উদ্যোক্তাবৃত্তি: প্রতিটি সমস্যাই একেকটি সুযোগ

Author Topic: উদ্যোক্তাবৃত্তি: প্রতিটি সমস্যাই একেকটি সুযোগ  (Read 408 times)

Offline Sultan Mahmud Sujon

  • Administrator
  • Hero Member
  • *****
  • Posts: 2620
  • Sultan Mahmud Sujon,Admin Officer
    • View Profile
    • Higher Education
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) আগ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এমন ধারণাই বদ্ধমূল ছিল যে, মেধাবীরা মূলত যুক্ত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা এবং নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনামূলক কাজের সঙ্গে। রাষ্ট্রকাঠামোর ধরন ও অর্থনীতির বিকাশের স্তর বিবেচনায় ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে ধারণাটি একেবারে অমূলক ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমূলক চরিত্র বদলে গিয়ে ক্রমে তা জনপ্রয়োজন ও জনদাবির অনুগামী হয়ে উঠতে বাধ্য হলে এবং একই ধারাবাহিকতায় অর্থনীতির বিকাশে ব্যক্তিখাতের ভূমিকা বৃদ্ধি পেতে থাকলে সমাজে মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রটিও ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে। দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যে নতুন চিন্তা ও জ্ঞান সৃষ্টি করছেন বা গবেষক যে নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনার জন্ম দিচ্ছেন, সেসবের প্রায়োগিক দিকটি নিশ্চিতে আরেক দল মেধাবী মানুষকে এগিয়ে আসতে হচ্ছে। রাষ্ট্র ও অর্থনীতির বিকাশমান প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ পর্যায়ে যুক্ত শেষোক্ত ওই মেধাবী গোষ্ঠীটিই হচ্ছে একুশ শতকের উদ্যোক্তা শ্রেণী, যাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির আইসিটি খাতের উদ্যোক্তারা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন বাংলাদেশের ভৈরবের পাদুকা কারখানার খুদে উদ্যোক্তারাও।

এখন কথা হচ্ছে, এ উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে উঠবেন? এরা কি কেবল আপন সামর্থ্যের ওপর ভর করেই এগোবেন, নাকি রাষ্ট্র ও সমাজও এদের সাহায্য করবে? এক্ষেত্রে সরল জবাব হচ্ছে— নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ একজন শিক্ষক বা গবেষককে যেমন সহায়তা করে, তেমনি সহায়তা একজন উদ্যোক্তারও প্রাপ্য। তবে সৃজনশীল শিক্ষক বা গবেষক যেমন ওই সহায়তার জন্য বসে থাকেন না, তেমনি সহায়তার অপেক্ষায় বসে থাকেন না একজন উদ্যোক্তাও। তবে শিক্ষক বা গবেষক সহায়তার অপেক্ষায় বসে থাকলে রাষ্ট্র বা সমাজের ক্ষতি হলেও আপাতভাবে তার নিজের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু এরূপ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার জন্য ক্ষতির বিষয়টি অনিবার্য। আর সে কারণেই উদ্যোক্তার ঝুঁকির পরিমাণ আর সবার চেয়ে খানিকটা বেশিই শুধু নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অপূরণীয়ও।

এ অবস্থায় একজন উদ্যোক্তা কীভাবে যাত্রা শুরু করবেন, কীভাবে এগোবেন, কীভাবে ঝুঁকি মোকাবেলা করে টিকে থাকবেন এবং সর্বোপরি কীভাবে নিজের সে উদ্যোগ দ্বারা আপন স্বার্থকে অতিক্রম করে গিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ তথা সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সমুন্নত করে তুলতে পারবেন, সেসব বিষয়ে এরই মধ্যে শিক্ষায়তনিক চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক নাম হচ্ছে ‘উদ্যোক্তাবৃত্তি’। তবে উদ্যোক্তাবৃত্তির বিষয়টি যতটা শিক্ষায়তনিক, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব অভিজ্ঞতানির্ভর। আর উদ্যোক্তার বিষয়ে সেই বাস্তব অভিজ্ঞতানির্ভর ধারণাগুলোকেই সম্প্রতি তুলে ধরেছেন মো. সবুর খান তার অ্যা জার্নি টুয়ার্ডস অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ গ্রন্থে। গ্রন্থটি একদিকে যেমন বাস্তব অভিজ্ঞতার অনুলিখন, অন্যদিকে তেমনি নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আগ্রহীদের জন্য এক ধরনের পাঠনির্দেশিকাও।

