর বাংলার রাজনীতি  (Read 2277 times)

Offline Mohammad Nazrul Islam

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 128
  • Test
    • View Profile
খোন্দকার মোস্তাক আহম্মদ এর শাসনকালঃ-
15 আগষ্ট 1975 সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কতিপয় উচ্চভিলাষী এবং কুচক্রি সেনাকর্মকর্তাদের হাতে স্ব-পরিবারে নিহত হলে তার মন্ত্রীপরিষদের ডানপন্থি সদস্য খোন্দকার মোস্তাক আহম্মদ রাষ্ট্রপতি পদ দখল করেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি দেশে অনিদিষ্টকালের জন্য সামরিক আইন জারি করেন। শেখ মজিবুর রহমানের আমলে নিযোগকৃত মোহাম্মদ উল্লাহকে ‘উপ-রাষ্ট্রপতি’ নিয়োগ করেন। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীপরিষদকেই তিনি পূর্নজীবিত করেন। 1975 সালের 20 শে আগষ্ট ‘এক ফরমান’ বলে ‘দেশের সর্বময় ক্ষমতা দখল করে, দেশের সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি অক্ষুন্ন রাখার ঘোষনা দেন। 1975 সালের 25 আগষ্ট তিনি মুক্তিযুদ্ধের সবাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি উসমানীকে তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্ঠা নিয়োগ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু আমলের সেনাপ্রধান ‘মেজর জেনারেল সফিউল্লাহকে’ অবসরে পাঠিয়ে ‘মেজর জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন। তিনি রক্ষীবাহিনীর বিলুপ্ত ঘোষনা এবং এই সদস্যদের সেনাবাহিনীতে নিয়মিত করেন। তিনি ‘বাকশাল’ ব্যবস্থার বিলুপ্ত ঘোষনা এবং প্রেসিডেন্ট আইন 8 ও 9 অবৈধ ঘোষনা করে এই আইন দ্বারা আপসারনকৃত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাজে যোগদানসহ দলীয় বিবেচনায় জেলাপর্যায়ে নিয়োগকৃত 61জন ‘জলাপ্রশাসকের নিয়োগ বাতিল ঘোষনা করেন। তিনি 1976 সালের 15 আগষ্ট থেকে দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রমচালু এবং 1977 সালের 28শে ফ্রেরুয়ারী ‘জাতীয় সংসদের’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষনা দেন। তিনি সামরিক আইনের অযুহাতে আওয়ামীলীগের চার শীর্ষস্থানীয় নেতা অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের কর্নধার জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দিন আহম্মদ, জনাব মনসুর আলী, এবং জনাব এ.এইচ. এম কামরুজ্জামনকে গ্রেফতার করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকারিদের রক্ষায় 1975 সালের 26শে সেপ্টেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করেন এবং বঙ্গবন্ধুর অধিকাংশ খুনিদের বিদেশ পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারির ক্ষেত্রে খোন্দকার মোস্তাক সরকার মূলতঃ রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেন। 1975 সালের 3 নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীন থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ চার নেতা বঙ্গবন্ধ আমলের উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহম্মদ, প্রধানমন্ত্রী জনাব মনসুর আলী, এবং শিল্পমন্ত্রী জনাব এ.এইচ. এম কামরুজ্জামন নৃশংসভাবে নিহত হন। এই নৃশংস হত্যাকান্ডের মোস্তাকের মন্ত্রীসভার সকল সদস্যই হতভম্ব হন এবং মোস্তাকের ব্যাপক সমালোচনা করতে থাকেন। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর মধ্যেও বিরুপ প্রতিক্রয়ার সৃষ্টি হয় এবং সেনাবাহিনীর শৃংখলা ও ঐক্য ভেঙ্গে পড়লে বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশারফ এবং কর্নেল শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে একদল বিদ্রোহী সেনা ঘোষনা করা হয় যে, সেনাবাহিনীর ‘চিফ অব ষ্টাপ পদ থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান পদ ত্যাগ করেছেন এবং বিগ্রেডিয়ার জেনারেল খালিদ মোশারফকে মেজর জেনারেল পদে উন্নিত করে সেনাবাহিনীর ‘চিফ অব ষ্টাপ নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। 3রা আগষ্ট মোস্তাক ক্ষমতা চ্যুত হন এবং 1975 সালের 15ই আগস্টের বিদ্রোহী সেনা সদস্যরা কার্যতর ‘বঙ্গবভনে’ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয় এবং বিচারপতি জনাব আবু সাদাত মোঃ সায়েমকে ‘রাস্ট্রপতি’ ঘোষনা করেন। বিচারপতি আবু  সাদাত মোঃ সায়েম 6 নভেম্বর ‘রাষ্ট্রপতি পদে শপথ গ্রহন করেন। শপথ গ্রহনের কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি ‘জাতীয় সংসদ বাতিল ঘোষনা করেন এবং 1977 সালের ফ্রেরুয়ারী মাসে সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষনা দেন।  