বিশেষ সাক্ষাৎকার : মা মিং চিয়াং চীন হবে বাংলাদেশে এক নম্বর বিনিয়োগকারী দেশ

Author Topic: বিশেষ সাক্ষাৎকার : মা মিং চিয়াং চীন হবে বাংলাদেশে এক নম্বর বিনিয়োগকারী দেশ  (Read 188 times)

Offline Mrittika Shil

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 213
  • Test
    • View Profile
আজ ১ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৬৮তম জাতীয় দিবস। ১৯৪৯ সালের এই দিনে পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার অভ্যুদয় ঘটে। দিবসটি উপলক্ষে প্রথম আলো ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং চিয়াংয়ের সঙ্গে কথা বলেছে। চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী এই কূটনীতিক ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত চীন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি আসিয়ান-চায়না সেন্টারের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সংকট, বিনিয়োগ, বাণিজ্য-ঘাটতিসহ নানা বিষয়ে তাঁর মতামত তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম ও রোকেয়া রহমান
প্রথম আলো : গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের শুভেচ্ছা নিন। আমরা চীনের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।

মা মিং চিয়াং: শুভেচ্ছা জানানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমরাও বাংলাদেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চীন ও বাংলাদেশ তাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রথম আলো : চীন-বাংলাদেশের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মা মিং চিয়াং : চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে আমি খুবই খুশি। চীন যেমন প্রমাণ করেছে তারা বাংলাদেশের ভালো বন্ধু, বাংলাদেশও একইভাবে প্রমাণ করেছে যে তারা চীনের ভালো বন্ধু। দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সম্পর্ক নতুন নয়। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। ৪২ বছর আগে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সব সময় উচ্চ স্তরে বিরাজ করছে। দিনে দিনে এ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে। চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ চলতি বছরের প্রথমার্ধে ৭৯৮ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৃদ্ধির হার হচ্ছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। গত অক্টোবর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বাংলাদেশ সফর করার পর চীন বাংলাদেশের প্রথম কৌশলগত অংশীদারে পরিণত হয়। ওই সফরের সময় জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতাসহ ২০টির বেশি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সফরের সময় সরকারি ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্রায় চার হাজার কোটি ডলারের প্রাথমিক বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে। চীন বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন চীন বাংলাদেশের এক নম্বর বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হবে।

প্রথম আলো : রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে বাংলাদেশ এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হওয়া দরকার। আপনারা যদি বাংলাদেশের এক নম্বর বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হতে চান, তাহলে এ দেশের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ হতে হবে। পরিস্থিতি ভালো হলেই ভালো বিনিয়োগ করা সম্ভব। চীন কীভাবে এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবে?

মা মিং চিয়াং : বাংলাদেশের যেকোনো সমস্যা আমরা সহানুভূতির সঙ্গে দেখি। আমরা সব সময় বাংলাদেশ ও এর জনগণকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। আমরা দুই দেশের জনগণ ভাই-ভাই। তবে চীন কখনো বাংলাদেশের সঙ্গে বড় ভাইসুলভ আচরণ করে না। বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে ব্যাপারেও আমরা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ বছর আমি দুবার কক্সবাজারে যাই। প্রথমবার দেখেছি জায়গাটি খুবই সুন্দর। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। সমুদ্রসৈকতটিও খুব বড় ও সুন্দর। দ্বিতীয়বার যাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সপ্তাহ দু-এক আগে। তখন দেখি অবস্থা অনেক খারাপ। মিয়ানমার থেকে অনেক নতুন শরণার্থী এসেছে। এদের সংখ্যা অনেক। এদের না আছে খাবার, না আছে থাকার জায়গা। পলিথিন দিয়ে তৈরি ঘরে কোনো রকমে বসবাস করছে। পয়োব্যবস্থা বলতে কিছু নেই।

এ দেশের মানুষেরা এসব রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য অনেক কিছু করছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের প্রতি যে মানবিকতা দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসা করার মতো। রোহিঙ্গাদের প্রতি আমাদেরও সহানুভূতি আছে। চীন সরকারের পক্ষ থেকে তাদের তাঁবু ও কম্বল দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে, তাদের এ দুটি জিনিস এখন বেশি জরুরি। এখন বৃষ্টি হচ্ছে। কাজেই তাঁবু দরকার। বর্ষার পরই আসবে শীত। তখন তাঁবু ও কম্বল—দুটিরই খুব দরকার হবে। আমি মনে করি, রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা উচিত। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে।

প্রথম আলো : চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় চার হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে। এসব বিনিয়োগের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি?