উদ্যোক্তাবৃত্তিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে পঠন-পাঠনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে খুবই সাম্প্রতিক। এটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তো নেই-ই, কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও সবে চালু হয়েছে পূর্ণাঙ্গ স্নাতক কর্মসূচির আওতাধীন একটি কোর্স হিসেবে মাত্র। জানামতে, উদ্যোক্তাবৃত্তির ওপর এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ স্নাতক কর্মসূচি চালু করেছে একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। আর এক্ষেত্রে গবেষণা ও শিক্ষায়তনিক চর্চার স্বল্পতার কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই বই-পুস্তক ও অন্যান্য প্রকাশনার সংখ্যাও খুবই সীমিত। এরূপ পরিস্থিতিতে সবুর খান অ্যা জার্নি টুয়ার্ডস অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ লিখে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্যোক্তাবৃত্তি-সংক্রান্ত শিক্ষায়তনিক চাহিদার প্রায় শূন্য জায়গাটিতে আলোকপাত করে একটি অনেক বড় দায়িত্বই পালন করলেন বৈকি!
উদ্যোক্তাবৃত্তির মতো পেশাগত বিষয়ে তাত্ত্বিকরা যখন গ্রন্থ লেখেন, তখন তারা তাদের উপস্থাপিত বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতা দানের জন্য নানা প্রামাণ্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি ও উদাহরণে সেটিকে আকীর্ণ করে তোলেন। কিন্তু এ গ্রন্থে লেখককে সে উদ্ধৃতি ও উদাহরণের একেবারেই আশ্রয় নিতে হয়নি। কারণ এতে উপস্থাপিত সব বক্তব্য তার নিজের অভিজ্ঞতারই প্রত্যক্ষ বিবরণ। ফলে উদ্যোক্তাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে কিংবা এ বিষয়ে সাধারণভাবে জানতে আগ্রহী যেকোনো পাঠকের জন্যই এটি হবে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। এটি পড়ে উদ্যোক্তাবৃত্তির ইতিহাস যেমন জানা যাবে, তেমনি চিন্তা করা সম্ভব হবে ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হতে চাইলে তার জন্য কী কী করণীয়। আর বিদ্যমান উদ্যোক্তারা নিজ নিজ শিল্প বা ব্যবসাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে লেখকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দেখতে পারেন এবং অনুমান করি, সেরূপ অনেকেই এ গ্রন্থ থেকে নিজেদের ব্যবসায়ের জন্য নানা ধরনের সূত্র, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা খুঁজে পাবেন।

নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই এখন চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরা চাকরিদাতা হতে চান; অর্থাত্ নিজেদেরকে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আগ্রহী। কিন্তু এক্ষেত্রে কীভাবে একটি নতুন শিল্প বা ব্যবসা শুরু করা যাবে, কোথায় বিনিয়োগ করলে তা নিরাপদ ও লাভজনক হবে, বিনিয়োগ করতে হলে তার জন্য কী কী বিষয় আবশ্যিকভাবে প্রতিপালনীয়, কীভাবে-কোত্থেকে পুঁজির সংস্থান হবে, কোথায়-কীভাবে বাজার অনুসন্ধান করতে হবে, সে বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কী করতে হবে ইত্যাদি বিষয় তাদের অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। অ্যা জার্নি টুয়ার্ডস অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ গ্রন্থটি উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী এরূপ শিক্ষিত তরুণদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক নির্দেশনা হিসেবে কাজে আসবে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যও এটি একটি মূল্যবান রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

