‘ভালো মানুষ হতে পারলে সাফল্য পেছনে ঘুরবে’

Author Topic: ‘ভালো মানুষ হতে পারলে সাফল্য পেছনে ঘুরবে’  (Read 353 times)

Offline Noor E Alam

  • Administrator
  • Jr. Member
  • *****
  • Posts: 94
  • Test
    • View Profile

গুলশান ক্লাবে অনুষ্ঠানটি তখনো শুরু হয়নি। শান্ত ভঙ্গিতে কক্ষে এসে ঢুকলেন সাদা শার্ট, জিনস ও কালো কোটি পরা একজন। মুখে সাদা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হাতে বন্ধুপত্নীকে উপহার দেওয়ার জন্য আনা শাড়ি। উঠে দাঁড়ালেন হলভরা লোকজন। জানলাম, ইনিই অধ্যাপক অচ্ছুত সামন্ত। তাঁকে সম্মানিত করতেই এই অনুষ্ঠান।

হতদরিদ্র ঘরে জন্ম নেওয়া অকৃতদার এই অধ্যাপক ভারতের ওডিশায় একদম একা হাতে গড়ে তুলেছেন দুটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়। কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি (কিট) ও কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্স (কিস)। কিট একটি পূর্ণাঙ্গ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যার বার্ষিক আয় ৩০০ কোটি রুপির ওপরে। কিন্তু যে কারণটি অধ্যাপক সামন্তকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়, তা হলো কিস। শিক্ষা দিয়ে দারিদ্র্যকে জয় করার এক ‘মেগা প্রজেক্ট’ হাতে নিয়েছেন তিনি। এখানে ১৫ হাজারের বেশি আদিবাসী শিক্ষার্থী একদম বিনা মূল্যে পড়ছেন স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত। শুধু পড়ালেখা নয়, কিসের সব ছাত্রছাত্রীর জন্য থাকা, খাওয়া, বিনোদন, খেলাধুলা, স্বাস্থ্যসেবা—সবকিছুই বিনা মূল্যে। কিটের আয়ের কিছু অংশ এখানে ব্যয় হয়। কিসের শিক্ষার্থীদের তিন বেলা খাওয়ার দৃশ্য নিয়েই তৈরি হয়েছে অনেক তথ্যচিত্র। সে এক এলাহি ব্যাপার, কেউ কেউ এটিকেই ভারতের বৃহত্তম রান্নাঘর আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্বের বরেণ্য লোকজন এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে কেউ তাকে আখ্যা দিয়েছেন ঈশ্বরের আশ্চর্য সৃষ্টি, কেউ বলেছেন বাতিঘর। কেউবা এ প্রতিষ্ঠানকে আখ্যা দিয়েছেন ভারততীর্থ নামে।

সেই অধ্যাপক সামন্ত এসেছিলেন ঢাকায়। গত ২৭ জুলাই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে এক চুক্তি করতে। ড্যাফোডিলের মাধ্যমে ঢাকাতেও বিস্তৃত হচ্ছে কিসের কার্যক্রম।

গত বৃহস্পতিবার গুলশান ক্লাবে তাঁর সম্মানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ড্যাফোডিল। সেখানেই কথা হয় অধ্যাপক সামন্তের সঙ্গে।

কথা শুরু হওয়ার পরপর বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘আমি হান্ড্রেডস অব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি। তারা খুবই সম্ভাবনাময়, মেধাবী ও ভালো শিখছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারা যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে কি না। আমি বলব, ঢাকায় তারা অনেক যত্ন পাচ্ছে।’ জানতে চাইলাম, শিক্ষার লক্ষ্যটা কী? অধ্যাপক বললেন, ‘একজন সফল মানুষ হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া বেশি জরুরি। ভালো মানুষ হতে পারলে সাফল্য তার পেছনে ঘুরবে। আমরা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আরও অনেক কিছুই শেখাই। যাতে তারা ভবিষ্যতে ভালো মানুষ ও দায়িত্ববান নাগরিক হতে পারে। এসবের জন্য আমি আমার জীবনটা তাদের জন্য উৎসর্গ করেছি।’

কিস পরিদর্শনের পর ভুটানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিওনচেন জিগমি ওয়াই থিনলে লিখেছেন, ‘এখানে শিক্ষার্থীদের সবকিছু বিনা মূল্যে। কিন্তু কোনো কিছুই বিনা মূল্যে নয়, শিক্ষার্থীদের সেই মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।’

