হিজড়া সম্প্রদায় ও তাদের অধিকার

Author Topic: হিজড়া সম্প্রদায় ও তাদের অধিকার  (Read 1981 times)

Offline tamzid_120

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 96
    • View Profile
হিজড়া সম্প্রদায় ও তাদের অধিকার
যখন একটা শিশু জন্ম নেয় তখন থেকে পরিবারের সবাই প্রথমে তার লিঙ্গ শনাক্ত করে। অর্থাৎ শিশুটি নারী অথবা পুরুষ এটাই আগে দেখা হয়। সে অনুযায়ী আত্মীয়স্বজন তার জন্য উপহার কিনে নিয়ে শিশুটিকে দেখতে আসে। বিভিন্ন দেশে মেয়েদের জন্য গোলাপী রঙের বা রঙচঙা পোশাক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং ছেলেদের জন্য নীল রঙের বা একরঙা দ্রব্য ব্যবহার করা হয়। ছোটবেলা থেকেই একটা শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পরিবার থেকেই তার নারী-পুরুষের ভিন্ন দায়িত্ব কর্তব্য চাল-চলন বুঝিয়ে দেয়া হয়। মেয়েদের হাতে খেলনা হিসেবে পুতুল দেয়া হয়, ছেলেদের খেলনা দেয়া হয় গাড়ি, বন্দুক বা ফুটবল। কিছু কিছু শিশু আছে যাদের দুই পায়ের ও দুই কানের মাঝখানে ভিন্নতা দেখা যায়। ওরা নারী বা পুরুষ কারো মতোই নয়। এই ধরনের শিশু লিঙ্গ বৈকল্য, ট্রান্স জেন্ডার বা হিজড়া

হিজড়া কথাটার শাব্দিক অর্থ ওসঢ়ড়:বহপব- অর্থাৎ একজন অক্ষম ক্লীব, নপুংশক বা ধ্বজভঙ্গ। বাংলাদেশ তথা বিভিন্ন দেশের হিজড়াদের মতে তারা জন্মগতভাবেই একাধারে স্ত্রী ও পুংলিঙ্গ সংবলিত (বা উভয় লিঙ্গ) প্রাণী। তবে প্রতিটি লিঙ্গেই অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট। এদের ভেতর কেউ কেউ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্ত্রী অথবা পুরুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এভাবে আমাদের দেশের অনেকেই স্ত্রী অথবা পুরুষ লিঙ্গ ধারণ করে বসবাস করছে।

বাংলাদেশের এমনকি পৃথিবীর বেশিরভাগ হিজড়াই তাদের এই অস্বাভাবিকতাকে ঢেকে বা লুকিয়ে রাখে এবং যে চেহারাটা বাইরে থেকে প্রকট দেখা যায় সেই লিঙ্গে আত্মপ্রকাশ করে বলে বাইরের মানুষ জানতে পারে না। এই কারণেই আমাদের দেশে আসলে কতজন হিজড়া আছে সেটার সার্বিক তথ্য বের করা সম্ভব নয়। যে সব ক্ষেত্রে এই বৈকল্য অন্তত প্রকট অর্থাৎ ঢেকে রাখার মতো নয় এবং বাইরে থেকে বোঝা যায়, কেবল সেক্ষেত্রেই মানুষ নিজেকে হিজড়া হিসেবে প্রকাশিত করে এবং পরিবার থেকে বের হয়ে যায়। হিজড়াদের মধ্যে প্রায় সবাই তারা নিজেদের শরীরকে নিজেরাই ঘৃণা করে। অনেকেই নিজেরাই নিজেদের অসহায় এবং ভিকটিম বলে মনে করে। এদের মধ্যে অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে এবং অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকে আবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আজকাল বিভিন্ন দেশে শত শত পরিবার তাদের হিজড়া সন্তানদের ভালবাসা দিচ্ছে এবং তাদের দুর্বিষহ বেদনাময় জীবন থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে। শিশু বেলা থেকেই যখন ওদের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তখন থেকেই ওরা কাপড় চোপড় পরে যৌনাঙ্গ ঢেকে রাখার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ হিজড়ারাই সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি পরে থাকতে পছন্দ করে এবং গহনাও পরে থাকে। অনেকে পরচুলা ব্যবহার করে এবং আবার পুরুষের পোশাকও পরে ঘুরে বেড়ায়। ওদের বেশিরভাগই মনে করে, হিজড়া হয়ে জন্ম নেয়াই একটা লজ্জার ব্যাপার। লোকে তাদের আড়চোখে দেখে কটাক্ষ করে। সব ক্ষেত্রে তারা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। তারা লেখাপড়া চাকরিসহ সমাজের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক পরিবারে হিজড়া জন্মানোর পর মা-বাবা ও তাদের নিয়ে সমস্যায় পড়েন এবং ঘৃণা ও লজ্জার কারণে নিজের সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই হিজড়া সম্প্রদায়ের কাছে থেকেই পাঠিয়ে দেন। হিজড়াদের অনেকের কাছেই প্রশ্ন করে জানা গেছে যে তারা তাদের বাবা-মা সম্পর্কে কিছুই জানে না। বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর যে কোন দেশে হিজড়া হয়ে কেউ জন্মগ্রহণ করলেই তাকেই বড় এক ধরনের আর্থসামাজিক চাপ বা ধকলের মধ্যে জীবন-যাপন করত হয়। তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং সাধারণ জনগণ দ্বারাও বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে।

