আধুনিক জীবন ও আমাদের দ্বীনী অনুভূতি

Author Topic: আধুনিক জীবন ও আমাদের দ্বীনী অনুভূতি  (Read 366 times)

Offline mrchawdhury

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 73
    • View Profile
আলহামদু লিল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলার শোকর আদায় করছি যে, তিনি আমাদেরকে দ্বীনের কিছু আলোচনার জন্য এভাবে একত্রিত হওয়ার তাওফীক দিয়েছেন। আমি একজন ইংরেজি শিক্ষিত মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইলমে দ্বীন হাসিল করার আমার সৌভাগ্য হয়নি। এখন যেখানে দ্বীনের সব স্কলারদের কেন্দ্র, সেখানে কিছু বলার মত বিষয় আমি খুঁজে পাই না।

হারদুই হযরত মাওলানা আবরারুল হক ছাহেব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বার বার একটি আয়াতের দিকে ইশারা করতেন,

وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَىٰ تَنْفَعُ الْمُؤْمِنِيْنَ

‘মনে করিয়ে দাও। নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দেয়া আমার ঈমানদার বান্দাদেরকে উপকৃত করবে।’ -... এখন আপনাদের আমি কী মনে করিয়ে দেব? আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে কত কথা বলে গেছেন। বিশেষ করে তিনি বলেছেন যে, ‘উলামায়ে কেরাম সকল নবীদের ওয়ারিস।’ ‘আমার ওয়ারিস’ বলেননি। সকল নবীদের ওয়ারিস। ইসলাম আপনাদের উপর এক বিরাট দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা আলেম না হয়ে একদিক  থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু অন্যদিকে আসল সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

আমার এক ছাত্র পিএইচডি করেছে অস্ট্রেলিয়ায়। আমার সঙ্গে হজ্বও করেছে। বছর দুয়েক আগে ঢাকায় এসে আমার সাথে দেখা করেছে। দেখা করে বলে, ‘স্যার, আপনাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে দেখেছি। একসাথে হজ্বও করেছি। তারপরেও মনের মধ্যে বার বার ওয়াসওয়াসা আসে, আসলে আখেরাত বলে কি আদৌ কিছু আছে?’ আমি তাকে ইলমি জবাব কী দেব? আমি সেদিকে গেলামই না। আমি তাকে বললাম, ‘ইবরাহীম (বাইবেলে আব্রাহাম), ইয়াকুব (বাইবেলে জ্যাকব), ইসহাক (বাইবেলে আইজ্যাক) সবাই ঐতিহাসিক চরিত্র। তাদের সবার কথা বাইবেলে আছে। বাইবেলের দুটো ভাগ। নিউ টেস্টামেন্ট এবং ওল্ড টেস্টামেন্ট। নিউ টেস্টামেন্টকে বলে ইঞ্জিল। আর ওল্ড টেস্টামেন্টকে বলে তাওরাত। (কিন্তু এগুলো আসল ইঞ্জিলও নয় তাওরাতও নয়। একথা সবারই জানা আছে। তা সত্ত্বেও কথাটি এজন্য বললাম যে, তাহরীফ ও বিকৃতির পরও এগুলোতে তাঁদের নাম রয়েছে। এবং আসমানী দ্বীনপ্রাপ্ত সকলেই তাঁদেরকে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত মনে করে)। তো নবীগণ এবং খাতামুন নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলেই যখন আখেরাতের বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছেন, তাহলে ঈমান আনার জন্য এর চেয়ে বেশি আর কী দলীলের প্রয়োজন! পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম সত্য আর কোথায় পাবে?’

আমি ২০১২ সালে আমেরিকায় গিয়েছিলাম। সেখানে ফ্লোরিডায় রাস্তার পাশে একটা সাইনবোর্ড দেখলাম। তাতে বিরাট করে লেখা, Islam : The Religion of Abraham, Moses, Jesus and Muhammad (ইসলাম ইবরাহীমের ধর্ম, মূসার ধর্ম, ঈসার ধর্ম এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ধর্ম)। সাইনবোর্ডে Islam এর ও অক্ষরটা প্রায় আমার সমান। এটা তো আমেরিকায় দেখেছি। আর আমার সেই ছাত্র থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। আমি তাকে বললাম, ‘এই মানুষগুলো সবাই কি মিথ্যুক? তুমি তো পিএইচডি করেছ অস্ট্রেলিয়ায়। তোমার কি মনে হয় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মিথ্যা বলেছেন? মূসা আলাইহিস সালাম মিথ্যা বলেছেন? ঈসা আলাইহিস সালাম মিথ্যা বলেছেন? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা বলেছেন?’ আমার কথা শুনে সে চুপ হয়ে গেল।

এসকল নবী সারা দুনিয়ায় সম্মানিত। তবে ইসলাম তাদেরকে যে সম্মান দিয়েছে, সেটাই আসল সম্মান। কুরআন মাজীদে আছে,

 قُلِ الْحَمْدُ لِلّٰهِ وَسَلَامٌ عَلٰى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَىٰ

