অপারেশন ফাস্ট লেগ :

Author Topic: অপারেশন ফাস্ট লেগ :  (Read 252 times)

Offline Faruq Hushain

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 83
  • Test
    • View Profile
অপারেশন ফাস্ট লেগ :
« on: March 27, 2019, 03:08:14 PM »
৩০শে মার্চ, ১৯৭১। ভোরবেলার হালকা আলোয় ঘুমন্ত কুষ্টিয়া শহর পরিষ্কার হয়ে ওঠছে। মাত্র ৫ দিন আগেই এখানে এসে হাজির হয়েছে হানাদার বাহিনী। কুষ্টিয়া জেলা স্কুল পাকিস্তানীদের প্রধান ঘাঁটি। ২৭তম বেলুচ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি পজিশন নিয়েছে। নিশ্চিত তারা। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন পায়ে দলিয়ে ফেলতে পেরেছে। পিষে ফেলতে পেরেছে বাঙালিদের।

হঠাৎই গগণবিদারী চিৎকার! “জয় বাংলা!” সাথে সাথেই ঝাঁক ঝাঁক বুলেট ছুটে আসছে পাক বাহিনীর অবস্থানের দিকে। হাজার খানেক কণ্ঠের জয় বাংলা ধ্বনিতে বিভ্রান্ত পাক সেনারা। শত্রু আসলে কত? তাহলে পেছনের গল্প শোনা যাক এর।

বাংলাদেশকে পদানত করতে পাকিস্তানের করা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে ২৫শে মার্চ রাত থেকেই। সেদিন রাতেই এক কোম্পানি সৈন্য হাজির হয় কুষ্টিয়ায়। আগে থেকেও ছিল অল্প কিছু সেনা। ওয়্যারলেস স্টেশন এবং কোতোয়ালি থানায় অবস্থান নিয়েছে তারা। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে মেজর শোয়েব। এই দলের কাজ যুদ্ধক্ষেত্রে সবার আগে পৌঁছানো এবং অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। পরে ফিরে আসা এবং প্রয়োজন হলে মূল দলকে সহায়তা করা। এ ধরনের দলে অস্ত্র থাকে প্রচুর।

এদিকে ইপিআর-এর মেজর আবু ওসমান (পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) ১ মাস আগেই বাংলাদেশে এসে দায়িত্ব নিয়েছেন। ২৫শে মার্চ তিনি তার অধীনস্ত বাংলাদেশি অফিসার ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীকে নিয়ে খুলনা থেকে পালিয়ে চুয়াডাঙ্গা আসেন। এলাকার গণ্যমান্য লোকদের নিয়ে আলোচনায় বসা হলো। পাক বাহিনীকে সর্বাত্মক বাঁধা দিতে হবে। সবমিলে ৬০০ জন সৈনিক, ব্রিটিশ আমলের থ্রি নট থ্রি রাইফেল, কয়েকটা মেশিনগান, গ্রেনেড আর ৬টা মর্টার- অস্ত্র বলতে এগুলোই।

স্থানীয় পুলিশ এবং কয়েকজন ছাত্র দলে ভিড়ল। স্থানীয় ২ জন চিকিৎসক নিলেন মেডিক্যাল টিমের দায়িত্ব। অস্ত্র কম তাতে কি? দেশপ্রেমের তো অভাব নেই। যে যেভাবে পেরেছে এগিয়ে এসেছে। স্থানীয় টেলিফোন বিভাগ পোড়াদহ মাঠে একটা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন করে দিল। অন্যান্য যোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হলো। আশেপাশের এলাকা থেকে আরো কিছু সেনা এসে যোগ দিল। মেহেরপুর মহকুমার প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সিপাহী জনতার সমন্বয়কারীর দায়িত্ব নেন।
মেজর আবু ওসমান এবার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করতে বসেন। অস্ত্রের জোরে তার দলটি তেমন কিছুই না। নিমেষেই উড়ে যেতে পারে। তাই পাক বাহিনীকে হারাতে হবে অন্য কৌশলে।

