করোনা প্রতিরোধে ভিটামিন সি ও ডি

Author Topic: করোনা প্রতিরোধে ভিটামিন সি ও ডি  (Read 171 times)

Offline Hafizur Rahman

  • Newbie
  • *
  • Posts: 31
    • View Profile

বর্তমানে কোভিড-১৯ মহামারী সারা বিশ্বকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে। এ মুহূর্তে সংক্রমণ কমাতে দ্রুত, কার্যকর, সহজসাধ্য ও নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থা উদ্ভাবন অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই মারাত্মক রোগের জন্য কোনও নির্দিষ্ট কার্যকরী ভ্যাকসিন বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ তৈরি হয়নি। তাই চিকিৎসক, বিজ্ঞানী এবং পুষ্টিবিদরা বিকল্প খুঁজছেন এবং অনুসন্ধান করছেন, কী কী উপায়ে এই ভাইরাল সংক্রমণ থেকে মানবদেহকে রক্ষা করা যায়।

দেহের চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করে গড়ে তোলে, যা সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার। তার মানে, যেখানে চিকিৎসা নেই, সেখানে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাটির প্রধান কাজ হলো দেহকে বিপজ্জনক অণুজীব সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুগুলি শরীর থেকে সরিয়ে ফেলা এবং দেহের মধ্যে বেড়ে ওঠা ম্যালিগন্যান্ট কোষের ওপর নিয়মিত নজরদারি করে এই রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা। কারণ এগুলো  দেহের স্বাভাবিক কাজে ব্যঘাত ঘটাতে পারে। তাই পুষ্টিকর খাবারের অভাব শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

কোভিড-১৯ রোগীর সাম্প্রতিক কেসগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সমস্যা (এআরডিএস) মৃত্যুর মূল কারণ। অন্যদিকে অন্তঃকোষীয় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন) হলো এআরডিএসের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটা কোষকে ধ্বংস করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যঘাত ঘটায়। ফলে রোগি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। চীনের টংজি মেডিকেল কলেজের একদল গবেষক কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ২৯ জন রোগীর উপর একটি ছোট গবেষণা চালান। তাঁরা দেখেন, ২৭  জন রোগীরই সিআরপি প্রোটিন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রোটিন প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসকে ত্বরান্বিত করে।

 

ভিটামিন সি

ভিটামিন সি পানিতে দ্রবণীয়। এটা শরীরের সহজাত এবং অভিযোজক (adaptive) বিভিন্ন কোষীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে। ভিটামিন সি ক্ষতিকর জীবাণুগুলির বিরুদ্ধে এপিথিলিয়াল প্রতিরোধব্যবস্থাকে দৃঢ় করে। এ ছাড়া ত্বকে যে অক্সিড্যান্ট স্ক্যাভেনজিং প্রক্রিয়া আছে, তাকেও সাহায্য করে ভিটামিন সি। এর ফলে সম্ভাব্য জারণ প্রক্রিয়ার চাপ থেকে কোষ কিংবা টিস্যু রক্ষা পায়। ভিটামিন সি ফাগোসাইটিক কোষগুলিতে জমে থাকা নিউট্রোফিলস এবং কেমোট্যাক্সিস, ফাগোসাইটোসিস, প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতির উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। এমনকি অণুজীবের ধ্বংস হারও বাড়িয়ে দেয়। ম্যাক্রোফেজ দ্বারা সংক্রমণের স্থানগুলি থেকে অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত কোষ এবং ব্যবহৃত নিউট্রোফিলগুলিকে সরিয়ে ফেলে। ফলে নেক্রোসিস/NETosis এবং সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পরিমাণ কমে যায়।

সম্প্রতি আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল -এ একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এআরডিএস-এ আক্রান্ত ১৬৭ জন রোগীর ওপর করা এক গবেষণার বিশ্লেষণ করা হয়েছে সেই প্রবন্ধে। ওই গবেষণায় রেগিদের দিনপ্রতি ১৫ গ্রাম ইন্ট্রাভেনাস (আইভ) ভিটামিন সি দেওয়া হয়েছে পর পর চারদিন। ফলে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত চীনের ৫০ জন রোগীর ওপর করা আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই গবেষণায় দেখা গেছে, একটি উচ্চমাত্রা (ডোজ) আইভি ভিটামিন সি সফলভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে অক্সিজেনেশনের হার। সকল রোগী শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছে।