‘আপনি বলুন, আল্হামদু লিল্লাহ, সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর নির্বাচিত সকল দাসদের উপর।’ - ... সারা দুনিয়ার মুসলমানরা এর উপর আমল করে কি করে না? চৌদ্দশ বছর পরও আমরা মূসার নাম নিলে বলি, মূসা আলাইহিস সালাম (তাদের উপর সালাম বর্ষিত হোক)। অন্য ধর্মাবলম্বীরা এর ধারে কাছেও নেই। আমাদের দেশে মুসলমানদের মধ্যেও এখন এ অবস্থা এসে গেছে। যেহেতু মানুষ দ্বীন শেখার সুযোগ পায় না, অজ্ঞতা দানা বাধেই।

আল্লাহ তা‘আলা পরিবেশের ওসিলায় অনেক সময় দ্বীনি বুঝ নসীব করেন। আমার এক বন্ধু এখন আমেরিকায় থাকেন। আমরা একসাথে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়েছি। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আচার ব্যবহারে খুব ভদ্র। তবে তাকে আমি কোনোদিন নামায পড়তে দেখিনি। ধর্ম-কর্মের সাথে সম্পর্ক নেই। সবচেয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে লস এঞ্জেলস শহর। ২০১২ সালে আমেরিকা সফরে আমি এ শহরে গিয়েছিলাম। একদিন লস এঞ্জেলসের লেকউড এলাকার এক মসজিদে প্রোগ্রাম ছিল। সেখানে দেখি আমার এই বন্ধু হাজির। আমি তাকে বললাম, ‘তুমি এখানে?’ সে বলল, ‘হ্যা। তোমার নাম দেখে আসলাম। প্রফেসর হামীদুর রহমান আর কে হবে, তুমি ছাড়া?’

আমার বন্ধু আমাদের সাথে অনেকক্ষণ থেকেছে। মাগরিব এশা একসাথে পড়েছে। পুরো বয়ান শুনেছে। বয়ান শেষে প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল। সেখানে প্রশ্নও করেছে। তার এই পরিবর্তনের বিষয়টা আমাকে অবাক করল। আমেরিকায় এটা খুব হচ্ছে। যারা বাংলাদেশে কেবল মুসলমান হিসেবে পরিচিত ছিলেন, ধর্ম-কর্ম করতেন না, তারা আমেরিকায় এসে ধার্মিক হয়ে গেছেন। বিপরীত পরিবেশে আল্লাহর অনুগ্রহে তারা দ্বীনের দিকে খুব অগ্রসর হন। দ্বীনের খেদমতে লাগার জন্য খুব কামনা করেন। এটা আল্লাহপাকের কুদরতী বিধান।

ইংরেজিতে বলে জেনারেশন (Generation, প্রজন্ম)। আমরা এক জেনারেশন। আমাদের ছেলেরা আরেক জেনারেশন। প্রথম জেনারেশনের যারা আমেরিকায় গিয়েছে, তারা ভিন্ন পরিবেশে এসে দ্বীনের প্রতি খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে। মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং তাবলীগের কাজে খুব এগিয়ে যায়। সমস্যা হল তাদের পরবর্তী জেনারেশন নিয়ে। তাদের ছেলে-মেয়ে যারা আমেরিকায় জন্মেছে, তারা নতুন প্রজন্ম। এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা পুরোনোদের মত দ্বীনী খেয়াল নিয়ে বেড়ে ওঠে না। প্রথম প্রজন্ম মুসলমান হওয়ার দিকে আগায়। আর তার পরবর্তী প্রজন্ম আমেরিকান হওয়ার দিকে আগায়। আমেরিকান হওয়া মানে কী? যেখানে আল্লাহর কোন জায়গা নেই। God has nothing to do (খোদার করার মত কিছুই নেই)। ভালো চলছে সব। ভালো খানা-দানা, আমোদ-ফূর্তি। পবিত্র কালামে রয়েছে,

 كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَىٰ أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَىٰ إِنَّ إِلَىٰ رَبِّكَ الرُّجْعَىٰ

‘না না মানুষ তো আমার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, ঔদ্ধত্যের সাথে ঘাড় ফেরায়। সে নিজেকে অভাবহীন মনে করে। আপনার প্রতিপালকের কাছে ফিরতে হবে একদিন।’ -... আল্লাহপাকের মন্তব্য ছোট্ট, ‘আপনার প্রতিপালকের কাছে তাকে ফিরে যেতে হবে।’  তখন দেখা যাবে, কার দেয়া নেয়ামত ভোগ করে এসেছ। পুরো আমেরিকায় এজন্য মুসলমানদের মধ্যে এ অনুভূতিই সবচেয়ে তীব্র যে, আলহামদুলিল্লাহ, আমি তো এখন নামায পড়া শুরু করেছি। রোযা রাখা শুরু করেছি। আমার ছেলে-মেয়েদের কী হবে?

আমেরিকায় আমরা অনেকগুলো স্টেটে গিয়েছি। আটলান্টা শহরে সফরের সময় একজন মহিলা নিউইয়র্ক থেকে ফোন করল। আমি প্রথমে তাকে বললাম, আপনি আমার নম্বর কোথায় পেলেন? ‘আপনার ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ মাসহুদুর রহমান সাহেবের মেয়ে নিউইয়র্কে থাকে। তার কাছ থেকে আপনার মোবাইল নম্বর পেয়েছি।’

‘কি ব্যাপার?’

