শিক্ষাঙ্গনে খুনের রাজনীতি বন্ধ হবে কবে? [যুগান্তর, তারিখ: ২১.১০.২০১৯; পৃ. ৫]

Author Topic: শিক্ষাঙ্গনে খুনের রাজনীতি বন্ধ হবে কবে? [যুগান্তর, তারিখ: ২১.১০.২০১৯; পৃ. ৫]  (Read 198 times)

Offline kekbabu

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 62
  • Test
    • View Profile
    • https://daffodilvarsity.edu.bd/
শিক্ষাঙ্গনে খুনের রাজনীতি বন্ধ হবে কবে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
২১ অক্টোবর ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানের আধার আর মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচর্চার জায়গা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-গবেষণা চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। পাশাপাশি মেধাভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে দেশ, জাতি ও সমাজ গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা। অতীতের ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালে এমনটাই দেখা যেত। কিন্তু বর্তমান ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালে দেখা মেলে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪৫টি পাবলিক এবং ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণসহ নানা কারণে এসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হত্যার সর্বশেষ ঘটনা ঘটল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। ৬ অক্টোবর বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ‘ছাত্রলীগ’ নামধারী সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অনেক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়নি। যেমন- বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যার বিচার দাবিতে দেশ যখন উত্তাল, ঠিক তখনই পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে পিটিয়ে আবিদ হত্যার মামলার রায়ে ছাত্রলীগের ১২ নেতাকর্মীর সবাই বেকসুর খালাস’।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫১তম ব্যাচের বিডিএস তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবিদুর রহমান আবিদকে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হত্যার ঘটনা যেন নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠখ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত হল দখল, পদ দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাসহ নানা কারণে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্ট সংঘর্ষে ৩৪ শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হওয়াসহ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট এসব সংঘর্ষের কারণে প্রায় ৬০০ দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ থেকেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অমূল্য সম্পদ বিনষ্ট হওয়াসহ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগেরই বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। ছাত্র হত্যা ও ছাত্র হত্যার বিচার নিয়ে এ চিত্র শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই নয়। ছাত্র হত্যা নিয়ে ঠিক এ ধরনের চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

রাজনৈতিক কারণসহ বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থী খুন হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ডামাডোলে এসব মামলা হারিয়ে যাওয়া তথা এসব ঘটনার বিচার না হওয়া নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। আর বিচার না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচনা করা, আদালতের ওপর রাজনৈতিক বা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তার, মামলাসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আদালতে নিয়মিত হাজিরা না দেয়া, দীর্ঘদিনেও আদালতে প্রতিবেদন জমা না দেয়া, বাদীকে আদালতে হাজির হওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য আসামিপক্ষ কর্তৃক নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো, দীর্ঘদিনেও বিচার না হওয়ায় বাদী কর্তৃক মামলা পরিচালনা না করার মনোভাব সৃষ্টি হওয়া ও শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো কাজ করে। ছাত্র হত্যার শেষ পর্যন্ত বিচার না হওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটাতে উৎসাহী হয়ে ওঠে- যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য রীতিমতো অশনিসংকেতই বটে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলতে শোনা যায় ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের ঘটনায় এ পর্যন্ত হাজারও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্র্রশ্ন থেকে যায়, এখন পর্যন্ত কয়টি তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেছে? এ কারণে অনেকেই তদন্ত কমিটিকে ‘ঘটনার ধামাচাপা কমিটি’ বা ‘ঘটনাকে ঠাণ্ডা করার কমিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি ছাত্র হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট জায়গার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও বলতে শোনা যায়, অপরাধী যে-ই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয় বা হয়েছে, তা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য, দখলদারি, চাঁদাবাজি, ত্রাস ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। আর মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরও যে সেই অবস্থার ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন ঘটেছে, তা কিন্তু নয়। বরং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এ দেশে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাঙ্গনগুলোকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়ে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ফাঁকাবুলি হয়েই থাকে।

স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব-ই যে এসব অস্থিতরতার পেছনের মূল কারণ, তা সহজেই অনুমেয়। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখন জ্ঞান-গবেষণা চর্চার চেয়ে রাজনীতিসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। দেশের জনগণের কষ্টার্জিত টাকায় পরিচালিত উচ্চশিক্ষার এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও ব্যক্তিস্বার্থের আন্দোলন দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই পরিহার করা উচিত। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন যদি করতেই হয়, তবে তা একাডেমিক স্বার্থের জন্য করা উচিত। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি বা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য নয়। মেধাভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে যে ছাত্রদের দেশ, জাতি ও সমাজ গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করার কথা, আজ তারাই টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হানাহানি, খুনোখুনিসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯, ২০১০ এবং ২০১১- এই তিন বছরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ ছাত্র। অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ৪৫ বছরে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩২ শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন; কিন্তু দুঃখের বিষয়, রাজনৈতিক কারণে এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেও ‘ছাত্র’ নামধারী সন্ত্রাসীরা বারবার রেহাইও পেয়ে যাচ্ছে। দেশের উচ্চশিক্ষার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বারংবার ছাত্র হত্যা হলেও শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচার না হওয়া তথা সন্ত্রাসীরা ছাড় পেয়ে যাওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধারাবাহিক অস্থিরতা কিসের আলামত বহন করে? পাশাপাশি দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা বন্ধ করতে তথা ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে দেশের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে তাদের স্বার্থেই সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।

কারণ, কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে বা কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটালে সেই সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং পরবর্তী সময়ে সরকার গঠনে বা নির্বাচনে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িতদের যে কোনো মূল্যে খুঁজে বের করা এবং রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা এখন জরুরি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Dr. Kudrat-E-Khuda (Babu).
Associate Professor (Dept. of Law), Daffodil International University;
International Member of Amnesty International;
Climate Activist of Greenpeace International; Column Writer;
Mobile Phone: +8801716472306
E-mail: kekbabu.law@diu.edu.bd