মা মিং চিয়াং : আমরা চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। আমরা এ ব্যাপারে আমাদের সরকারকে তাগিদ দিচ্ছি। আমরা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল গড়ে তুলছি। দুই দেশের সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যেমন অষ্টম চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী এক্সিবিশন সেন্টার, পায়রা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলেছে।

প্রথম আলো : চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সহযোগিতার সম্পর্ক বেশ ভালো। কিন্তু তারপরও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে। দিনে দিনে এই ঘাটতি বাড়ছে। এই ঘাটতি কীভাবে দূর হবে?

মা মিং চিয়াং : আমরা জানি যে এই বাণিজ্য-ঘাটতি নিয়ে আমাদের বাংলাদেশি বন্ধুরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। আমার মনে হয় না ঠিক এই মুহূর্তে এই ঘাটতি দূর করা যাবে। আসলে বাংলাদেশ চীন থেকে কাপড় আর ভারী টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি কিনে থাকে। সেসব দিয়ে তারা পণ্য তৈরি করে অন্য দেশে বেশি দামে রপ্তানি করে। অন্য দেশ থেকে এসব কাপড় আর মেশিন কিনলে এই ঘাটতি আরও বেশি হতো। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ লাভবান হচ্ছে। বাণিজ্য-ঘাটতি কমানোর জন্য দুই দেশের সরকার কাজ করে যাচ্ছে। চীন প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি পণ্যকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। মুক্তবাণিজ্য এলাকা গড়ে তোলার চিন্তাভাবনাও আমরা করছি। আমরা বাংলাদেশ থেকে শুধু তৈরি পোশাকই আমদানি করতে পারি, তা নয়। আমরা আম, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাটজাত পণ্য এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক খাবারও আমদানি করতে পারি। আমি ধারণা করি যে ভবিষ্যতে চীনের বাজারে বাংলাদেশের আরও অনেক পণ্য প্রবেশ করবে। এভাবে আস্তে আস্তে বাণিজ্য-ঘাটতিও কমে আসবে।

প্রথম আলো : ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ককে আপনি কোন জায়গায় দেখতে চান, বিশেষ করে চীন যখন বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার?

মা মিং চিয়াং : চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ ও দৃঢ় হবে। আর এতে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হবে।

প্রথম আলো : চীন সরকার ‘দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোডের’ যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলুন।

মা মিং চিয়াং : ‘দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণা। এই ধারণা চীনের মস্তিষ্কজাত হলেও এখন আর তা একা চীনের নয়। বিশ্বের সব দেশই এখন পরস্পরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা আর সহযোগিতার মাধ্যমে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী। এই ‘দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড’ ধারণার মাধ্যমে চীন তার উন্নয়নের সঙ্গে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের উন্নয়নের যোগসূত্র রচনা করতে চাইছে। খ্রিষ্টপূর্ব চার শতকে সাউদার্ন সিল্ক রোডের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সভ্যতার সুফল চীন ও বাংলাদেশের জনগণ ভোগ করেছে। তারা একে অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছে। গত বছর চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় ‘দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যৌথ সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ উদ্যোগ দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতাকে দৃঢ় করবে বলে আমি মনে করি। চ্যালেঞ্জ কিছু থাকবে। তবে আশা করি, সব চ্যালেঞ্জ আমরা দূর করতে পারব।
Source:

http://www.prothom-alo.com/opinion/article/1335251/%E0%A6%9A%E0%A7%80%E0%A6%A8-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%8F%E0%A6%95-%E0%A6%A8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6