কিন্তু খালেদ মোশারফের ক্ষমতা দখলের একদিন পর তার ভাই (আওয়ামী লীগের নেতা ও জাতীয় সংসদের এমপি) এবং তার মা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবেকে সমর্থন এবং মস্কোপন্থিদের একটি মিছিলে অংশ গ্রহনসহ 15ই আগষ্ট অভ্যূত্থানকারীদের উপযোক্ত শাস্তি কামনা এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ বলে ঘোষনা করেন। এই ঘোষনার সাথে সাথে দেশ সর্বত্রই  গুজব রটে যে, খালেদ মোশারফ কতৃর্ক অভ্যূত্থানে ‘ভারত-রাশিয়ার মদদ রয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হবার আশংঙ্খা রয়েছে। তাছাড়া এই সময়টিতে মওলানা ভাসানীর ‘রুশ-ভারত’ বিরুধী প্রচার এবং শেখ মুজিব শাসনামলের ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষের কথা স্বরন করে জনগনের মনে এক ভয়ন্কর আতংকের সৃষ্টি হয়।
1973সালের মাঝামাঝি সময় থেকে অসীম সাহসী দেশপ্রেমিক এবং সমাজতন্ত্রমনা মুক্তিযুদ্ধা কণেল তাহের বিপ্লবী ধ্যান ধারনায় বিশ্বাসী ছিলেন। যার ফলে সরকার তাকে সামরিক অফিসারপদ থেকে বহিস্কার করেন।এমতবস্থায় তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে যোগদানসহ তার বিপ্লবী ধ্যান ধারনা প্রচারও প্রসারে ব্যাপকভাবে মনোনিবেশ করেন।তিনি সেনাবাহিনীর সাথে গোপনে যোগাযোগ করে তাদেরকে নিয়ে ‍বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নামে একটি গোপন সংস্থা গড়ে তুলেন।1975 সালের 15ই আগষ্টের অভ্যূত্থানের পর দেশে রাজনৈতিক স্থীতিশীলতা বিনষ্ট হয় এবং সেনাবাহিনীর চেন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়ে। 3 নভেম্বর খালেদ মোশারফ কতৃর্ক সামরিক অভ্যূত্থান ঘটলে কর্নেল তাহের তার মত ও আদর্শ প্রসারে মনোযোগি হন।1975 সালের 6 নভেম্বর তৎকালীন রাজনৈতিক দল জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার এক গোপন বৈঠকে কর্নেল তাহের 12দফা দাবি উপাস্থাপন করেন এবং তা বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। তার 12দফা দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হল-খালেদ মোশারফকে পর্যুদস্ত করা, জেনারেল জিয়াকে মুক্তি এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব কমান্ড নিযুক্ত করা সকল রাজনৈতিক দলের কর্মীও নেতাদের মুক্তিদান বাকশাল ব্যতিত সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি সর্বদলীয় গনতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করা শ্রেনীহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে শ্রেনীহীন সামরিক বাহিনী গঠন সৈনিকদের বেতন বৃদ্ধি আবাসিক সুবিধা ও সাধারন সৈনিকদের মধ্য থেকে সরাসরি অফিসার নিয়োগ করাসেনাবাহিনীর ব্যাডম্যান ব্যবস্থার বিলুপ্তি এবং সামরিক বাহিনী সংগঠন ও পরিচালনার জন্য সামরিক নিয়ম পদ্ধতি বিলুপ করে কেন্দ্রীয় বিপ্লবী সামরিক সংস্থা গঠনের দাবি করেন। ইত্যাদি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর মধ্যে কর্নেল তাহের ব্যাপক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিপায় এবং সেনাবাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর্নেল তাহের জিন্দাবাদ জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ এবং বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ধবনি তুলে অস্ত্র হাতে কান্টনমেন্ট থেকে মিছিল নিয়ে বেড়িয়ে আসতে থাকে। তাদের সমথর্নে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ জনগনের সাথে এক অভ্যূতপূর্বক সমুন্বয় সাধনে সমর্থ হন যা সিপাহী জনতার বিদ্রোহে রুপান্তরিত হয়। ফলে খালেদ মোশারফের পতন আসন্ন হয়ে উঠে।সিপাহী জনতার বিদ্রোহে খালেদ মোশারফ ও তার সমথকের অধিকাংশ অফিসারই নিহত হলে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়।জাসদ নেতা আসম আব্দুর রব মেজর জলিল প্রভুতি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক নেতাদের মুক্তিদান করা হয়। সামরিক প্রশাসক জেনারেল জিয়া বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার অধিকাংশ দাবি মেনে নিলেও তাদের রাজনৈতিক দাবি গুলো নিয়ে গরিমসি এবং সুযোগ বুঝে তা অস্বীকার করেন। ফলে জাসদ এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সাথে জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়। 