কী হতে পারে সেই মূল্য, জানতে চাইলে অচ্ছুত সামন্ত বলেন, ‘আমরা তাদের কাছে কোনো মূল্য প্রত্যাশা করি না। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানটি তাদের একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে, সম্মানজনক জীবন দিচ্ছে তার প্রতি, সেই সমাজের শিক্ষার্থীদের কর্তব্য রয়েছে, দায় রয়েছে।’

ভারত ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ভালো-মন্দটা জায়গাভেদে নির্ভর করে। ভারত সরকার এখন ভোকেশনাল শিক্ষার বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে, অনেক কিছু করছে। যার কারণে এই শিক্ষার দৃশ্যমান প্রসার ঘটছে। আমি আশা করব, বাংলাদেশেও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটবে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশেও অনেক নামী বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে পুরোনো ও বড়। এখানে বেসরকারি পর্যায়েও অনেকগুলো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। কারণ, এক্সিলেন্স এক দিনে অর্জিত হয় না। এ জন্য সময় লাগবে।

‘তবে যা-ই হোক না কেন, শিক্ষা হতে হবে মানবিক ও মানসম্মত। আমার বিবেচনায় শিক্ষাহীনতার চেয়ে অর্ধেক শিক্ষা ক্ষতিকর।’

ছেলেমেয়েদের অস্থিরতা, উগ্রপন্থায় যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে এই অধ্যাপক বলেন, শিক্ষায় নৈতিকতা থাকতে হবে অবশ্যই। তাতে তারা ইতিবাচক ও সৃষ্টিশীল হয়। শিক্ষিত খারাপ মানুষ খুব ক্ষতির কারণ হতে পারেন। নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা থাকাটাও বড় বিষয়। এ বিষয়গুলো ঠিক থাকলে অন্তত শিক্ষার্থীর মধ্যে হতাশা থাকবে না। তারা বিপথে যাবে না।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকবারই বলেছেন, ‘যত কিছুই বলুন, পড়ার কোনো বিকল্প নেই। এ অভ্যাস গড়তে হবেই। অনেক কিছুর সমাধান আছে এখানেই।’

Noor E Alam (Polash)
Assistant Administrative Officer 
Daffodil International University (DIU)
email-fd@daffodilvarsity.edu.bd

Offline Noor E Alam

  • Administrator
  • Jr. Member
  • *****
  • Posts: 94
  • Test
    • View Profile
একজন অচ্ছুত সামন্তের গল্প
« Reply #1 on: January 13, 2019, 01:24:14 PM »

ভারতের উড়িষ্যার আদিবাসী অঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার মানুষের জীবন বদলে দিয়েছেন ড. অচ্ছুত সামন্ত। তিনি আদিবাসী ছিন্নমূল শিশুদের জন্য ভারতের ভুবনেশ্বরে গড়ে তুলেছেন দুটি বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—কলিঙ্গ ইন্সিটিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি (কিট) ও কলিঙ্গ ইন্সটিটিউট অব সোস্যাল সায়েন্স (কিস)। অচ্ছুত সামন্তকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে মূলত কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্স এবং এর ১৫ হাজার আদিবাসী ছাত্রছাত্রী। এখানে পড়ার সুযোগ রয়েছে প্রথম শ্রেণি থেকে একদম স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া, বিনোদন, খেলাধুলা, স্বাস্থ্যসেবা, কম্পিউটার ল্যাব, কনফারেন্স ল্যাব ও ওয়াই-ফাই সিস্টেমের ব্যবস্থা। এছাড়া এখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী পড়ালেখার সঙ্গে সঙ্গে পায় কারিগরি প্রশিক্ষণ।