একটি নতুন শিল্প বা ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তার জন্য পুঁজিই মূল সম্পদ নয়। তার আসল সম্পদ হচ্ছে, নেতৃত্বসুলভ গুণাবলি, উচ্চতর স্বপ্নের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, সময়কে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহারের সামর্থ্য, সমস্যার মুখে বিচলিত না হয়ে তা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলার মানসিকতা, অন্যের কাছ থেকে শেখার মনোবৃত্তি ইত্যাদি। আর এ সব বিষয়ই জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচ্য পুস্তকে লেখক অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় সাবলীল ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ গ্রন্থ থেকে শুধু সম্ভাব্য তরুণরা নয়, উদ্যোক্তা উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারবে বলে আশা করা যায়। আর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের যে প্রশিক্ষকরা বিভিন্ন তাত্ত্বিক গ্রন্থ বা ইন্টারনেটে পাওয়া টেক্সটের সাহায্য নিয়ে এত দিন পর্যন্ত উদ্যোক্তা উন্নয়নের কলাকৌশল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণার্থীদের ধারণাকে স্পষ্ট ও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, উল্লিখিত এ বইটিকে তারা হাতের কাছের তৈরি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন।

লেখক বইটিতে উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বে যিনি সফল হন বা যিনি তা হন না, তাদের উভয়ের জন্যই দিনের পরিধি ২৪ ঘণ্টা। এ ২৪ ঘণ্টা সময়কে যিনি যত সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারবেন, তিনিই হবেন সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তা। বিষয়টি অবশ্য শুধু উদ্যোক্তাবৃত্তির ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আর সেজন্যই আলোচ্য গ্রন্থটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন-সংক্রান্ত হলেও জীবনের অন্য নানা ক্ষেত্রেও এতে উল্লিখিত অভিজ্ঞতাভিত্তিক ধারণাগুলোকে নানাভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আর সে ধারণাগুলোকেও তিনি এমন হাতে-কলমে ব্যবহারের উপযোগী করে উপস্থাপন করেছেন যে, যেকোনো ব্যবহারকারীর জন্যই তা হবে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যময়। উদাহরণস্বরূপ, আগ্রহী উদ্যোক্তাদের জন্য গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশে তিনি ইন্টারনেটের ১৬টি ব্যবসায়িক লিংক, ৩২টি উদ্বুদ্ধকরণ লিংক ও ৩৬টি অনুপ্রেরণামূলক চলচ্চিত্রের উল্লেখ করেছেন। এ লিংক ও চলচ্চিত্রগুলো শুধু উদ্যোক্তাদের জন্য নয়, অন্যান্য সাধারণ পাঠকের জন্যও আগ্রহ ও অনুসরণের বিশেষ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (জিইডিআই) কর্তৃক প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক উদ্যোক্তা সূচক ২০১৬’ প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চিহ্নিত হয়েছে ১২৫তম স্থানে। তো, যে দেশের শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশই এখন চাকরি না খোঁজে উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী, সে দেশ উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এতটা পিছিয়ে থাকবে— এটি কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। তবে এজন্য দায়ী বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি বড় কারণ বোধহয় এই যে, কৃষি থেকে সবে শিল্প ও ব্যবসায় রূপান্তরমান এ দেশে তরুণরা উদ্যোক্তাবৃত্তির কাজটি কীভাবে শুরু করবেন, সে বিষয়ে তাদের সামনে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ধারণা করি, মো. সবুর খানের গ্রন্থটি উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাজমান সে শূন্যতা পূরণে অনেকখানিই সহায়ক হবে। আর নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক এ গ্রন্থে লেখক যে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গেই উল্লেখ করেছেন, উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হতে হলে প্রতিটি সমস্যাকেই একেকটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, বস্তুত সেটাই হতে পারে উদ্যোক্তা উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্র।


লেখক: পরিচালক, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি); প্রকল্প পরিচালক, ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (আইআইসি)
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি




Source: http://bonikbarta.net/bangla/news/2017-06-10/120358/%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF:-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%87-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97--/