কোরিয়ান আর্মি ট্রেনিং সেন্টারে ১৪৪৪ জন ব্যক্তিকে নিয়ে করা হয়েছে আরেকটি গবেষণা। তাতে দেখা গেছে, ওরাল ভিটামিন সি (৬ গ্রাম/প্রতিদিন) ভাইরাল সংক্রমণের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে সক্ষম। এই গবেষণার রিপোর্ট গত মার্চে বিএমজে মিলিটারি হেলথ জার্নাল-এ প্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি বেশ কয়েক দশক ধরে চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হচ্ছ। সাম্প্রতিক এনআইএইচ বিশেষজ্ঞ প্যানেলের রিপোর্ট পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি (দেহের প্রতিকেজি ওজনের জন্য ১.৫ গ্রাম) মানব দেহের জন্য নিরাপদ ।

এখন দেখা যাক, কীভাবে ভিটামিন সি কোভিড-১৯ কারণে তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার সমাধানে আণবিক লেভেলে কাজ করে। ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, কোলাজেন সিন্থেসিস এবং জিন নিয়ন্ত্রক মনো অক্সিজেনেস ও ডাই-অক্সিজেনেস এনজাইমগুলির কোফ্যাক্টর অর্থাৎ সহযোগী হিসেবে কাজ করে। এটা ফুসফুসের এয়ার স্যাকের এপিথিলিয়াল প্রতিরক্ষাব্যবস্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণেও সহায়তা করে। এছাড়া সিএফটিআর, একোয়াপুরিন-৫, ENaC, এবং Na+/K+ ATPase মতো প্রোটিন চ্যানেলগুলিকে বৃদ্ধি করে। ফলে অ্যালভিওলার তরল নিঃসরণ কমে যায় । এছাড়াও ফাগোসাইটিক কোষগুলিতে জমে থাকা ভিটামিন সি, কেমোট্যাক্সিস, ফাগোসাইটোসিস এবং শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষতিকারক অণুজীব ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে।

 

ভিটামিন ডি

ভিটামিন ডি এর দুটো ফর্ম আছে- ডি২ এবং ডি৩। ভিটামিন ডি৩ সবচেয়ে কার্যকরী। আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের কোষগুলিতে ভিটামিন ডি’র রিসেপ্টর আছে। সেই রিসেপ্টরের সঙ্গে বন্ধনের তৈরি করে নিউক্লিয়ার মেটারিয়ালের সাথে যুক্ত হতে পারে ভিটামিন ডি ৩। এটি যেমন আমাদের শরীরে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাসের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে, তেমনি দাঁত ও হাড়ের গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর পাশাপাশি বেশ কিছু রোগের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ভিটামিন ডি। তবে এখানেই শেষ নয়, ভিটামিন ডি’র আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে।

বহু গবেষণায় দেখা গেছে, নিউমোনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা (সার্স এবং মার্সজনিত) প্রতিরোধে ভিটামিন ডি’র মেগাডোজ কার্যকরী। এমডিপিআই প্রকাশিত নিউট্রিয়েন্টস জার্নালের ২ এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত একটি রিভিউ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে গবেষকরা জানান, ভিটামিন ডি বিভিন্নভাবে সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় ক্যাথেলিসিডিন এবং ডিফেনসিন নামে দুটি প্রোটিন তৈরি হয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন কমায়, তেমনি অতিরিক্ত সাইটোকাইনসের মাত্রা কমিয়ে ফুসফুসের ক্ষত সারাতে পারে। ফলে নিউমোনিয়া সেরে যায়।

