জীবনকে ভালোবাসতে শিখতে হবে (The daily Jugantor on 10 Sep. 2020)

Author Topic: জীবনকে ভালোবাসতে শিখতে হবে (The daily Jugantor on 10 Sep. 2020)  (Read 35 times)

Offline kekbabu

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 61
  • Test
    • View Profile
    • https://daffodilvarsity.edu.bd/
জীবনকে ভালোবাসতে শিখতে হবে
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ১০ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিবসটি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় বিধানের আলোকে ছোটবেলা থেকেই আমরা ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’- এ কথা শোনার পাশাপাশি বিশ্বাস করে আসছি এবং আইন অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা দণ্ডনীয় অপরাধও বটে। তা সত্ত্বেও সমাজে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। সম্প্রতি বলিউড তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। আবার অনেকেই হয়েছেন বিমোহিত। কারণ প্রিয় নায়কের অস্বাভাবিক মৃত্যু মন থেকে মেনে নেয়া যায় না। সুশান্তের বাসা থেকে তার লাশসহ অ্যান্টি-ডিপ্রেশন ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন উদ্ধারের মাধ্যমে ধরে নেয়া যায়, এটি একটি আত্মহত্যা। শুধু বলিউড তারকা সুশান্ত-ই নয় বরং পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই চোখে পড়ে আত্মহত্যাসংক্রান্ত নানা খবর। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আত্মহত্যাসংক্রান্ত নানা খবর প্রায়ই চোখে পড়ে। বলাবাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেয়া হয়, তেমনি অপরদিকে একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যা নামক এ মহাপাপ সংঘটিত হয়ে আসছে। যদিও এটিকে কোনো সমাজই কখনও ভালো চোখে দেখেনি এবং আগামীতেও দেখবে বলে মনে হয় না। একজন ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে সাধারণত যে কারণগুলো থাকে তা হচ্ছে- বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনোকষ্ট, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া (দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা, গ্লানি বা হতাশা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, কর্মব্যস্তহীন দিনযাপন ইত্যাদি মানব মস্তিষ্ককে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত করে), পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, এনজাইটি ডিসঅর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ২০২০ সালের মধ্যেই হৃদরোগের পরেই বিষণ্নতা মানবসমাজের বিপন্নতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০১২ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৮ লাখ ৪ হাজারটি।
প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০টি, যার মধ্যে ৫৮-৭৩ শতাংশ আত্মহত্যাকারীই নারী। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীই হতাশা, মানসিক অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। তথ্যপ্রযুক্তির বহুমাত্রিক অপব্যবহারসহ নানা কারণে আগের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ অবস্থা অধিকমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রেমে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন কারণে হতাশা, মানসিক অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতার ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ ধরনের প্রবণতা বেড়েই চলছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতাসহ আত্মহত্যাচেষ্টার প্রবণতা বেড়ে চলা এবং অনেক শিক্ষার্থী মানসিক অশান্তি ও অস্থিরতায় ভুগলেও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো পেশাদার পরামর্শক বা কাউন্সেলর। কোনো শিক্ষার্থী যদি আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তবে তা হবে সমাজ-দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। কারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তাদের পরিবারসহ সমাজ, দেশ ও জাতি ভালো অনেক কিছু আশা করেন। একজন শিক্ষার্থীকে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসতে তার অভিভাবকসহ ওই শিক্ষার্থীকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয়। পাড়ি দিতে হয় অনেক দুর্গম ও বন্ধুর পথ। এ বিষয়গুলো প্রতিটি শিক্ষার্থীরই উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের স্মরণ রাখা উচিত, অনেক আশা-ভরসা নিয়ে তাদের বাবা-মা, অভিভাবকরা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শেখাতে পাঠান।

মানুষের জীবনেই সমস্যা আছে এবং সমস্যা আসবে- এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে, জীবনে সমস্যা এলে বা সমস্যায় পড়লে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে। বরং জীবনে সমস্যা এলে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে ও বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান খোঁজা দরকার। প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। যখন কেউ আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তখন ধরে নেয়া হয় এটি তার মানসিক অস্থিরতা বা আবেগ দ্বারা তাড়িত হওয়ার ফলাফল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটা, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল লাভ করতে না পারা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, ধর্ষণ, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তিসংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। এসবের পাশাপাশি রয়েছে প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যুর খবর; কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা, ‘এ পৃথিবীতে কেউ আমাকে চায় না’; ‘এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে আমার কোনো লাভ নেই’- এ জাতীয় বদ্ধমূল চিন্তাভাবনা ইত্যাদি। এসব চিন্তার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। আর তখনই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতাও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। পরিবারের সব সদস্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারা এবং দীর্ঘদিনেও ঋণমুক্তির উপায় খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদিও রয়েছে আত্মহত্যার কারণের মধ্যে। এছাড়াও প্রেমে ব্যর্থতাসহ প্রেমিক-প্রেমিকার ইচ্ছাপূরণের জন্য জেদের বশবর্তী হয়েও অনেক তরুণ-তরুণীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে প্রোটেকটিভ ফ্যাক্টর বা রক্ষাকারী বিষয় বলা হয়। যেমন- জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। তাছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যা প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। এছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যা প্রবণতা কমায়। সুতরাং শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। সর্বোপরি, আত্মহত্যার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে নিয়মিতভাবে তা প্রচার-প্রচারণারও ব্যবস্থা করা আবশ্যক। শিক্ষার্থীসহ সবাইকে জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে তা আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনটিকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায় তাহলে জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই আসুন, আত্মহত্যার চিন্তা ও আত্মহত্যার পথ পরিহার করে এখন থেকেই আমরা আমাদের জীবনকে ভালোভাবে ভালোবাসতে শিখি।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির (যুক্তরাজ্য) সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্টের সহযোগী সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/sub-editorial/343158/%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%96%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87
Dr. Kudrat-E-Khuda (Babu).
Associate Professor (Dept. of Law), Daffodil International University;
International Member of Amnesty International;
Climate Activist of Greenpeace International; Column Writer;
Mobile Phone: +8801716472306
E-mail: kekbabu.law@diu.edu.bd