আল্লাহু আকবর কেন বলবেন! কখন বলবেন!

Author Topic: আল্লাহু আকবর কেন বলবেন! কখন বলবেন!  (Read 326 times)

Offline faruque

  • Hero Member
  • *****
  • Posts: 655
    • View Profile
আল্লাহু আকবর কেন বলবেন! কখন বলবেন!


মুমিন বান্দাদের বিশ্বাসের প্রধান হাতিয়ার আল্লাহু আকবর। এই শব্দের বহুমুখী অর্থ এবং তাৎপর্যের মধ্যে বান্দা বিলীন হতে হতে এমন মাকামে পৌঁছতে পারে যেখানে পৃথিবীর কোনো আগুন তাকে স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখে না- কোনো শক্তি তার গতিরোধ করতে পারে না এবং কোনো প্রাণী তার চলার পথে বাধা সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহু আকবরে বিলীন হতে হতে বান্দা তার আবদ পরিচয় থেকে বের হয়ে আসে। স্বয়ং আল্লাহ তার সৃষ্টিকে চাকর থেকে বন্ধুর আসনে বসান এবং তামাম মাখলুকাতে তার মাহবুবকে পরিচয় করিয়ে দেন আপন নূরের মারফতি কুদরতে। ফলে আল্লাহর মাহবুবগণ আল্লাহর সৃষ্টিলোকের সব কিছুর ওপর আল্লাহর ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ লাভ করে থাকেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, 'আমি যাকে রহম করি তাকে অন্যরা ঈর্ষা করে। আল্লাহর রহমতপ্রাপ্তরা জমিনে বিচরণকালে আসমান-জমিন ফেরেশতাকুল এবং জমিনের বোবাপ্রাণী বৃক্ষলতা, তরুরাজির দোয়া লাভ করেন এবং অন্য বান্দাদের অযাচিত মহব্বতের চাদরে ঢাকা থাকেন।


এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহু আকবর শব্দটির অর্থ কী এবং সেই অর্থের তাৎপর্য কিরূপে হৃদয়-মনে ধারণ করা যাবে! সরল বাংলায় এটির অর্থ- আল্লাহ সর্বশক্তিমান। বান্দা যখন সব বিষয়ে আল্লাহপাকের হুকুম-আহকাম, ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং শক্তিমত্তাকে তাবৎ দুনিয়ার সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়ার কোনো রাজা-বাদশাহের ক্ষমতা ও প্রভাবকে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত মনে করে সমীহ করে এবং রাজা-বাদশাহ অহংকারী হয়ে উঠলে তাদের ঘৃণা করে পরিহার করে এবং সময় সুযোগ মতো বিদ্রোহ করে তখন ইমান তাকে কাছে ডাকতে থাকে।

আল্লাহর ওপর নির্ভর করার সবচেয়ে পবিত্র এবং নির্ভরযোগ্য উদাহরণ রয়েছে পবিত্র কোরআনে। আল্লাহপাক স্বয়ং তাঁর বন্ধু হজরত ইব্রাহিমের ইমানের উৎকৃষ্ট দিকসমূহ বর্ণনা করেছেন। আগুনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরও তিনি শেষ পর্যন্ত খোদায়ী সাহায্য পাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল ছিলেন। ফেরেশতাগণ তাকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলে তিনি নির্লিপ্তভাবে বললেন, আমি তো কোনো অন্ধ খোদার ইবাদত-বন্দেগি করি না। এ ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লামা ইকবাল বলেন, সেই খোদা, সেই আগুন এবং সেই নমরুদ এখনো আছে। নেই কেবল একজন ইব্রাহিম। আজও যদি কোনো ইব্রাহিমকে কোনো নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করে, তবে নিশ্চিতভাবে সেখানে আগুনের মধ্যে ফুলবাগান সৃষ্টি হবে।

