জল সবুজের সন্দ্বীপে

Author Topic: জল সবুজের সন্দ্বীপে  (Read 138 times)

Offline SabrinaRahman

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 333
  • Never give up because great things take time
    • View Profile
জল সবুজের সন্দ্বীপে
« on: April 24, 2017, 12:01:01 PM »
জল সবুজের সন্দ্বীপে

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের ঠিক মাঝ বরাবর এক দ্বীপের নাম সন্দ্বীপ। নানা রকমের বিশাল বিশাল জাহাজের আনাগোনা এই দ্বীপকে ঘিরে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুংকার ছাড়ে সাগরের মাতোয়ারা ঢেউ। নদী আর মোহনার এক ঘোলাটে মিশ্রণ ধীরে ধীরে নীলাভ হয়ে হারিয়ে গেছে গভীর সমুদ্রে, যাওয়ার আগে রেখে গেছে অদ্ভুত সুন্দর সবুজ এক দ্বীপ। তাই আমাদের এবারের গন্তব্য এই জল-সবুজের সন্দ্বীপে। ইচ্ছে ছিল সন্দ্বীপের সাগরপারে তাঁবু টাঙিয়ে তারাভরা আকাশের নিচে কাটিয়ে দেব এক রাত। সেটাকে পূর্ণতা দিতেই রাতের আঁধারে ঢাকা ছেড়ে সীতাকুন্ডের কুয়াশাতে মিশিয়ে ফেললাম নিজেদের।
তখন শীতের শেষ সময়। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে সীতাকুন্ডের কুমিরা বাসস্ট্যান্ডে যখন বাস আমাদের নামিয়ে দেয় তখন ভোর পাঁচটা। এখান থেকে সন্দ্বীপ ঘাট প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। আমরা ১১ জন জোরপায়ে হাঁটা শুরু করলাম। সামনে বঙ্গোপসাগর আর পেছনে অটল পাহাড়কে রেখে যখন সীতাকুন্ডের সন্দ্বীপ ঘাটে পৌঁছাই তখনো ঘুম ভাঙেনি সূর্যের, আধভাঙা চাঁদের আলোয় চোখের সামনে অতিকায় বিশাল হয়ে ধরা দিল অনেকগুলো জাহাজের কালচে ঘুমন্ত শরীর। এত বিশাল বিশাল জাহাজ আগে সামনাসামনি দেখিনি, যেমন লম্বা তেমনই উঁচু। মানুষের তৈরি বিশালতা দেখে নিমেষেই যাত্রাপথের সব ক্লান্তি গায়েব হয়ে গেল। এই জাহাজগুলোকে নাকি কেটে ফেলার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে!! তাজ্জব ব্যাপার! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ কিনে এনে এখানে কেটে ফেলা হয়, সেই লোহা আবার চলে যায় বিভিন্ন লোহার কারখানায়! বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না-কাটতেই সকালের আবছা আলোয় নিজের সবটুকু সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হলো সন্দ্বীপ ঘাটের এক কিলোমিটার ব্রিজ, যেটা সোজা সাগরের দিকে চলে গেছে। সন্দ্বীপ যেতে হলে আমাদের এই ব্রিজ ধরেই শেষ মাথায় গিয়ে স্পিডবোটে উঠতে হবে।
সন্ধ্যার আগে আগে
সন্ধ্যার আগে আগে
চট্টগ্রাম থেকে আরমান, ফারুক, সুমন আর রাসেল পৌঁছামাত্রই শুরু হলো আমাদের আনন্দযাত্রা। দিন শুরু হলো জুনায়েদের বিখ্যাত স্পিডবোটের সেলফি দিয়ে। টানা ৩০ মিনিট সাগরের ওপর দিয়ে প্রায় উড়ে চলে এলাম জল-সবুজের সন্দ্বীপে। সেখানে ঘাটে আগে থেকেই আটটা মোটরসাইকেল অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। ওহ্! বলে রাখা ভালো, সন্দ্বীপে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এই মোটরসাইকেল, এ ছাড়া রিকশা আর হলুদ বেবিট্যাক্সি রয়েছে। ঢাকা থেকে বিদায় হওয়া ট্যাক্সিগুলো এখন প্রবল প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সাগরধোয়া দ্বীপটিতে।