8 ও 9 নভেম্বর ‍বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে বিভিন্ন সেনানিবাসে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং শ্রেণী সংগ্রামের অংশ হিসাবে তাহের মেজর জলিল আসম আব্দুর রব এর নেতৃত্বে সৈনিক শ্রমিক কৃষক ছাত্র বুদ্ধিজীবি ও পেশাজীবি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার গঠনের আহব্বান জানানো হয়। পরপর কয়েকটি কয়েকটি বিদ্রোহের দাবানলে পৃষ্টদেশবাসী এই সময়টিতে একটি স্থিতীশীল রাজনৈতিক সরকারের আশা করছিল।এই সুযোগের সৎ ব্যবহার করে জেনারেল জিয়া কঠোর হস্তে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের নিমর্মভাবে দমন করে আইন শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। 1975 সালের 23 ও 24 নভেম্বর কর্নেল তাহেরসহ জাসদ ও অঙ্গ-সংগঠনের অধিকাংশ নেতাদের আটক এবং এক গোপনীয় বিচারের মাধ্যমে কর্ণেল তাহেরকে ফাসিঁ এবং মেজর জলিল আসম আব্দুর রবসহ 16জন জাসদ নেতাকে কারাদন্ডপ্রদান করেন। 1976 সালের 21শে জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গোপনে কর্নেল তাহেরের মৃত্যূদন্ডকার্যকর করা হয়।
জেনারেল জিয়াঃ-
1975 সালের 7 নভেম্বর ‘সিপাহী জনতার’ অভ্যূত্থানে খালেদ মোশারফ নিহত হন। 8 নভেম্বর এক ফরমানবলে ‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক’ বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েম 1975 সালের 15 আগষ্টজারিকৃত সামরিক আইন বহাল রাখার ঘোষনা দেন। তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সামরিক বাহিনীর ‘চিফ অব স্টাপ’ ও কমোডর মোশারফ হোসেনকে নৌ-বাহিনীর প্রধান এবং এয়ার ভাইস মার্শাল এম.জি তাওয়াবকে বিমান বাহিনীর প্রধানও উপ-প্রধান সামরিক প্রশাসক নিয়োগ করেন। শেখ মুজিব আমলের বিক্ষুব্ধ আমলা ও প্রশাসনিক এলিট আবুল ফজল, কাজী আনোয়ারুল হক, ও আব্দুর রশিদ  কে পরিকল্পনা কমিশনার এবং  ডঃ মীর্জ্জা সফিউল আযম ও আবুল খায়েরকে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্ঠা নিযোগ করেন। সচিবালয়, জনসংস্থা এবং জেলা পযার্য়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদেও তিনি রদবদলসহ অধিকহারে সামরিক বাহিনীর লোকদের নিয়োগ প্রদান করেন। তিনি সুকৌশলে মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীর নেতৃত্বে ‘নবম পদাতিক ডিভিশন নামে একটি বিশ্বস্ত আস্থা/অনুগত ডিভিশনের উৎত্থান ঘটান। 1976 সালের 21 নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েম প্রধান সামরিক প্রশাসক পদ থেকে সরে দাড়ালে CMLA মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান উক্ত পদ দখল করেন। সামরিক প্রশাসক পদ দখলের একবছরের মাথায় 1977 সালের 29শে এপ্রিল জেনারেল জিয়া ‘রাষ্ট্রপতি’ পদটিও দখল করেন। তিনি আইন শৃংখলা ও প্রতিরক্ষা খাতকে অধিকহারে গুরুত্ব দিয়ে এখাতগুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন। বিদেশীদের পুজিঁ বিনিয়োগের লক্ষে  তিনি জাতীকরন নীতি প্রত্যাহার, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কর মওকুফ এবং বেসরকারী পর্যায়ে ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহন করেন। মূলতঃ তার উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় 1976 সালের 27 নভেম্বর ‘ব্যাংক অব ক্রেডিট এন্ড কর্মাশিয়াল ইন্টরন্যাশনাল (B.C.C.I) প্রতিষ্ঠিত হয়। জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রীয় মূলণীতি ‘সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যায় সামাজিকও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায় বিচারের কথা প্রচার করেন। তার অনুসৃতনীতিতে দেশ  ‍পুজিঁবাদী বিশ্বের কাছ থেকে বৈদেশিক সাহায্য ও ঋন অনুদানে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হয়। তিনি মহানমুক্তি যুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের স্বার্থে 1975 সালের 31শে ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল ঘোষনা করেন। ফলে রাজাকার আল-বদর, আল-সাম ও শান্তি কমিটির সদস্যগন সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে পূর্নবাসীত হবার সুযোগ লাভ করেন। 1976 সালের 28 জুলাই এক নতুন ‘রাজনৈতিক দলবিধি’ ঘোষনা  এবং রাজনৈতিক দল গঠন ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকালাপের অনুমোদন করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন ‘রাজনৈতিক দল ও  অঙ্গ-সংগঠনের বেলায়ও এই কথা প্রযোজ্য থাকবে। শর্তে আরও উল্লেখ করা হয় পুনরাদেশ না দেওয়া পযর্ন্ত রাজনৈতিক দল গুলো ঘরোয়া রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারবে।