এ কথা বলতেই মহিলা কান্না শুরু করে দিল,

‘আমার ছেলেটা পাচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে জামাতে পড়ত। কুরআন শরীফ সুন্দর পড়ে। পরশু তার বয়স আঠার হয়েছে। সে তার খ্রিস্টান বান্ধবীকে বিয়ে করে ঘর ছেড়ে চলে গেছে। আমরা জানতামই না যে, তার বান্ধবী আছে।

ছেলে খুব ভালো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে যে পুরোপুরি আমেরিকান হয়ে যাচ্ছে, এটা তো মায়ের খবর নেই। মা এখন কাঁদে। আমি বললাম, ‘এ তো আমাদের অবহেলা, উদাসীনতার ফল। এখন কেঁদে কী হবে? আপনি মা। তার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেন।’

আরো কিছু কথা বলে মাকে সান্ত¡না দিলাম। এরকম ঘটনা কম নয়। আমেরিকার মত পরিবেশে ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ছে। কুরআন পড়ছে। এর মধ্যে খ্রিস্টান মেয়েকে বিয়ে করে ফেলছে। খ্রিস্টান মেয়েকে বিয়ে করা ঐদেশে কোনো বিষয়ই না!

বিদেশের পরিবেশে বেশিরভাগই চেইঞ্জ হয়। আমেরিকায় যাওয়ার আগে যারা মুসলমান ছিল, তাদের ঈমান সাধারণত বাড়ে। কিন্তু যাদের ঐদেশেই জন্ম, শুরু থেকেই তারা এক ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠে। এটা অনেকেই বলেন যে, আমরা আলহামদুলিল্লাহ, নামায-রোযা করছি। দাড়ি রাখছি। কিন্তু আমাদের ছেলে-মেয়েরা আমেরিকান হয়ে যাচ্ছে! তাদের চাল-চলন সব আমেরিকানদের মত।

১৯৮৫ সালে আমি হাফেজ্জী হুযুরের সাথে লন্ডন গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা এমন অনেক মসজিদে গিয়েছি যেগুলো আগে চার্চ ছিল। মুসলমানরা আমাদেরকে দেখিয়ে বলেছে, এ মসজিদটা আগে খ্রিস্টানদের চার্চ ছিল। এটা ইহুদীদের উপসনালয় সিনাগগ (Synagogue) ছিল। আর আমরা আমেরিকা গিয়ে দেখলাম মুসলমানরা অনেক চার্চকেই মসজিদ বানিয়ে ফেলেছে। তারা আমাদের দেশে টাকা-পয়সা খরচ করে লোক কিনে কিনে খ্রিস্টান বানাচ্ছে। নীলফামারী, লালমনিরহাটসহ অনেক জায়গায় আমাদেরকে ডেকে বলে, এই বাড়িতে সাতজন খ্রিস্টান হয়ে গেছে। প্রতি মাসে সবাইকে ৩৫০ টাকা করে দেয়। কেউ যদি খ্রিস্টান হয়ে যায়, তাহলে তাকে মাসে মাসে তারা টাকা দেয়। তাদের নিজেদের দেশেই চার্চ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে আর আমাদের দেশে টাকা-পয়সা বিলিয়ে বাঙ্গালীদের ঈমান হরণ করে! অকল্পনীয় জঘণ্য কাজ করে তারা। এখন তো আল্লাহপাকের কালামের সব নামগুলো ব্যবহার শুরু করেছে। ঈসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গীদের নাম দিয়েছে সাহাবী। যাদের শুরুই ধোঁকা, তারা মানুষকে কী দিবে? মানুষকে ঠকানো, ধোঁকা দিয়ে স্বধর্মী বানানো - এগুলো হচ্ছে তাদের জন্মগত আদর্শ।

মুসলমানরা দ্বীনের উপর টিকে থাকার জন্য অনেক পরিশ্রম করে। এমন কোনো মসজিদ নেই যেখানে রোববার সাপ্তাহিক ক্লাস হয় না। রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এদিন শিশুদেরকে দ্বীনি তালীম দেয়া হয়। খুব যত্নের সাথে এ কাজটা প্রায় সব মসজিদই করে। কিন্তু সারা সপ্তাহে আর সময় হয় না। একদিনে আর কতটুকু পারা যায়! তবু কিছু হয়। দ্বীনের কাজ করার অপূর্ব এক জায়গা।

মুসলমানদের কথা হল, আমরা এখন আল্লাহ চাইলে অভ্যন্তরীণভাবে দখল করব। ইসলাম দ্বারা, আখলাক দ্বারা তাদের অন্তর দখল করব। মুসলমানদের জন্য এটা খুব সৌভাগ্যের জিনিস। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাচ্চাদের নিয়ে। টিভি, কম্পিউটারের মত জিনিস যেগুলো ঈমান বিধ্বংসী, সেগুলোকে তারা কোনো অপরাধই মনে করে না। বাবা-মা কত চেষ্টা করছে। কিন্তু খুব কমই লাইনে আসে। বাবা-মায়ের চেষ্টায় দেখা যায় ছোটবেলায় শিশুদের মধ্যে হেফজ করার খুব আগ্রহ তৈরি হয়। অনেকে হাফেজও হয়। হাফেজ হয়ে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে। আমেরিকায় থাকছে। কুরআন পড়ছে। আলহামদুলিল্লাহ, এ চেষ্টা অনেক পরিবারে চলছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কে এটা বেশি হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশী উলামায়ে কেরাম বেশি যান।