আল্লাহু আকবর উচ্চারণ করে রাতারাতি কোনো বান্দা তার কাঙ্ক্ষিত মাকামে পৌঁছতে পারবে না। তাকে ধীরে ধীরে এগোতে হবে সফলতার দিকে। নিজের শরীর, মন ও মানসিকতা ধীরে ধীরে রবের দিকে মোতাওয়াজ্জু করতে হবে। এক্ষেত্রে বান্দাকে সবার আগে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তারপর হালাল রিজিক এবং সবশেষে সুন্দর একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আল্লাহর শক্তিমত্তা বোঝার জন্য বান্দাকে পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরণ করতে হবে। যেমন কেউ যদি প্রথম আসমানের গঠন, তারকারাজির বিচরণ, উল্কাপিণ্ড, ছায়াপথ, ব্ল্যাকহোল, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কে ভালোভাবে না জানে, তবে তার পক্ষে অন্তর দিয়ে আল্লাহ সর্বশক্তিমান এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। তাকে জানতে হবে পৃথিবী গঠনের ইতিহাস, ফেরেশতা, জিন এবং মানব সৃষ্টির ইতিহাস ও জমিনে মনুষ্য জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস। এগুলো যদি গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করা হয়, তবে বান্দা নিজেকে কোনো দিন অহংকারীরূপে উপস্থাপন করতে পারে না। তার চিত্ত নরম হয়ে যায় এবং সিজদা প্রদানের জন্য শরীর-মন উন্মুখ হয়ে ওঠে। আল্লাহ আকবরের ফায়েজ ও বরকত পেতে হলে দ্বিতীয় ধাপে বান্দাকে সূরা ফাতিহার তাফসির খুব ভালো করে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। এই সূরার কয়েকটি আয়াত সবসময় মনের মধ্যে গেঁথে রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে চলুন সূরা তা-হা এর ১৪ নম্বর আয়াতটি আলোচনা করে আসি। এই আয়াতে আল্লাহ হজরত মূসা (আ.)-কে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, 'আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।' এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তার বান্দাকে বন্দেগি করার নির্দেশ প্রদান করলেন। এখন বন্দেগির দ্বিতীয় স্তরে চলে আসুন। অর্থাৎ প্রকাশ্য বুক ফুলিয়ে নিজেকে আল্লাহর বান্দা ঘোষণা করুন ঠিক হজরত ঈসা (আ.)-এর মতো। তার সর্বপ্রথম উচ্চারণ ছিল 'আমি আল্লাহর বান্দা' (সূরা মারিয়াম : ৩০)।

হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের পর বহুবিধ বিতর্ক শুরু হলো। কুমারী মায়ের কী রূপে বাচ্চা হলো এমনতরো হাজারো প্রশ্ন দ্বারা হজরত মারিয়ামের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হলো। তিনি নিজে কোনো জবাব না দিয়ে তার নবজাতকের দিকে ইঙ্গিত করলেন। শিশু ঈসা (আ.) সমবেত বিতর্ককারীদের উদ্দেশে উপরোক্ত ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার জন্ম ও অস্তিত্ব সম্পর্কে সব প্রশ্নের অবসান হয়ে গেল- সব কল্যাণের দুয়ার খুলে গেল এবং সব অকল্যাণের দ্বার রুদ্ধ হয়ে গেল। জীবনের প্রথম কথায় তিনি যখন নিজ গোলামির স্বীকারোক্তি দিলেন তখন আল্লাহপাক তাকে মহামূল্যবান দুটি প্রতিশ্রুতি দিলেন। জমিনে তার সুউচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করলেন এবং প্রয়োজনের সময় ঊধর্্বালোকে তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। সূরা আল ইমরানের ৫৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহর সেই ঘোষণার প্রমাণ মেলে। আল্লাহ বলেন, 'আমি তোমাকে আমার কাছে তুলে নেব।' এখন একটু মাথা খাটিয়ে চিন্তা করুন তো যদি একবার নিজ মুখে গোলামির স্বীকারোক্তিদানের ফলে জান্নাতের উচ্চাসনে ঠাঁই পাওয়া যায়, তবে যে ব্যক্তি ৭০ বছর নিজ কর্মে গোলামির প্রমাণ দেবে, সেকি জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে?

হজরত আলী (রা.) বলতেন, আমি তোমার একজন গোলাম- এটাই আমার সম্মান। আর তুমি আমার মুনিব- এটাই আমার অহংকার। হে আল্লাহ! আমি যেমন চেয়েছি তোমাকে সেই রকম মুনিব পেয়েছি। এখন তুমি যেমনটা চাও- আমাকে সেই রকম গোলাম বানিয়ে নাও।

নিজেকে পরিপূর্ণ গোলাম বানানোর পর আপনি আপনার রবের দিকে এগোতে থাকুন। আর এগোনোর সময় রবের কতিপয় নির্দেশ পালন করুন কঠোর মনোযোগসহকারে এবং মনে মনে সূরা বাকারার ৪০ নম্বর আয়াত স্মরণ করে মনের মধ্যে আশার সঞ্চার করুন। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'তোমরা আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ কর। আমিও তোমাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করব।' আল্লাহর দিকে অগ্রসরের প্রথম স্তরকে বলা হয় রাবুবিয়্যাত। আর রাবুবিয়্যাতের পরিচিতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সূরা ফাতিহাতেই আছে। বলা হয়েছে, 'সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য। তিনি দয়াময় পরম দয়ালু কর্মফল দিবসের মালিক। বান্দা যদি তার মালিকের এসব গুণ যথাযথ অনুধাবন করতে সক্ষম হয়, তবে রাবুবিয়্যাতের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় লাভ হয়ে যাবে।'