তার রাজনৈতিক দলবিধির পক্ষে  ব্যাপক সাড়া  জাগে। দেশে তৎকালীন সময় 53টি রাজনৈকিত দল অনুমোদনের জন্য নাম নিবন্ধনের আবেদন করলে, সরকার যাচাই-বাছাই করে 21টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন অনুমোদন করেন। 1977 সালের জানুয়ারী মাসে জেনারেল জিয়া সর্বজনীন প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটে ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, ঘোষনা করেন এবং নিবার্চিত ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের সম্মানী ভ্রাতাবৃদ্ধি এবং ইউপি কার্যপরির্ধিও বর্ধিত করেন। তৎপর তিনি 1977 সালের 30 এপ্রিল 19 দফা নীতি ও কর্মসূচী ঘোষনা করেন। তার প্রনিত 19 দফা কর্মসূচী ছিল নিন্মরুপ-
১। সর্বোতভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
২। শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি অর্থাৎ সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করা।
৩। সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্বনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।
৪। প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আইন-শৃংখলা রক্ষার ব্যাপারে জনসাধারনের অংশগ্রহন নিশ্চিত করা।
৫। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীন তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।
৬। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্ণ করা এবং কেউ যেন ভুখা না থাকে তার ব্যাবস্থা করা।
৭। দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সকলের জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৮। কোন নাগরিক গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব ব্যাবস্থা করা।
৯। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা ।
১০। সকল দেশবাসীর জন্য নূন্যতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা।
১১। সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতষ্ঠা করা এবং যুব সমাজকে সুসঙ্গহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।
১২। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারী খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দান।
১৩। শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
১৪। সরকারি চাকুরীজীবিদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তিতে উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।
১৫। জনসংখ্যা বিস্ফোরন রোধ করা।
১৬। সকল বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলির সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।
১৭। প্রশাসন এবং উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকাররে শক্তিশালী করা।
১৮। দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।
১৯। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ন সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুদৃঢ় করা।
1977 সালের এপ্রিল মাসে জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষনে ‘তার অনুসৃত নীতি ও কর্মসূচীর প্রতি জনগনের আস্থা যাচায়ের জন্য 30মে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধীকারের ভিত্তিতে দেশব্যাপী এক বিশেষপন্থার ‘গনভোটের আয়োজন করেন এবং এই গনভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারনা চালান। এই গনভোটের নিবাচর্নে 99.88% ভোটে তিনি জয় লাভ করেন। যদিও এই গনভোট বা ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোটে ব্যাপক বল প্রয়োগ ও কাচুপির অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এই গনভোটের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারনা করলেও দেশের ‘দক্ষিনপন্থি ও ধর্মভিত্তিক’ রাজনৈতিক দলগুলো জেনারেল জিয়াকে  অকুণ্ঠ সমর্থন দান করে। 1977 সালের আগষ্ট মাসে তিনি ‘পৌরসভা নির্বাচন’ ঘোষনা করেন। এই নিবাচনে তাদের সমর্থীত প্রার্থীরা ব্যাপকভাবে জয় লাভ করে।