এ বছর আমি গিয়েছিলাম নিউজিল্যান্ডে। সেখানে একটা অদ্ভূত দৃশ্য দেখলাম। নিউজিল্যান্ডের একটা বড় শহর অকল্যান্ড। আর রাজধানী হচ্ছে ওয়েলিংটন। অকল্যান্ডে যত মসজিদে আমরা নামায পড়েছি, প্রায় সবগুলো মসজিদের ইমাম সাহেবই ডাভেলের।

অকল্যান্ডে তাবলীগের কাজ খুব ভালো হচ্ছে। তাবলীগী ভাইদের সাথে সেখানকার উলামায়ে কেরামের খুবই ভালো সম্পর্ক। আমি অকল্যান্ডের একটা বড় মসজিদের পাশেই ছিলাম। মসজিদের নাম মসজিদে উমর। সেখানে আমাকে বলে, ‘আমরা প্রতিদিন ফজরের পর দশ মিনিট আপনার বয়ান শুনব?’ আমি বললাম, ‘এখানে ফজরের নামাযের পর তাবলীগের মাশওয়ারা হয় না?’ তারা বলল, ‘হয়। তাবলীগী ভাইদের সাথে কথা  হয়েছে, যে কয়দিন আপনি আছেন, সে কয়েকটা দিন বয়ানের পর তাবলীগের মাশওয়ারা হবে।’ আমি সেখানে আট-নয় দিন ছিলাম। প্রতিদিন আমি দশ মিনিট কথা বলতাম। ইংরেজিতে। তারপর তাবলীগের মাশওয়ারা-তালীম হত। এ এক অপূর্ব সম্মিলন।

আমাদের এই পদ্ধতির তাবলীগের কাজ চালু হয়েছে মাওলানা ইলিয়াস ছাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাধ্যমে। তিনি আলেম ছিলেন কি ছিলেন না? আগে তিনি দাঈ হয়েছেন না আলেম হয়েছেন?

আমরা নিউজিল্যান্ডে কয়েকটা শহরে গিয়েছি। সবখানেই ইমাম সাহেবদেরকে পেশাক-আশাক থেকে শুরু করে সবকিছুই পুরো সুন্নাত তরিকায় করতে দেখেছি। তাবলীগের ভাইদের সাথে উলামায়ে কেরামের সম্প্রীতি দেখে বেশি অবাক হয়েছি। তাবলীগের ভাইদেরকে একসঙ্গে মহব্বতের সাথে জড়িয়ে রাখা এবং একই সাথে বিভিন্ন ইলমে দ্বীনের মাহফিলগুলোতে অংশগ্রহণ করা, যা আমাদের দেশে কম।

আমি বলছিলাম ১৪৯২ ঈ.  সালের ঘটনা। সালটা মনে রাখবেন। তখন ভারতবর্ষে মোঘল শাসন শুরু হবে হবে ভাব। পুরো ভারতবর্ষ আবাদ করা শেষ। অথচ এসময় আমেরিকা আবাদবিহীন দেশ। লোক-জন নেই। হাজার হাজার মাইল জায়গা খালি পড়ে আছে। ১৪৯২ থেকে ২০১৪ সাল, এই গত পাঁচশত বছরে সেখানে অনেক আবাদ হয়েছে।

প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। তার জীবনীতে দেখা যায় যে, তিনি খুব যোগ্য যোদ্ধা ছিলেন। বৃটিশদের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি নেতৃস্থানীয় ছিলেন। চৌকস যোদ্ধা হিসেবে তিনি স্বীকৃত। তারপর তাকে প্রেসিডেন্ট বানানো হল। চার বছর প্রেসিডেন্ট থাকলেন। আবার তাকে চার বছরের জন্য নির্বাচন করা হল। তিনি আরো চার বছর প্রেসিডেন্ট থাকলেন।

প্রথম প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে বলা হয়, তিনি একজন ডিস্ট (Deist1) ছিলেন। মানে তিনি একজন মহা করুণাময় প্রভুতে বিশ্বাস করতেন। এটা কী রকম? আমেরিকার ডলারের উপরে লেখা আছে, In God We Trust (আমরা প্রভুর উপর নির্ভর করি)। ডযরপয এড়ফ (কোন্ প্রভু তারা বিশ্বাস করে)? দেখা যায় যে, তারা এমন এক স্রষ্টায় বিশ্বাস করে যার কাছে আখেরাত বলে কিছু আছে বলে তিনি বলেন না।  নবী-রাসূল কিছু পাঠান না। আসমানী কিতাব বলে কিছু নেই। ফেরেশতা বলে কিছু বানাননি। তবে তিনি খুব করুণাময়। সেটা ঠিক আছে। আমেরিকার প্রথম তিনজন প্রেসিডেন্ট এমন ছিলেন। কিন্তু এখন শুধু আমেরিকা নয়, পুরো পাশ্চাত্যে তাদের নতুন কালেমা, God the Father, God the Son, God the holy Ghost (পিতা খোদা, পূত্র খোদা, পবিত্র আত্মা খোদা)। কুরআন মাজীদে পরিষ্কার কথা,