সন্দ্বীপ এলাম আর বিখ্যাত বিনা শাহর মিষ্টি খাব না, এটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অগ্যতা ২০ টাকার মিষ্টি খাওয়ার জন্য পুরো এলাকাকে জানিয়ে দিয়ে ভোঁ ভোঁ করে রওনা দিলাম প্রায় ৩০ কিলোমিটারের দূরত্ব। এ তো বিকেলের গল্প...।
পশ্চিম আকাশকে লালের আবিরে রাঙিয়ে কুয়াশার মতো ধীরে ধীরে নামল রঙিন সন্ধ্যা। সে সন্ধ্যায় আমরা ছুটে গেলাম পশ্চিমপারের রহমতপুর সি-বিচে। বাংলাদেশে এই প্রথম আমি সবুজ সমুদ্রসৈকত দেখলাম। যত দূর চোখ যায় সমান ঘাসের মাঝে মাঝে নারিকেলগাছের কী দারুণ সুন্দর একটা সৈকত! প্রতিটি গাছই যেন একেকটা ওয়ালপেপার, হুট করে দেখলে মনে হবে দূরদেশের কোনো এক আয়েশি সৈকত অপেক্ষায় আছে অতিথিদের। এই সন্দ্বীপ এলেই আমাদের অতিথি হিসেবে বরণ করে নিয়েছে, তারার আলোয় তাঁবু টাঙিয়ে ঝিরঝিরে বাতাসের মাঝে হাসনাত আর আজমানে বার-বি-কিউ, কিংবা রাত দুইটায় খেজুরের রস-নারিকেল দিয়ে বাপ্পী-নাদিয়ার রান্না করা শিরনির স্বাদ ভোলার মতো নয়। শান্ত এক সাগরের পাড়ে রাতভর আগুন জ্বালিয়ে সৌরভ যে কয়লা বানিয়ে দিয়েছে, তার তাপে শীত তাড়িয়েছি তাঁবুর বাসিন্দারা। শাহেদের জুম লেন্সে তোলা তারার ছবিটাকে চাঁদ ভেবে যে উল্লাসে রাত মাতিয়েছি তা হয়তো সন্দ্বীপের কাঁকড়ার দল অনেক দিন মনে রাখবে।
ভোরের প্রথম আলো ছুঁয়ে গেল তাঁবু
ভোরের প্রথম আলো ছুঁয়ে গেল তাঁবু
ভোরের প্রথম আলো যখন নারিকেলগাছের মাথা ছুঁয়ে আমাদের তাঁবু স্পর্শ করল, তখন আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেললাম অবারিত এক সবুজ সৈকতের দিগন্তে, যেখানে রাখাল ভেড়ার পাল নিয়ে হেঁটে চলছে আরও সবুজের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায়। ঘাসে জমা শিশির মুক্তোকে হার মানিয়ে যখন সবটুকু আবেশ কেড়ে নিচ্ছে, ঠিক তখনই কলসি কাঁখে গায়ের কোনো এক বধূর দূরের এক টিউবওয়েল চাপার শব্দে মোহ কেটে যায় আমাদের সবার। এরপর হুড়হাড়, হইচই, আবার সাগর ডিঙিয়ে সন্দ্বীপকে বিদায় বলার আয়োজন।
বালুর সৈকত অনেক দেখেছি, কিন্তু এবার ঘাসের সৈকত মনের এক বিশেষ জায়গা দখল করে ফেলল। একবার পেছন ফিরে নিজের অজান্তেই নিজের কাছে প্রমিজ করে ফেললাম—এই দ্বীপে, এই নারিকেলতলে আবার আসব ভরা কোনো পূর্ণিমার আয়োজনে...

যেভাবে যাবেন
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে সীতাকুন্ডের সন্দ্বীপ ঘাটে নেমে যাবেন। সেখান থেকে স্পিডবোটে ৩০০ টাকা নেবে সন্দ্বীপ। সন্দ্বীপে যাতায়াত খরচ বেশি। কারণ, এখানে মোটরসাইকেল আর বেবিট্যাক্সি ছাড়া দূরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। এখানকার প্রতিটি পরিবারে কমপক্ষে একজন করে প্রবাসী আছেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। ফলে এই দ্বীপের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত। পর্যটক এখনো অনেক কম যায়, তবে সৈকতে ক্যাম্পিং করে নিরিবিলি রাত কাটাতে চাইলে এর থেকে ভালো জায়গা খুব কমই আছে।
Sabrina Rahman
Lecturer
Department of Architecture, DIU