 1977 সালের 3 জুন সামরিক প্রশাসক জেনারেল জিয়া সরকার ‘রাষ্ট্রপত ‘ নির্বাচনের তারিখ ঘোষনা করেন। এই নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (জাতীয়তাবাদী গনতান্ত্রিক দল; জাগদল, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি; ভাসানী, ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও বাংলাদেশ তফসিলি ফেডারেশন ) এর পক্ষে জেনারেল জিয়া ধানের শীর্ষ প্রতীক নিয়ে এবং ‘গনতান্ত্রীক ঐক্’ জোটের পক্ষে (বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, জাতীয় জনতা পার্টি, ন্যাপ (মোজ্জাফর), বাংলাদেশ পিপলস্ লীগ, গন-আযাদী লীগ) মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী নৌকা মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। মোট 3কোটি 84 লক্ষ 96 হাজার 247 জন ভোটারের মধ্যে 53.54 ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধীকা প্রয়োগ করেন। এই নির্বাচনে জেনারেল জিয়া 76.63 ভাগ ভোট পেয়ে ‘প্রেসিডেন্ট নিবার্চিত’ হন। যদিও এই ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। 1978 সালের 30 জুন প্রেসিডেন্ট জিয়া 28 জন মন্ত্রী ও 2জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে একটি শক্তিশালী মন্ত্রীসভা গঠন করে বেসামরিক সরকার গঠনে উদ্যোগী হন। তার মন্ত্রীসভায় 18জন গনতান্ত্রিক, 4জন ন্যাশনাল আওয়ামী ভাসানী, 2 জন ইউপিপি ও তিনজন মুসলীমলীগও তজন তফসিলি ফেডারেশনের সদস্য ছিলেন।গনভোটের পরপরই জেনারেল জিয়া 1978 সালের 1লা সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় গনতান্ত্রিক ফ্রন্টের ব্যানারের সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতীয়তাবাদী দল বিিএন.পি গঠন করেন। নব গঠিত বিিএন.পির আহব্বায়ক নির্বাচিত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। 1978 সালের 28 আগষ্ট জাগদলের আহব্বায়ক হিসাবে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার পদত্যাগ ও দলের বিলুপ্তি ঘোষনা করেন। ক্ষমতা বৈধকরন ও বেসামরিকিকরনের লক্ষ্যে জেনারেল জিয়া 1979 সালের 27 জানুয়ারী জাতীয় সংসদের নির্বাচন ঘোষনা করেন। কিন্তু ব্যাপক ভাবে সামরিকদমনাভিযান, রাজনৈতিক নেতাদের বন্দি, সাংবাপত্রের স্বাধীনতা খর্ব, রাজনৈতিক কার্যকালাপের উপর বিধি/নিষেধের কারনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি, জাতীয়লীগসহ অন্যান্যদল গুলো নির্বাচন বয়কট করলে জেনারেল জিয়া প্রথমে 12ই ফ্রেরুয়ারী এবং পরবর্তীতে 18ই ফ্রেরুয়ারী নির্বাচনের তারিখ পূর্নঘোষনা করেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাত্র 39টি আসন পেলেও বি.এন.পি নিরন্কুষ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। জেনারেল জিয়া নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির পদ দখলের পর 1979 সালের 6এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়া ঈগিতে ডানপন্থি এবং ধর্মীয়দল গুলো সংবিধানের মূলনীতি বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের বিরোধীতা করে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেন। এই সময় মওলানা ভাসানী এবং বিমান বাহিনীর প্রধান তাওয়াব ইসলামী সংবিধান প্রনয়নের জন্য একটি বিবৃত্তি প্রদান করেন। মধ্যপাচ্যের দেশগুলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং পুজিঁবাদী বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সমাজতন্ত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে জিয়া সরকার 15 আগষ্ট থেকে 1979 সালেরর 6 এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক প্রশাসক থাকাকালীন সমস্ত কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতির জন্য সংবিধানে পঞ্চম সংশোধনী আনেন। এই সংশোধননীর মাধ্যমে সঙবিধানের প্রস্তাবনায় বিসমিল্লাহীর রাহমানির রাহিম অথার্ৎ দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি কথা সংযোজন এবং রাষ্ট্রীয় মূনীতির ক্ষেত্রে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ধর্মরনরপেক্ষতার পরিবর্তে সবশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থাও বিশ্বাস এবং সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে অথনৈতিক ও সামাজিক ন্যায় বিচার কথাগুলো প্রতিস্থাপন করেন। তার এই শব্দগুলোতে বাংলা ভূখন্ডে দর্মভীত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে স্বাধীনতা বিরোধীরা ব্যাপক ভাবে উৎসাহী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে আঘাত বর্ষিত হয়)