 وَلَا تَقُوْلُوْا ثَلَاثَةٌ اِنْتَهُوْا خَيْرًا لَّكُمْ

‘তিন বলো না। থাম। এটা তোমাদের জন্য ভালো হবে।’ -... কত শক্ত কুরআন শরীফের শব্দ! তাদের কাছে সত্য না হলেও পালানোর পথ নেই।

আমার কাছে ‘ইসলাম’ নামে দুটো বই আছে। একজন অস্ট্রেলিয়ান মানুষ। তিনি মুসলমান হয়েছেন। নাম রেখেছেন মুহাম্মাদ থম্পসন। তিনি তার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। খ্রীস্টবাদে খোদা তিনজন। তিনজনে একজন। যদি বলা হয়, আসল খোদা হল আল্লাহ, মাঝারি খোদা হল পূত্র, তৃতীয় খোদা হল পবিত্র আত্মা তাহলে কিছুটা হলেও ফিলোসফিটা দাঁড় করানো যেত। কিন্তু তারা বলে যে, না। একই খোদা। তখন যদি বলেন যে, মরিয়মের পেটে যে খোদা ছিল, সেটা কোন খোদা? যদি আসল খোদা সেটা হয়, তাহলে তখন বাইরে কে ছিল? তারা তখন বলবে, এত প্যাঁচানো কথা বলবেন না। প্যাঁচানো কথা কি আপনি বলেন, না তারা বলে? আল্লাহ বলেন,

 الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِي أَنْزَلَ عَلٰى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَلْ لَّه‘ عِوَجًا

‘সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি নিজ বান্দার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে কোনো রকমের কত্রুটি রাখেননি।’ -...কুরআন মাজীদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর মধ্যে কোনো প্যাঁচানো কথা নেই।

ত্রিত্ববাদের এ কথাটা বিশ্বাস করতে যে কোনো শান্ত ভদ্র মানুষের কষ্ট হয়। একই খোদা তিনটা।

তারা আবার বলে, সব শিশু গোনাহের মধ্যে জন্মগ্রহণ করে। ইসলাম বলে, তারা পবিত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করে। ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে এসেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মের ৫৭০ বছর আগে। এখন তার আগে যারা দুনিয়ায় ছিল, তাদের মুক্তির কী উপায় হবে? হাজার হাজার খ্রীস্টান এই দুঃখে মরে। তারা তাদের ধর্মের মৌলিক কথাগুলোকে মানতে পারে না। আমাদের উলামায়ে কেরাম বলেন যে, আসলে বর্তমান খ্রীস্টান ধর্ম আর ঈসা আলাইহিস  সালাম-এর ধর্মের মধ্যে কোনো মিল নেই। পল এটাকে বিকৃত করেছে।

আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামের সৌন্দর্য, সরলতা, সাদাসিধেভাব অকল্পনীয়ভাবে তাদেরকে আকৃষ্ট করেছে। খ্রীস্টান ধর্মের বিকৃত অবস্থা তাদের সমাজের ভদ্র কেউ মানতে পারে না। খোদা ক’জন? বলে, একজন। এটা একত্ববাদী ধর্ম। কীভাবে? তিন খোদায় এক খোদা। হিন্দুরা বলে, তারাও এক খোদায় বিশ্বাস করে। তবে তিনি তিন মূর্তিতে প্রকাশিত। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব - এই তিন মূর্তি এক। সব ভেজালে ভরা!

নিউজিল্যান্ডের যে কিতাবের কথা আমি বলছিলাম, তার একটা বই২ লিখেছেন থমপসন। তিনি খ্রীস্টান থেকে মুসলমান হয়েছেন। আগে নাম ছিল পিটার থমপসন। মুসলমান হওয়ার পর নাম রেখেছেন মুহাম্মাদ ফারহান থমপসন। তিনি খুব সুন্দর লিখেছেন। ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ‘আমি একটা শ্রমিক পরিবারের সন্তান। আমার পরিবারের সবাই নিয়মিত চার্চে যেত। সপ্তাহে একদিন। পরবর্তীতে তারা আমাকেও নিয়মিত চার্চে নিয়ে যেত। আমি যখন বড় হলাম, চার্চের নানরা আমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারত না। তখন তারা আমাকে মারধর করত। এই যে তাদের ধর্মের এই প্যাঁচানো কথা, তিন খোদায় এক খোদা, এটা আমার ভালো লাগত না।’

