ইসলামের ইতিহাস: সংক্ষিপ্ত পরিসরে চৌদ্দশ বছরের গৌরবময় যাত্রাকাহিনী

Author Topic: ইসলামের ইতিহাস: সংক্ষিপ্ত পরিসরে চৌদ্দশ বছরের গৌরবময় যাত্রাকাহিনী  (Read 42 times)

Offline 710001113

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 492
    • View Profile
ইসলামের ইতিহাস: সংক্ষিপ্ত পরিসরে চৌদ্দশ বছরের গৌরবময় যাত্রাকাহিনী

Muhaiminul Islam Antik
ইতিহাস হলো জ্ঞানের এমনই এক শাখা যা মানুষকে তার শেকড় সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে, শেকড়ের সাথে বন্ধন মজবুত করে তার মস্তিষ্করূপী বৃক্ষে দরকারি পুষ্টিদ্রব্যের সরবরাহ নিশ্চিত করে, এবং সবশেষে ইতিহাস থেকে অর্জিত শিক্ষা মানুষকে বলে দেয় তার কোন পথে যাওয়া উচিত, আর কোন পথ ভুলেও মাড়ানো উচিত নয়।

মাসখানেক আগে অনলাইন সার্ফিংয়ের সময় নজরে আসে আরবের বিখ্যাত আলেম ড. মুহাম্মাদ ইবরাহীম আশ-শারিকি রচিত ‘ইসলামের ইতিহাস – নববী যুগ থেকে বর্তমান’ বইটি। মূল বইয়ের নাম ‘আততারিখুল ইসলাম’ অর্থাৎ ইসলামের ইতিহাস। সেখান থেকেই বাংলা ভাষায় রূপান্তর করেছেন বিশিষ্ট অনুবাদক কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক, সম্পাদনায় ছিলেন শাইখ মীযান হারুন।



'ইসলামের ইতিহাস – নববী যুগ থেকে বর্তমান' বইটির প্রচ্ছদ; Background: Wallpaper Cave; প্রচ্ছদের ছবি: মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক
বইয়ের নামের নিচে সাবটাইটেল অংশটিই বলে দিচ্ছে এর আলোচনার পরিধি। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা (৩৫২) এটাও জানান দেয় যে, এখানে কোনো কিছু নিয়েই আলোচনার গভীরে যাওয়া হয়নি, তবে সংক্ষেপে সম্ভাব্য ও গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুকেই স্পর্শ করা হয়েছে। পাশাপাশি আবুল ফাতাহ মুন্নাহর চমৎকার প্রচ্ছদ ডিজাইন, যেখানে গোল্ডেন এজ অভ ইসলাম তথা ইসলামের স্বর্ণালী যুগের আবহ ফুটিয়ে তুলতে তার চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না, এই বইটি কেনার সিদ্ধান্ত ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 
বইটি খোলার পর ভিন্নভাবে সজ্জিত ১৭ পৃষ্ঠার সূচিপত্র পাঠককে অসাধারণ এক যাত্রার হাতছানিই দেবে, যার শুরুটা হয়েছে ‘ইতিহাসশাস্ত্রের ইতিকথা’ অধ্যায়ের মাধ্যমে। এই অংশে ইতিহাস বলতে কী বোঝায়, এর আলোচনার পরিধি, এই শাস্ত্র পাঠের উপকারিতা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতামত ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী যে কাউকে অধিকতর আগ্রহী করে তুলবে। উদাহরণ হিসেবে ‘তারিখুল ইয়ামান’ গ্রন্থের ভূমিকায় খাযরাজির বক্তব্যের একটি অংশ উল্লেখ করা যায় যেখানে তিনি লিখেছেন,

যে ব্যক্তি পূর্ববর্তীদের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে, সে যেন সুপ্রাচীনকাল থেকেই বেঁচে আছে। আর যে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রশংসনীয় কিছু রেখে যায়, সে যেন পৃথিবীর শেষ লগ্ন পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুখানুভূতি লাভ করে।