সবাই জানে, মানব দেহে ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে, অন্যদিকে বাড়তে থাকে ওষুধ ব্যবহারের মাত্রা। জার্মানির একাডেমি অফ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা আরেকটি গবেষণা চালিয়েছেন। ওষুধের কিছু গ্রুপ আছে, যেমন, অ্যান্টিপাইলেপটিক্স, অ্যান্টিনোপ্লাস্টিকস, অ্যান্টিবায়োটিকস, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরিএজেন্টস, অ্যান্টিহাইপারটেন্সিভস, অ্যান্টিরোট্রোভাইরালস এবং এন্ডোক্রাইন ইত্যাদি। এগুলো মানবদেহের প্রেগনানে-এক্স নামে নিউক্লিয়ার রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে বলে জানিয়েছেন ওই গবেষকরা। ফলে ফলে বয়স্ক ব্যক্তির রক্তের সিরাম ২৫-হাইড্রোক্সি ভিটামিন ডি’র ঘনত্ব হ্রাস পায় ।

সাম্প্রতিক COVID-19 কেস স্টাডিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভিটামিন ডি’র ঘাটতি তীব্র শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দেয়। তাই যাদের শরীরে ভিটামিন ডি’র ঘনত্ব কম, অর্থাৎ যাদের বয়স বেশি, করোনায় মৃত্যুর ঝুকি তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ২৫- হাইড্রোক্সি ভিটামিন ডি’র ঘনত্ব কম হলে।

এখন দেখা যাক, সরাসরি কিভাবে ভিটামিন ডি কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে। এর জন্য বিশেষ এক পদ্ধতি আছে। এতে ইনফেক্টেড ম্যাক্রোফাজ ১, ২৫ ডাই হাইড্রোক্সি ভিটামিন ডি তৈরি হয়। এছাড়া ক্যাথেলিসিডিন এবং ডিফেনসিনকে নামের দুটো প্রোটিন তৈরি হয়। এই প্রোটিন দুটি ভাইরাসের এনভেলাপকে দ্রবীভূত করতে পারে। ফলে ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরি প্রক্রিয়ার হার কমে যায়। এছাড়া ফুসফুসের আস্তরণের জন্য ক্ষতিকর সাইটোকাইনের ঘনত্বও কমাতে পারে।

২০১৭ সালে দ্য লন্ডন স্কুল অফ মেডিসিন অ্যান্ড ডেন্টিস্টির একদল বিজ্ঞানীরা একটা গবেষণা চালান। তাঁরা দেখিয়েছেন, ব্যাকটিরিয়া এবং ভাইরাসের কারণে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা ১৯ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি প্রতিরক্ষারমূলক ভূমিকা পালন করে। তাঁদের ওই প্রতিবেদনটি বিএমজে জার্নালে প্রকাশিত হয়।

এছাড়াও একদল কোরিয়ান বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন, ভিটামিন ডি পরিপূরক অ্যান্টি অক্সিডেশন সম্পর্কিত অনেক জিন যেমন গ্লুটাথায়ন রিডাক্টেজ এবং গ্লুটামেট-সিস্টাইন লাইগেজ মডিফায়ার সাব-ইউনিটের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। গ্লুটাথায়নের উৎপাদন বাড়লে কোষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অ্যাসকরবিক অ্যাসিড অর্থাৎ ভিটামিন সি এর ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর প্রাক্তন পরিচালক চিকিৎসক টম ফ্রিডেন কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় ভিটামিন ডি ব্যবহার করার প্রস্তাব করেন গত ২৩ শে মার্চ। কিছুদিন আগে সান ফ্রান্সিসকো সানলাইট, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক  উইলিয়াম গ্রান্টের কথাতেও একই সুর ছিল। তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা অথবা কেভিড-১৯-এর ঝুঁকিতে ব্যক্তিদের দ্রুত ২৫-হাইড্রোক্সিভিটামিন ডি-এর ঘনত্ব বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ঠিক করে দিয়েছেন এর মাত্রাও। কয়েক সপ্তাহের জন্য প্রতিদিন ১০,০০০ আইইউ ভিটামিন-ডি৩ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Sources:
https://www.prothomalo.com/bigganchinta/article/1655807/%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A8-%E0%A6%B8%E0%A6%BF-%E0%A6%93-%E0%A6%A1%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%B0?fbclid=IwAR2tvG8BrO_ip7rmy2ajuqyx_S6vQoQ054dzm_-g8ILCl1Rp6Q2PcoGRv9g
Hafizur Rahman
Assistant Director, Design Section
Daffodil International University
01713493146
design@daffodilvarsity.edu.bd