আমরা খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, মুহাম্মাদ থমপসন এখন নিউজিল্যান্ডে থাকেন। আমরা তাকে টেলিফোন করলাম। তিনি ধরলেন। কথা হল। আমরা তার সাথে দেখা করতে চাইলাম। সময় ছিল না। পরদিনই আমরা ঢাকা ফিরে এসেছি। দেখা করা সম্ভব হয়নি। তিনি তার বইয়ে লিখেছেন, ‘আমার নাম ছিল গ্রাহাম পিটার থম্পসন। আমি জন্মেছি মেলবোর্ণ শহরে। ১৯৫৮ সালে। আমি আমার আব্বা-আম্মার আট সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। আমরা সবাই ক্যাথলিক স্কুলে পড়াশোনা করেছি। পরবর্তীকালে আমাকে অল্টার বয় (Alter Boy) বানানো হল। অল্টার শব্দের অর্থ যেখানে পূজার অর্ঘ্য থাকে। এর মানে চার্চে আমার অবস্থান আরো উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হল। আমার ছোটবেলা ভালোই কাটল। কিন্তু যখন বড় হতে লাগলাম, তখন দেখলাম খ্রীস্টান ধর্মের অনেক কিছুই আমার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। আমি জানার চেষ্টা করলাম। প্রশ্নের জবাব পেলাম না। আমার মন সন্তুষ্ট হল না।’ এই যে কথাগুলো, এটা যারা চিন্তা করে, তাদের শতকরা আশি ভাগের মধ্যেই কাজ করে।

একই জায়গায় একই মহল্লায় আরেকটি বই পেলাম। এ বইয়ের লেখক ফ্রেডেরিক ম্যাথিওসন ড্যানি। তিনি মুসলমান হয়েছেন কিনা জানি না। কিন্তু তার বইয়ের লেখা পড়ে অকল্পনীয় একটা মহব্বত হয়ে গেল। তিনি ইন্দোনেশিয়ার কথা লিখেছেন। সেখানে কুরআন শরীফ সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন যে, বিষয়টা তার কাছে

অদ্ভূত লেগেছে। শুধু কুরআন শরীফের উপর পঁচিশ-তিরিশ পৃষ্ঠা লিখেছেন। কী পরিমাণ স্টাডি করেছেন এই প্রফেসর! নিউইয়র্কের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। দেখার জিনিস হল, কত বড় বড় কাজ   হচ্ছে, আমাদের খবর নেই। আমাদের ধর্মের গুণাগুণ বিধর্মীরা প্রকাশ করছে।

আরেকজন নতুন মুসলমান। তার নাম মুরাদ হফম্যান (Murad Hofmann)। আসল নাম কি জানি না। মুসলমান হওয়ার পর নাম রেখেছেন মুরাদ। পারিবারিক টাইটেল হফম্যান। খুব সুন্দর বই লিখেছেন। তিনি একজন জার্মান। মুসলমান হওয়ার পরও সে দেশের সরকার তাকে আলজেরিয়া, লিবিয়ায় রাষ্ট্রীয় দূত বানিয়েছে। তিনি আল্লাহর কুদরত সম্পর্কে লিখেছেন। সারা দুনিয়ায় কম্পিউটারের বাদশা বলা হয় বিল গেটসকে। তিনি বলেন, আল্লাহ পাকের কুদরত আর কী তালাশ করবে? একটা বুয়া রাস্তার পাশে ঝুপরির মধ্যে সন্তান প্রসব করল। এই শিশুটা বড় হয়ে হয়ত রিক্সাওয়ালা হবে। এখন এই রিক্সাওয়ালা যখন রিক্সা চালায়, তখন সে দেখে সামনে থেকে একটা গাড়ি আসছে। গাড়িটা আসার আগে সে ডান দিকে যেতে পারবে কি পারবে না - এ হিসেব নিকেশগুলো সে খাতা-কলম নিয়ে লিখে লিখে করে, নাকি ব্রেনের মধ্যে করে? তাতে এটাই প্রমাণ হয় যে, কম্পিউটার জগতের বাদশাহ বিল গেটসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারও ব্রেনের কাছে কিছু না। এই শিশুর মস্তিস্ক পাওয়ারফুল বেশি নাকি বিলগেটসের কম্পিউটার? ইসলামের পক্ষে কত কথা, আমাদের খবর নেই।

আল্লাহ তাআলার কুদরত বিষয়ে এই আয়াতটা নিয়ে খুব আলোচনা হয়,

 وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُوْنَ ৫১

‘আকাশকে আমি বানিয়েছি আমার হাতে। আমি এর সম্প্রসারণকারী।’ -...  এখানে مُوْسِعُوْنَ মানে সম্প্রসারণকারী। সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত কুরআনের ইংরেজি তরজমা দেখলে এ আয়াতের অর্থ পাওয়া যায়, And the sï, I created it with my Hands and certainly I am the expander thereof. বলার ভঙ্গিটা কি! এ আয়াতের ব্যাপারে মুসলমান বিজ্ঞানীরা বলেন, স্পেস (Space) আমাদের থেকে কতটুকু দূরে? তোমার আমার ফাঁকা জায়গাটা স্পেস। আমরা পুরো স্পেসের মধ্যে আছি। এখন এই স্পেস উপরে কত দূর পর্যন্ত আছে? চাঁদ হল পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী। দূরত্ব ২৩৮০০০ মাইল। ব্যাস কত? ২১৬০ মাইল। পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ৮০০০ মাইল। সূর্যের ব্যাস ৮৬৫০০০ মাইল। সুবহানাল্লাহ। কুরআন শরীফে কত জায়গায় আছে, সূরা নাবার মধ্যে আল্লাহ বলছেন,

 وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَّاجًا

‘আমি তোমাদেরকে একটা গনগনে সূর্য দিয়েছি।’ কেমন গনগনে? পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ৮০০০ মাইল। সূর্যের ব্যাস ৮৬৫০০০ মাইল। ভেতরে জায়গা বেশি কার? পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের ভেতরের জায়গা তের লক্ষ গুণ বেশি। কী অবস্থা হয় তাতে? সারা দুনিয়ার আলো ও তাপের প্রয়োজন আল্লাহ তাআলা এক সূর্য দিয়ে পূরণ করেন। সূর্যকে যদি আমরা একটা ফুটবল মনে করি, তাহলে এই মসজিদের এক কোণায় সূর্য, আরেক কোণায় একটা সর্ষে দানার মত পৃথিবী। সূর্যের আলো চারিদিকে ছড়াচ্ছে। পৃথিবী এ আলোর কতটুকু পায়? বৈজ্ঞানিকভাবে এটারও হিসেব করা হয়েছে। সূর্যের আলোর দু’শ কোটি ভাগের এক ভাগ পায় সারা পৃথিবী। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ছোট একটা দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। এখানে ভরদুপুরে যদি কাউকে খালি গায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, তাহলে তার কেমন লাগবে? কি বানিয়েছেন আল্লাহ তা’আলা! সুবহানাল্লাহ! এরপরের কথা আরো অদ্ভুত। স্পেসে কী আছে?

দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ তারার মধ্যে নয়টা এমন আছে যারা তারা না। জমিন থেকেই বোঝা যায়। আজকাল পশ্চিম আকাশে দেখা যায়। কয়েকদিন পর সেটাকে আবার পূর্ব আকাশে দেখা যাবে। এখন মাগরিবের পর দেখা যায়। কুরআন শরীফে আছে, النجم الثاقب ঐটার আলোকশক্তি বিদীর্ণকারী। সূর্য হল বিদীর্ণকারী তারকা। সূর্য ডোবার পর পশ্চিমাকাশে যেটাকে দেখা যায়, সেটা হল একটা গ্রহ। ইংরেজিতে সেটার নাম হল ভেনাস (Venus)। বাংলায় বলে শুক্র গ্রহ। সেটার অবস্থানের কারণে পৃথিবী থেকে কয়েকমাস পূর্বাকাশে দেখা যায়। সূর্য উঠে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ থাকে। তখন সেটাকে বলে মর্নিং স্টার (Morning Star, প্রভাতি তারা)। আবার কয়েকমাস পশ্চিমাকাশে থাকে। তখন সেটাকে বলে ইভিনিং স্টার (Evening Star, সন্ধ্যা তারা)। পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব কয়েক কোটি মাইল। এভাবে পৃথিবীর নিকটতম তারার দূরত্ব কত? সূর্য একটা তারা। এর দূরত্ব নয় কোটি তিরিশ লক্ষ মাইল। আলোর গতি হচ্ছে প্রতি সেকেণ্ডে ১৮৬০০০ মাইল। আর শব্দের গতি হল প্রতি ঘণ্টায় ৮০০ মাইল। সেকেণ্ডে ১১৫০ ফুট।

আমরা এখন মোবাইলে আমেরিকায় কথা বলি। এখানে কিন্তু শব্দকে শব্দের গতিতে পাঠানো হয় না। শব্দটাকে প্রথমে মাইক্রোফোনের মধ্যে বিজলীর গতিতে রূপান্তরিত করা হয়। বিজলীর গতিতে শব্দটা আমেরিকায় যায়। সেখানে বিজলীর গতি থেকে শব্দটা আবার শব্দের গতিতে ফিরে আসে। শব্দের গতিতে গেলে তো ৮০০ মাইল যেতে এক ঘণ্টা লাগবে। আমেরিকা ১২০০০ মাইল দূরে। কয় ঘণ্টা লাগবে শব্দ কানে পৌঁছতে? আপনি এ প্রান্ত থেকে বললেন, ‘হ্যালো কেমন আছেন?’ এই হ্যালো শব্দের গতিতে গেলে অপর প্রান্তে পৌছবে কয়েকদিন পর। এটা আল্লাহ পাকের একটা কুদরত!

শব্দের গতি অনেক কম। শব্দকে আমরা মাইক্রোফোনের মাধ্যমে বিজলী বানাই। এরপর ১৮৬০০০ মাইল গতিতে পাঠাই। কত নেয়ামতের ছড়াছড়ি! এ গতিতে চললেও সূর্যের আলো পৃথিবীতে আসতে সময় লাগে সাড়ে আট মিনিট। সূর্যের পরের যে নক্ষত্র, সেটার নাম প্রক্সিমা সেঞ্চুরি (Proxima Centauri)। সেখান থেকে আলো আসতে সাড়ে চার বছর লাগে। কত সুবহানাল্লাহ বলবেন!

অনেকগুলো তারকা নিয়ে আমাদের তারকাজগত। এ জগতের একজন সদস্য সূর্য। আরেকজন সদস্য হচ্ছে প্রক্সিমা সেঞ্চুরিই। এরকম সদস্য আরো কতজন আছে? দশ হাজার কোটি। সুবহানাল্লাহ। এখন যদি কেউ এই মসজিদের সামনে খোলা আকাশে উপরের দিকে যেতে পারে, তাহলে কত দূর পর্যন্ত সে যেতে পারবে? একশ কোটি বছর আলোর গতিতে চললেও এমন কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না, যেখানে লেখা আছে, এটা আকাশের সীমানা। কত সুবহানাল্লাহ বলবেন!