কিরণ (আসল নাম নয়) ছোটবেলায় ছেলে শিশু হয়েই জন্মগ্রহণ করেছিল। সে যখন ক্লাস সেভেনে ওঠে তখন তার শরীরের মধ্যে একটা অন্যরকম পরিবর্তন লক্ষ্য করে। তার বুকটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলো এবং লিঙ্গের নিচে আরও এটি ছিদ্রের মতো তৈরি হয়ে গেল। ও খুব হতাশায় ভুগছিল পরিবারের কারও সঙ্গেই যে এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারছিল না। কিরণ যখন এইটে ওঠে রীতিমতো তার বুক এত বেশি বড় হয়ে গেল যে টাইট কাপড়ে চ্যাপ্টা ব্যান্ড দিয়েও চেপে রাখতে পারছিল না। একদিন তার মা বিষয়টি লক্ষ্য করে হতাশ হলেন। বাবাকে জানানোর পর তাকে নিয়ে সবাই কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তবে ততদিনে তার দাড়ি-গোঁফ সব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ডাক্তার বললেন, তার যৌনাঙ্গ আরও একটু স্পষ্ট হলে তাকে স্ত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে অস্ত্রোপচার করতে হবে। তবে তার দাড়ি-গোঁফ কমিয়ে আনতে ডাক্তার হরমোন প্রেসক্রিপসন দিয়েছেন। কিরণের বাবা-মা আর্থিক অবস্খা বেশি ভাল ছিল না বিধায় ছেলের চিকিৎসা করাতে পারেনরি। ওকে নিয়ে সবার কাছে অপ্রস্তুত হতো বিধায় ঘর ছেড়ে হিজড়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করে। কিরণ এখন এয়ারপোর্টের পথে যেতে হাতের বাঁয়ে রাত ৮টার পর রাস্তায় দাঁড়ায় এবং তার খদ্দের এলে তার যৌনতা বিক্রি করে খুশি করে কিছু পয়সা আয় করে জীবন-যাপন করে।

আমেরিকাতে জর্জ নামে একটি ছেলের জন্মের ১৫ মাস পর থেকেই শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল এবং ধীরে ধীরে সে বালক থেকে বালিকা হয়ে গেল। পরিবার থেকে সবাই তাকে বোঝাল যে, তার পুরুষাঙ্গটা সৃষ্টিকর্তার একটা ভুল ছিল তাই সে ভুলটাকে শুদ্ধ করে তাকে পুনরায় নারী বানিয়ে দিয়েছে এতে লজ্জা বা দু:খ পাওয়ার কিছু নেই। জর্জের জন্য চিকিৎসা এমনকি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। সে এখন নাম পাল্টেছে, পোশাক পাল্টেছে, এখন পুরোপুরি একজন নারী। আমাদের দেশেও চিকিৎসার সুযোগ পেলে অনেকেই নারী বা পুরুষ হিসেবে জীবন-যাপন করতে পারত।