একই অধ্যায়ে আলোচিত ইতিহাসশাস্ত্রের নীতিমালা, ইসলামী ইতিহাস বিষয়ক প্রসিদ্ধ বইগুলোর নামের তালিকা একজন পাঠককে জ্ঞানের এক মহাসাগরের দিকেই হাতছানি দিয়ে ডাকবে, যার চর্চার ক্ষেত্র আসলে তৈরি করে দিচ্ছে এই বই।

এরপর বইটিতে একে একে এসেছে:

ইসলাম-পূর্ব সময়ে আরব সমাজের অবস্থা;
হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর আগমনের মধ্য দিয়ে আরব-ভূমিতে ইসলামের অভ্যুদয়;
এই মহামানবের ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের দক্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনায় বিশ্বের বুকে মুসলিম সভ্যতার অবস্থান সুদৃঢ়করণ ও সম্প্রসারণ;
উমাইয়া ও আব্বাসী খেলাফতের উত্থান-পতনের প্রেক্ষাপট, সাম্রাজ্য বিস্তার সংক্রান্ত আলোচনাসহ তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত আলোচনা;
ফাতিমি, হামদানি, আইয়ুবি, ওসমানী, মোঘল সাম্রাজ্যসহ ইসলামের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে যে সাম্রাজ্যগুলোর নাম অবধারিতভাবেই উঠে আসবে সেসব সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনা;
মঙ্গোলদের বর্বরতায় ছিন্নভিন্ন মুসলিম বিশ্ব এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে সেই মুসলিমদের হাতে সেই মঙ্গোলদেরই গুঁড়িয়ে দেবার দুঃখ-গৌরবের মিশ্র ইতিহাস;
ক্রুসেড কেন শুরু হলো, কীভাবে ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করল, সেই সময়কার মুসলিম ও খ্রিস্টান শাসকবর্গ এই সংঘাত সম্পর্কে কেমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, এবং প্রতিটি ক্রুসেডের ফলাফল সংক্ষেপে আলোচনা;
সর্বশেষে আরব দেশগুলোর বর্তমান অবস্থা, সৌদি আরবের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা প্রভৃতি।
উপরে মোট আটটি পয়েন্ট ধরে সংক্ষেপে বইটির আলোচ্য বিষয়গুলোর কথা বলা হলেও একজন পাঠক, যিনি কিনা ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করতে চাচ্ছেন কিংবা পড়াশোনা শুরু করলেও একেবারেই শৈশবকাল পার করছেন, তার জন্য বইটি নিঃসন্দেহে চমৎকার এক সূচনাপর্ব হতে পারে; হতে পারে এমন এক ভিত্তিপ্রস্তর, অধ্যবসায়ের বলে যার উপর গড়ে উঠতে পারে ইসলামী ইতিহাস বিষয়ক জ্ঞানের সুউচ্চ ভবন।


কাবা; Image Source: Adli Wahid/Wikimedia Commons
মূল বইটির কাজ ১৩৮৯ হিজরি মোতাবেক ১৯৬৯ সালেই সমাপ্ত হয়েছিল। ওদিকে বাংলায় অনূদিত বইটি পাঠকদের হাতে এসেছে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে। বইটির ভাষা যেন পাঠকদের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহজবোধ্য হয়, এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখিত ইতিহাসের অজস্র তথ্য যেন পাঠকের বিরক্তি ও একঘেয়েমির কারণ না হয়ে ওঠে, সেজন্য অনুবাদক ও সম্পাদকের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। বইটির নানা জায়গায় তাদের দুজনের আলাদাভাবে সংযোজিত সুবিশাল টীকা, যা কখনও মূল লেখকের বক্তব্যকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে আরও স্পষ্ট করার জন্য, কখনও আবার তার আলোচনায় না আসা বিষয়কে তুলে আনার জন্য, তাদের এই কঠিন পরিশ্রমেরই স্বাক্ষর বহন করে।