কতদূর অগ্রগতি হয়েছে? আগে মহাকাশ সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। এখন ধারণা হয়েছে। আলোর গতিতে একশ কোটি বছর চললেও তুমি আকাশের কোন সীমানা পাবে না। মহাকাশ সম্পর্কে শুনে আমরা কতবার সুবহানাল্লাহ বলব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযসাল্লাম হযরত জুয়াইরিয়া রা.-এর মাধ্যমে আমাদেরকে শিখিয়ে রেখেছেন,

 سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ

কত বার সুবহানাল্লাহ বলব, এটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম। সুবহানাল্লাহ কত বার?   عَدَدَ خَلْقِهِ তার সৃষ্টি সংখ্যা বরাবর। আল্লাহু আকবার!

বর্তমান যুগের একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী হচ্ছেন স্টিফেন হকিং (Stephen Hawking)। A Brief History of Time বইটা তার লেখা। এখনো জীবিত আছেন। পুরোপুরি অচল। হাত-পা বাঁকা। কথাও বলতে পারে না। হুইল চেয়ারে চলাফেরা করানো হয়। চরম পর্যায়ের লুলা, বোবা। কিন্তু আল্লাহ পাক তাকে এ অবস্থায় রাখার পরও তাকে দিয়ে অনেক কাজ নিচ্ছেন। বিজ্ঞানের জগতে তিনি একজন মহাপুরুষ। মহাকাশ সম্পর্কে অনেক তথ্য তিনি এ বইয়ে জমা করেছেন। আল্লাহপাক নিজে বলেছেন,

أَفَلَمْ يَنْظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا  وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوْجٍ ৫

‘তারা কি তাদের মাথার উপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না কীভাবে আমি সেটিকে বানিয়েছি এবং কীভাবে সেটিকে সাজিয়েছি? তাতে কোনো ছিদ্র নেই।’ -... يَنْظُرُوا তো আমরা করিই। চিন্তাও করি। কিন্তু চিন্তার সামগ্রী কোথায়?

যাক, বিজ্ঞানের এসব আবিষ্কার কারা করেছে? বিজ্ঞানীরা। তারা কুরআন শরীফের এসব আয়াত নিয়ে গবেষণা ঠিকই করছে। কিন্তু বেশিরভাগেরই আল্লাহর নেক বান্দাদের সাথে মেলামেশা নেই। তাদের কাছে প্রশ্ন করলে তারা বোকা বনে যায়। আমি যে আয়াত আলোচনা করলাম,

 وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُوْنَ

‘আকাশকে আমি বানিয়েছি আমার হাতে। আমি এর সম্প্রসারণকারী।’-... তারপরের আয়াত হচ্ছে,

وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ فَفِرُّوْا إِلَى اللهِ ۖ إِنِّي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ مُبِيْنٌ

‘প্রতিটি বস্তুকে আমি করেছি জোড়া জোড়া, যেন তোমরা চিন্তা কর। আল্লাহর দিকে পালাও। আমি তোমাদের জন্য তার কাছ থেকে আসা একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী।’ -... আল্লাহর দিকে পলায়ন কর। Flee towards Allah| ঋষু মানে ওড়া। আর  ঋষবব মানে পলায়ন করা।

 فَفِرُّوْا إِلَى اللهِ

‘আল্লাহর দিকে পলায়ন কর’। কোথা থেকে কোথায় চলে গেলেন! আল্লাহপাকের আসল উদ্দেশ্য কী? কুরআন শরীফে আরেক জায়গায় আছে,

الَّذِينَ يَذْكُرُوْنَ اللهَ قِيَامًا وَقُعُوْدًا وَ عَلٰى جُنُوْبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُوْنَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহর স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে ও বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই। তুমি আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।’ -... এখানেও একই কথা। প্রথমে বলেছেন, ‘তুমি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই।’ তারপর, ‘তুমি আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।’ কোত্থেকে কোথায় চলে গেলেন! একজায়গায় বলেছেন, فَفِرُّوْا إِلَى اللهِ - ‘আল্লাহর দিকে পলায়ন কর।’ আরেক জায়গায় বলেছেন, فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ - ‘তুমি আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।’- ... আল্লাহ পাকের আসল উদ্দেশ্য কী। আল্লাহর যিকির। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে উত্তম নেক আমলের তাওফীক নসীব করুন। 

[মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া  মসজিদ, হযরতপুর, কেরাণীগঞ্জ]

১৮.১১.১৪৩৫ হিজরী ১৪.০৯.২০১৪ ঈসায়ী

টীকা

1 A person who believes that God created the universe and then abandoned it, assuming no control over life, exerting no influence on natural phenomena and giving no supernatural revelation.

২ বইটার নাম বেসিক প্রিন্সিপ্যাল্স অব ইসলাম (Basic Principles of Islam, ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহ)। ইসলামিক ইনফরমেশন সার্ভিস, অকল্যান্ড থেকে প্রকাশিত।