আমাদের দেশে একটা হিজড়া বলেছিল, ‘আমি শার্টের নিচে ব্রা পরে স্কুলে গিয়েছিলাম বলে স্যার প্রচণ্ড মেরেছিল। তারপর থেকে আর স্কুলেই যাই না।’ হিন্দু ধর্মে হিজড়া সম্প্রদায়কে বিশেষ এক ধরনের কাস্ট হিসেবে ধরা হয়। তামিলনাড়ুতে এপ্রিল-মে মাসের দিকে হিজড়ারা দিনব্যাপী ধর্মীয় উৎসব পালন করে। ভারতে এবং বিভিন্ন দেশে এদের লোভী বয় বলা হয়। কোনকালেই কোন দেশেই হিজড়াদের কোন সম্মান কেউ দেয়নি। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবেই স্পষ্ট বলছে¬
‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্খিতিজনিত আওত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার।’

এছাড়াও মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা হলো : দাসত্ব হতে মুক্তির অধিকার, ভোটের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, কাজের অধিকার, মানসম্মত জীবন-যাপনের অধিকার, আইনের আশ্রয় ও নির্যাতন থেকে মুক্তির অধিকার এবং বিবাহ ও পরিবার গঠনের অধিকার।

এরপর দাসত্ব ব করতে, বর্ণবৈষম্য রোধ করতে, নির্যাতন রোধ করতে, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার অর্জন করতে, নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ করতে এবং শিশুর অধিকার সুরক্ষায় একগুচ্ছ চুক্তি বা সনদ দরকার হয়েছে।

কয়েক বছর হয় সেলফ হেলপ গ্রুপ হিসেবে কিছু সংগঠনের আত্ম প্রকাশ ঘটেছে যারা হিজড়া সম্প্রদায়ের অধিকার ও তাদের জন্য বিশেষ আইনের কথা বলছে। বাঁধন হিজড়া সংঘ তাদের মধ্যে অন্যতম। বাঁধনের সদস্যরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন রয়েছে। হিজড়াদের যৌনতা গতানুগতিক নয়। এটা একটু ভিন্ন। বলতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা এদের মতো জীবন-যাপন করে যা ইসলাম প্রধান দেশ হিসেবে জনগণ সহজে মেনে নেয় না। এমন কি ব্রিটিশ শাসন আমলে হিজড়াদের বিতাড়িত করা হয়েছে এবং হিজড়াদের যৌনতার বিরুদ্ধে আইন করা হয়েছে। ব্রিটিশ আইনে হিজড়াদের যৌনতাকে সডোমি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং পেনালকোট এ ধারা ৩৭৭ তে বলা হয়েছে যে, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই যদি আইন হয় তাহলে তারা কোথায় যাবে। ওদের যৌনতার অধিকার এবং মানবাধিকার কে নিশ্চিত করবে যদি রাষ্ট্র না করে। পরিবারে সম্মানের সঙ্গে বসবাসের অধিকার, চাকরির অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার এবং তাদের ভালবাসা পাওয়ার অধিকার আছে। তারা কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় বলে অনেকেই

দোকানে দোকানে টাকা চাঁদা নিয়ে জীবন-যাপন করের আবার অনেকেই বাঁচার জন্য যৌন কাজের সঙ্গে লিপ্ত হয়। তবে যদি ওদের কাজের সুযোগ দেয়া হয় তারা তাদের অনেকেই যৌন পেশা থেকে ফেরত আসবে বলেছে। বর্তমানে রমনা পার্কে, কুড়িল বাড্ডা, পুরান ঢাকা, খিলগাঁও মার্কেটের পেছনে ভূঁইয়াপাড়াসহ অনেক এলাকাতেই হিজড়া সম্প্রদায়ের সংঘবদ্ধভাবে বসবাস। এদের অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করে। বাঁধন হিজড়া সংঘের সদস্যবৃন্দ এইডস প্রতিরোধের কিছু প্রকল্পে কাজ করে তাদের জীবন-জীবিকা চালাচ্ছে। তারা সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
MOHAMMAD TAMZID SIDDIQUE
DEPARTMENT OF REAL ESTATE
DAFFODIL INTERNATIONAL UNIVERSITY
CELL # 0 1 9 1 1 - 2 0 6 8 1 3
E-MAIL: tamzid@diu.edu.bd
          tamzid@rocketmail.com