আক্রমণ শুরুর সাথে সাথেই যশোরে সাহায্য চাইতে পারে পাক বাহিনী। হাইওয়েতে ১৫০ থেকে ২০০ জন সেনা সড়ক পাহারা দেবে। এ দিক থেকে নতুন করে যেন পাক সাহায্য আসতে না পারে সেটা নিশ্চিত করবে তারা।

কুষ্টিয়া থেকে মনযোগ সরাতে চুয়াডাঙ্গা সদর আক্রমণ করতে পারে পাক বাহিনী। বিশখালি, কালীগঞ্জ, কোঁটাচাঁদপুরে সবমিলে ৪ কোম্পানি সেনা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত করা হয়। উদ্দেশ্য যশোর বা অন্য কোনো দিক থেকে আক্রমণ আসলে যেন কুষ্টিয়া আক্রমণ না থামে।

ক্যাপ্টেন আযম তার দল নিয়ে যাবে সার্কিট হাউজের কাছাকাছি। সেখান থেকে জিলা স্কুলের মূল ঘাঁটিতে হামলা হবে। সুবেদার মুজাফফরের নেতৃত্বে এক দল পুলিশ লাইনে আক্রমণ করবে। সুবেদার নায়েক মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে ওয়্যারলেস স্টেশনে হানা দেবে আরেকটি দল।
পুরো সময়টাতেই 'Element of surprise' এর দিকে জোর দেন মেজর। সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে চমকে দিতে হবে পাক বাহিনীকে। কিন্তু এদিক ওদিকে প্রতিরক্ষার জন্য সেনা রেখে ফ্রন্ট লাইনে সেনা সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় খুবই কম। অস্ত্রও নগণ্য। এই সমস্যার কথা ভেবে আগেই মেজর ওসমান দুর্দান্ত এক পরিকল্পনা করেছিলেন। অগ্রগামী ৩ দলের পেছনে থাকবে কয়েক শত সাধারণ জনতা। যাদের কাজ একটাই, জয় বাংলা ধ্বনি তুলে শত্রুকে বিভ্রান্ত করা। অপারশনের নাম দেওয়া হয় 'অপারেশন ফার্স্ট লেগ'।

২৯শে মার্চ আক্রমণ করার কথা থাকলেও দুঃসংবাদ পাওয়া গেল। সুবেদার মুজাফফরের দল জায়গামতো পৌঁছাতে পারেনি। তার দলের একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে। আক্রমণ একদিন পিছিয়ে যায়।

৩০শে মার্চ সকাল বেলা। সারা রাত পাহারা দিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন পাক গার্ডরা। হঠাৎ তাদের সবগুলো পজিশনে একসাথে হামলা শুরু। Element of surprise-এ মুক্তিবাহিনী আগেই এগিয়ে গেল যুদ্ধে। তারপর মেজর ওসমান তার মূল অস্ত্র ব্যাবহার করার নির্দেশ দিলেন। আকাশ কাঁপানো স্লোগান! জয় বাংলা! পাক সেনারা ধন্দে পড়ে যায় যে মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা আসলে কত? যে সময়টায় তারা কোনো আক্রমণই আশা করেনি সে সময় এমন আক্রমণে চমকে যায় তারা।