অচ্ছুত সামন্ত ১৯৬৫ সালে ভারতের উড়িষ্যার এক ছোট্টগ্রাম কটাক্কার কালাব্রাঙ্কায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবার নাম অনাদীচরণ এবং মায়ের নাম নীলিমা রানি। যখন ৪ বছর বয়স অচ্ছুত সামন্তের তখন তার পিতা পরলোক গমন করেন। বাবাকে হারিয়ে নিদারুণ দুর্দশা নেমে আসে সামন্তের পরিবারে। কারণ বাবাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। এ অবস্থায় সংসারের হাল ধরতে মায়ের সঙ্গে অন্যের বাসায় কাজ শুরু করেন ছোট্ট সামন্ত। এর মধ্য দিয়েই কালাবাঙ্কের সরকারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে অদম্য অচ্ছুত এবং পরবর্তীতে তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন রসায়ন শাস্ত্রে, উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। মাস্টার্স শেষ করেই চাকরিতে ঢুকে যান মহেশ্বরী কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। এই কলেজে প্রায় ১০ বছর শিক্ষকতা করেন অচ্ছুত সামন্ত। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল অন্যরকম। তাই সুখের জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে পা বাড়ালেন সমাজ সেবায়। সিদ্ধান্ত নিলেন দুস্থ আদিবাসীদের জীবন পরিবর্তনের জন্য একটি দক্ষ উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তুলবেন। কিন্তু ততোটা আর্থিক সামর্থ ছিল না তার। তাতে কি? নিজের জমানো ৫ হাজার টাকা সম্বল নিয়েই মাঠে নামলেন। এভাবেই ১৯৯২ সালে যাত্রা শুরু হলো কেআইআইটি ও কেআইএসএস নামের দুটি বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।

কিট এর শিক্ষার্থীদের ফি দিয়ে তিনি কিস পরিচালনা শুরু করেন। কিন্তু কিট থেকে কিস এর যাত্রা এত সহজ ছিল না। অনেক লড়াই সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। প্রথম দিকে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ২৫ জন। কারণ আদিবাসীরা তার সন্তানদের ঘর থেকে অন্য কোথাও যেতে দিতে চাইতেন না। ফলে শিশুদের স্কুলে আনতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে অচ্ছুত সামন্তকে। এরপর ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক সময় কিট একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এখানে প্রথম শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছ। বর্তমানে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বলে রাখা ভালো, কিট এর শিক্ষার্থীদের প্রদেয় ফিসের ১০ শতাংশ ব্যয় হয় কিস এর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা পরিচালনার জন্য। আর কিট এর সকল শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের ৩০ ভাগ প্রদান করা হয় কিস পরিচালনা ফান্ডে। কারণ কিসের দুস্থ শিক্ষার্থীদের  থাকার জন্য হোস্টেল, চিকিৎসার জন্য মেডিকেল সার্ভিস, তিন বেলা খাবার, তার মধ্যে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার প্রদান করা হয়। খাবারগুলো ভরপুর পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ।

ড. সামন্ত নিজের সাথে সাথে মায়ের স্বপ্ন ও পূরণ করছেন। তার মায়ের স্বপ্ন ছিল, তার গ্রাম কালাব্রাঙ্কাকে একটি স্মার্ট বিদেশি শহরে পরিণত করতে হবে। মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে লাগাতার কাজ করে যাচ্ছেন ড. অচ্ছুত। কালাব্রাঙ্কা এখন ভারতের প্রথম গ্রাম, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের স্বাস্থ্য বিমা রয়েছে। এটি গ্রাম হয়েও শহরের মত সকল সুযোগ রয়েছ। যেমন হাইস্কুল থেকে কলেজে পড়ার সুবিধা, পোষ্ট অফিস , ব্যাংক , ইন্টারনেট আরো কত কি!!

কিস-এর সাফল্যের জন্য ড. সামন্ত বলেন, কিস-এর উন্নতি ও সাফল্যের জন্য অনেক মানুষ তাকে অনেকভাবে সাহায্য করেছেন। তিনি কেবলি তা ফেরত দেবার প্রতিদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, আমি আমার জীবনের ২৫ বছর ক্ষুধার জন্য কষ্ট করেছি। এখন আমি হাজার শিশুর ক্ষুধামুক্তির জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি।

অচ্ছুত সামন্ত এ পর্যন্ত ২৫টি উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ২০০০ সাল থেকে ‘খুদে মিস ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছেন। এছাড়া মহাত্মা গান্ধীর স্মরণে একটি আদিবাসী জাদুঘর নির্মাণ করছেন যার নাম ‘গান্ধী গ্রাম’। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ দক্ষিণ কোরিয়ার হানসিওসহ ভারতের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশ থেকে পেয়েছেন নানা পুরস্কার।
Noor E Alam (Polash)
Assistant Administrative Officer 
Daffodil International University (DIU)
email-fd@daffodilvarsity.edu.bd