রাবুবিয়্যাতের পরের স্তর উবুদিয়্যাত। উবুদিয়্যাতের সূচনা ও প্রারম্ভ হয় ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার দ্বারা। বান্দাকে বুঝতে হবে আল্লাহ রসুল আলামিনের অবাধ্যতা হতে আত্মরক্ষা কেবল আল্লাহ কর্তৃক সুরক্ষা দ্বারাই সম্ভব। বান্দা যখন এ বিষয়টা উপলব্ধি করবে তখন তার যাবতীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য লাভের জন্য মালিকের সাহায্য প্রার্থনা করবেন। মুমিনের ইমান দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আল্লাহর পরিচয়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে পড়েন। কিন্তু সেই ইমানের ভিত্তি মজবুত করার জন্য আল্লাহর অস্তিত্ব, জ্ঞান, শক্তি, মহানুভবতা, অনুকম্পা, প্রজ্ঞা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা অতীব জরুরি। এ জন্য মুমিন তার রবের কাছে প্রার্থনায় বলে হে আমাদের রব। প্রতিটি বস্তুর মধ্যে তোমার সত্তা এবং তোমার জ্ঞান, শক্তি প্রভৃতি গুণাবলি সংক্রান্ত যে নির্দেশনাবলি বিদ্যমান রয়েছে- তার মাধ্যমেও তোমাকে জানার পথ করে দাও।

একজন মুমিন বান্দা যখন স্তরে স্তরে অগ্রসর হতে হতে আল্লাহু আকবরের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় তখন চারদিকে আল্লাহর জিকির তাকে ঘিরে ধরে। মানুষের এ অবস্থাকে বলা হয় সুলতানান নাছিরা। যে সব সৌভাগ্যবান বান্দার জীবনে সুলতানান নাছিরার মাকামে পৌঁছানোর সুযোগ হয় তারা পাখ-পাখালির কলতান, সমুদ্রের গর্জন, গাছের পাতার নড়াচড়া, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ এবং একান্ত নির্জনে নিজের শরীরের প্রতিটি কোষ থেকে সমন্বিত স্তরে আল্লাহ আল্লাহ জিকিরের শব্দ শুনতে পায়, বান্দার এই হালত তাকে জাগতিক সব সুখ-দুঃখ, কাম-ক্রোধ এবং আশা-নিরাশার ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যায়। সে আসমান-জমিনের সর্বত্র কেবল আল্লাহর সর্বশক্তিমান সত্তাকেই দেখতে পায়। নিজের আত্মার ওপর স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সিলমোহর মেরে বান্দা যখন চিৎকার করে বলে ওঠে- আল্লাহু আকবর তখন সে ডাক আরশে আজিম পর্যন্ত অনুরণিত হয়ে স্বয়ং আল্লাহপাকের দিদার লাভ করে।

এখন প্রশ্ন হলো, কখন আপনি আল্লাহু আকবর বলবেন এবং কেন! চলতি পথে আল্লাহর সৃষ্টিকুলের দিকে নজর দিতে দিতে আপনি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্মরণ করুন এবং মনে মনে আল্লাহু আকবর বলুন। দুনিয়ার কোনো ফায়দা হাসিলের জন্য আপনি যখন চেষ্টা করতে থাকেন তখন খোদায়ী মদদ পাওয়ার জন্য পরিপূর্ণ বিশ্বাস এবং আস্থাসহকারে আল্লাহু আকবর বলুন। আপনার মন যখন নফ্সে আমমারার প্ররোচনায় কিংবা শয়তানের ওয়াছাওয়াছায় আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে কোনো ক্ষমতাধর মানুষ, তথাকথিত দেবতা, মূর্তি, আগুন, প্রাণী ইত্যাদির কাছে মাথানত করার জন্য তাগিদ দেয় তখন চিৎকার করে বলে উঠুন আল্লাহু আকবর।

এবার বলছি কেন আল্লাহু আকবর বলবেন! আপনার রিজিক বৃদ্ধি পাবে, দুনিয়া এবং আখেরাতে আল্লাহপাকের রহমত, বরকত এবং ক্ষমার চাদরে আপনি আচ্ছাদিত থাকবেন। সুস্থ, সুন্দর, নীরোগ দেহ এবং প্রফুল্ল মন নিয়ে আপনি প্রাণভরে দুনিয়ার সব নেয়ামত ভোগ করতে পারবেন। হিদায়েতের পথ অর্থাৎ সিরাতুল মুসতাকিম আপনার জন্য ওয়াজিব হয়ে যাবে। আপনি পাবেন আপনার আল্লাহ এবং তার রসুল (সা.)-এর দিদার, মহাবিশ্বের অনন্ত লোকের অনেক অজানা রহস্য আপনার কাছে খোদায়ী কুদরতে পরিষ্কার হয়ে যাবে। খোদায়ী শিক্ষায় আপনি হবেন শরিয়ত-মারফত-তরিকত এবং হাকিকতের বাদশাহ। আপনার জবান হয়ে যাবে আল্লাহতে সমর্পিত বান্দার জবান আর তখন তাবৎ সফলতা আপনার পায়ের কাছে আছড়ে পড়বে ক্রীতদাসের মতো।

গোলাম মাওলা রনি
লেখক : কলামিস্ট

Offline monirulenam

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 295
  • Test
    • View Profile
Thanks for the informative post