এলিমেন্ট অব সারপ্রাইজের পর এবার মেজর ওসমান Deception-এর মারপ্যাঁচে জিতে যান। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে ধোঁকা দিতে পারা সাফল্যের নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়। পাক সেনারা জেলা স্কুলের মূল ঘাঁটিতে এক হতে চেষ্টা করে। কিন্তু প্রচেষ্টা বিফলে যায়। বিভ্রান্ত সেনারা দ্রুতই মুক্তিবাহিনীর শিকারে পরিণত হয়। পুলিশ লাইনের পাশের একটা তিন তলা বাড়ির ছাদে মেশিনগান স্থাপন করেছিল মুক্তিবাহিনী। এই পজিশন গুড়িয়ে দিতে পাক বাহিনী একটা রিকয়েললেস রাইফেল স্থাপন করার চেষ্টা করে। সেটা চোখে পড়তেই কয়েকটি মর্টার নিক্ষেপ করে রিকয়েললেস রাইফেলকে অকেজো করে ফেলে মুক্তিবাহিনী।
বিকেলের আগেই জিলা স্কুল ছাড়া সব পজিশন মুক্তিবাহিনী দখল করে নেয়। পর দিন রাত পর্যন্ত থেমে থেমে যুদ্ধ চলে। কিন্তু ওই ঘাঁটির বেশি কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। প্রচুর অস্ত্রের জোরে মুক্তিবাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখছে পাক বাহিনী। মেজর শোয়েবও সেখানে। এরই মধ্যে যশোরে আবার সাহায্য চায় তারা। কিন্তু যশোরে থাকা পাকবাহিনী জানত যে কুষ্টিয়া আসার সব রাস্তায় মুক্তিবাহিনী পাহারা দিচ্ছে। তাই তারা ঝুঁকি নিতে সাহস করেনি। এদিকে মেজর শোয়েবকে জানানো হয় নতুন করে সাহায্য পাঠানো সম্ভব নয়। মুক্তিবাহিনীর বেতারেও এই বার্তা ধরা পড়ে। উৎসাহ বেড়ে যায় সবার। অস্ত্রের জোরে ঘাঁটির কাছাকাছি ভিড়তে না পারলেও চারদিক থেকে ঘেরাও করে রাখা হয় মেজর শোয়েবের বাহিনীকে।

গভীর রাত, ঘাঁটি থেকে ৪টি গাড়ি বের হয়ে আসে। গুলি করতে করতে মুক্তিবাহিনীর ঘেরাও ভেঙ্গে ঝিনাইদহের দিকে পালিয়ে যায়। পিছু ধাওয়া করার প্রয়োজন মনে করে না কেউই।

কিছু দূরেই একটা ব্রিজ ভেঙ্গে রেখেছিল গেরিলারা। বাঁশের বেড়া বসিয়ে তার উপর রং করে পিচ ঢালা রাস্তার মতো বানিয়ে রাখা হয়েছিল। দুটো গাড়ি তীব্র গতিতে এসে ব্রিজের নিচে পড়ে যায়। লুকিয়ে থাকা একদল মুক্তিযোদ্ধা অ্যামবুশ করে। বেঁচে যাওয়া পাকসেনারা এদিক সেদিক পালিয়ে যায়। মেজর শোয়েব নিহত হয়।

সবমিলে পাক বাহিনীর একটা ব্যাটিলিয়ন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ধরা পড়ে এক অফিসার এবং কয়েকজন সেনা। প্রচুর অস্ত্র দখলে আসে। মুক্তিবাহিনীর ৪ জন শহীদ হন। ৫টি রিকয়েললেস রাইফেল, ৫০টির বেশি মেশিনগান, ৯০টি রাইফেল, ২৪টি গাড়ি ও পিক আপ এবং প্রচুর গোলা বারুদ মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে।

পর্যাপ্ত অস্ত্র না থাকলেও পরিকল্পনা এবং দেশপ্রেমের সমন্বয়ে যে লড়াই করা যায় এই যুদ্ধ তারই প্রমাণ। বাংলাদেশ সরকার গঠন হওয়ার পর মেজর আবু ওসমান ৮ নং সেক্টরের কম্যান্ডারের দায়িত্ব পান। কুষ্টিয়ার এই যুদ্ধ ছিল সামরিক শক্তি এবং জনতার মিলিত প্রতিরোধের এক অভাবনীয় উদাহারণ। মুক্তিবাহিনীর পেছনে যেভাবে লাঠি, দা ইত্যাদি নিয়ে মানুষ এগিয়ে এসেছিল তা বাঙ্গালির স্বাধীনতার স্পৃহাকে আরো একবার প্রমাণ করে দেয়।

https://roar.media/bangla/main/liberation-war/operation-first-leg-1971/