 
পাশাপাশি বইটির পুনঃনিরীক্ষণে ছিলেন ইসলামী ইতিহাস বিষয়ক জনপ্রিয় লেখক ইমরান রাইহান, যিনি ইতোমধ্যেই মৌলিক গ্রন্থ সুলতান আলপ আরসালান ও আব্বাসি খিলাফাহ, এবং সংক্ষিপ্ত অনুবাদ-গ্রন্থ সুলতান জালালুদ্দিন খাওয়ারিজম শাহ-এর মতো তিনটি বই দিয়ে ইতিহাসপ্রেমী পাঠকদের মনে খুব চমৎকার এক আস্থার স্থান তৈরি করে নিয়েছেন।

বইটির পাঠ-পর্যালোচনা করতে গিয়ে এতক্ষণ ধরে এর ইতিবাচক দিকগুলো নিয়েই বলা হলো কেবল, এবার আসা যাক উন্নতির দিক সংক্রান্ত আলোচনায়। নেতিবাচক দিক বলছি না এ কারণেই যে মানুষ নিজে এবং তার হাত ধরে আসা কোনোকিছুই কখনও শতভাগ নিখুঁত থাকেনি, বরং সময়ে সময়ে নানাজনের ‘উন্নতির দিক’ সংক্রান্ত পরামর্শই তাকে এবং তার সৃষ্টিকে পারফেকশন তথা পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।

১) বইটিতে নামসংক্রান্ত বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে মাঝে মাঝেই। এর মূল কারণ আরবের অধিবাসীদের নামগুলোর বিশালাকৃতি। কখনও নামের এক অংশ, আরেক জায়গায় নামের অন্য অংশ- এমন করার ফলে মাঝে মাঝেই বুঝতে অসুবিধা হয়েছে যে আসলে কার কথা বলা হচ্ছে। ফলে বেশ কয়েকবারই পেছনে গিয়ে খুঁজে খুঁজে যোগসূত্র বের করে আবার সামনে এগোতে হয়েছে, যা ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক নবীন পাঠকদের জন্য কষ্টসাধ্য কাজ। না, নাম খুঁজে আনাটা না, বরং একই ব্যক্তির নামের বিভিন্ন অংশের ব্যবহার। হয়তো মূল লেখকই এমনটা রেখেছেন, তবে অনুবাদক-সম্পাদকের প্রতি অনুরোধ থাকবে এই সহজীকরণের দিকে নজর দিতে, একই নাম ব্যবহার করতে।

২) একই ব্যক্তির একই নামের দু’রকম উল্লেখের বিষয়টিও নজরে এসেছে। যেমন- বাইজান্টাইন সম্রাট নিকিফোরাসের নাম একবার ‘নিকিফোরাস’ (পৃষ্ঠা: ১৮৪) ও পরের পৃষ্ঠাতেই ‘নাইসিফোরাস’ হিসেবে এসেছে। একই বিষয় দেখা গিয়েছে তুর্কি সেনাপতি আফশিন/আশফিনের বেলাতেও, যাকে ‘আফশিন’ (পৃষ্ঠা: ২০৮-০৯) ও ‘আশফিন’ (পৃষ্ঠা: ২০৯) উভয় নামেই সম্বোধন করা হয়েছে। এই ভুলগুলো কম্পিউটারে টাইপ করার সময়ের ভুল হবার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে এগুলো খুব সহজেই সংশোধনযোগ্য।

৩) সাল অর্থাৎ কোনো একটি ঘটনা সংঘটনের সময় সংক্রান্ত কিছু জায়গাতেও খটকা লেগেছে। উদাহরণস্বরুপ দুটো দিকের কথাই বলা যাক।


 
ক) ‘উসমানি সাম্রাজ্য’ অধ্যায়ের ‘মাগরিবে আরবী নিয়ন্ত্রণ’ (পৃষ্ঠা: ৩১১) অংশে দুটো স্থানে ১৯০০ এর পরবর্তী সালের কথা উল্লেখ আছে, যা সম্ভবত ভুলক্রমে লেখা হয়েছে। যেমন- এই অংশে উল্লেখ করা সিনান পাশার জীবদ্দশা ১৫০৬ থেকে ১৫৯৬ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও তার তিউনিশিয়া জয়ের সময় হিসেবে ১৯৭৪ এর কথা লেখা আছে। যদি আমি ইন্টারনেট থেকে ভুল সিনান পাশাকে বেছে না নিয়ে থাকি, তাহলে এখানে সাল সংক্রান্ত একটি ভুল হয়েছে।

খ) একই রকমের একটি বিচ্যুতি দেখা গিয়েছে ‘আরব দেশগুলোর পরিস্থিতি’ অধ্যায়ের ‘জামাল উদ্দিন আফগানি’কে নিয়ে আলোচনাতেও। তার জীবদ্দশা ১৮৩৯ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত বিস্তৃতি হলেও তাকে মিশর থেকে বিতাড়নের সাল হিসেবে ১৭৮৯ লেখা (পৃষ্ঠা: ৩২০) রয়েছে।

৪) হতাশ হয়েছি মূল লেখকের বইয়ে মোঘল সাম্রাজ্য নিয়ে মাত্র একটি পৃষ্ঠা বরাদ্দ থাকায়, যেখানে এই সাম্রাজ্যের তিন শতাধিক বছরের ঘটনাবলীও বইটির সংক্ষিপ্ত আলোচনার নীতিতে অন্তত কয়েক পৃষ্ঠা আলোচনার দাবিদার।

৫) যে লেখক এত চমৎকার একটি বই লিখতে পারেন, তার সম্পর্কে জানবার আগ্রহ হবে যেকোনো পাঠকেরই। দুর্ভাগ্যবশত, বইয়ের পেছনে ‘আরবের বিখ্যাত আলিম’ শব্দত্রয় ছাড়া ড. মুহাম্মাদ ইবরাহীম আশ-শারিকি সম্পর্কে পুরো বইয়ে জানবার আর কোনো উপায়ই নেই। তাই লেখক পরিচিত যুক্ত হওয়াটা নিঃসন্দেহে অনুসন্ধানী পাঠকদের মনকে শান্ত করবে; এই লেখক সম্পর্কে, তার কর্মপরিধি সম্পর্কে আরও জানার সুযোগ করে দেবে।

৬) পুরো বইয়ের হিসেবে বলতে গেলে বিভিন্ন অংশেই ছোটখাট বানান ভুল নজরে এসেছে। এই দিকটিও অবশ্যই উন্নতির দাবিদার।


 
উন্নতির দিক সংক্রান্ত এই পরামর্শগুলো প্রথম সংস্করণ (প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২০) এর ভিত্তিতে দেয়া। বইটির সাথে যুক্ত দায়িত্ববান সকলের প্রতিই বিনীত অনুরোধ থাকবে এই দিকগুলো নিয়ে যত্নসহকারে কাজ করার, যা চমৎকার এই বইয়ের মানোন্নয়ন ও একে আরও আকর্ষণীয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বইয়ের উন্নতির দিক নিয়ে যে পরামর্শগুলো দেয়া হলো, একজন পাঠক হিসেবে সেগুলোকে অতিরিক্ত আমল দিয়ে বইটি সংগ্রহের চিন্তা থেকে আবার সরে আসবেন না যেন! কারণ এগুলো বইয়ের মূল আবেদন, মূল বক্তব্যে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি বলেই আমার অভিমত। বরং এগুলো দেয়া হলো যেন এর ‘গুড’ থেকে ‘বেটার’ এর পথে যাত্রাটা আরও সহজ হয়।


অটোম্যান তথা ওসমানী সাম্রাজ্যের মানচিত্র (১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দ); Image source: Wikimedia Commons
বইয়ের একেবারে শেষে সংযুক্ত চাররঙা মানচিত্রগুলোর কথা যদি না বলা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে বইটি ও এর পেছনে জড়িত ব্যক্তিবর্গের প্রতি অবিচার করা হবে। চমৎকারভাবে এখানে মানচিত্রের মাধ্যমে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে:

উমাইয়া খেলাফতের সময়কার খেলাফতের বিস্তার
আব্বাসী খেলাফতের বিস্তার
সেলজুক ও ফাতিমি সাম্রাজ্য
উসমানী সাম্রাজ্যের উত্থান
উসমানী সাম্রাজ্যের পতন
বিশেষত শেষ দুটো মানচিত্রে উসমানী সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের রঙিন মানচিত্রটি একবুক দীর্ঘশ্বাসই কেবল নিয়ে আসে…