এলপিজির মূল্য ও ভোক্তা অভিমত

Author Topic: এলপিজির মূল্য ও ভোক্তা অভিমত  (Read 155 times)

Offline Badshah Mamun

  • Administrator
  • Hero Member
  • *****
  • Posts: 1856
    • View Profile
    • Daffodil International University
এলপিজির মূল্য ও ভোক্তা অভিমত


এলপিজি মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং বিইআরসিতে পেশকৃত মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রস্তাবগুলোর ওপর ক্যাব ভোক্তা প্রতিনিধি হিসেবে বিইআরসিতে এক লিখিত অভিমত পেশ করেছে। ভোক্তাসাধারণকে অবগত করার জন্য তা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো—

এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা

১. ক্যাবের আবেদন মতে গণশুনানির ভিত্তিতে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণে বিইআরসির নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও আইনি কর্তৃত্ব-বহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হবে না এবং বিইআরসি আইনের ২২(খ) ও ৩৪ ধারা মতে গণশুনানির ভিত্তিতে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের জন্য কেন আদেশ দেয়া হবে না, সেই মর্মে ক্যাব কর্তৃক আনীত ১৩৬৮৩/২০১৬ নং রিট মামলায় ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল ইস্যু করেন।

২. ওই রিট মামলায় দাখিলকৃত সম্পূরক এক আবেদনে ক্যাব বিইআরসি আইনের ২২(খ) ও ৩৪ ধারা মতে গণশুনানির ভিত্তিতে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের আদেশের জন্য আবেদন করে এবং এলপিজি ব্যবসায়ীরা যেন অবৈধ উপায়ে এলপিজির মূল্যহার বৃদ্ধি না করতে পারেন, সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণেরও আবেদন জানায়। এ আবেদন হাইকোর্ট আমলে নেন এবং ক্যাবের আবেদন মতে গণশুনানি করে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রতিবেদন আদেশপ্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে কোর্টে দাখিল করার জন্য হাইকোর্ট গত ২৫ আগস্ট এক আদেশ দেন।

৩. বিইআরসিকে প্রদত্ত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বরের এক পত্রে বলা হয়, ওই বিভাগ কর্তৃক প্রণীত এলপি গ্যাস অপারেশনাল লাইসেন্সিং নীতিমালা ২০১৭-এর ৩.১ অনুচ্ছেদ মতে সরকার (জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ) এলপি গ্যাসের খুচরা মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি প্রণয়ন করবে। ফলে ওই পদ্ধতি নির্ধারণের লক্ষ্যে বিইআরসি গত বছরের ৮ মার্চ বিইআরসির সদস্যের (গ্যাস) নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গত ২৪ সেপ্টেম্বর এলপিজির মূল্যনির্ধারণ-সম্পর্কিত এক অনলাইন সভা করে। দেখা যায়, বিইআরসি গত ১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগকে প্রদত্ত এক পত্রে এলপিজির খুচরা মূল্যহার নির্ধারণ পদ্ধতি (যদি প্রণীত হয়ে থাকে) বিইআরসিতে পাঠানোর অনুরোধ জানায় এবং জ্বালানি বিভাগের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ ও নির্দেশনা চায়। অতঃপর পদ্ধতি প্রণয়নের অজুহাতে বিইআরসি কোর্টের আদেশ প্রতিপালনে বিরত থাকে।

৪. ওই সভায় ক্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়: (ক) এলপিজির মূল্য নির্ধারণ কমিটি ও কমিটির কার্যক্রম বিইআরসি আইন ও ২০১২ সালে বিইআরসি কর্তৃক প্রণীত এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ সম্পর্কিত প্রবিধানমালাগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা বিইআরসির নিরপেক্ষতাকে খর্ব করেছে; (খ) পদ্ধতি প্রণয়নের অজুহাতে কোর্টের আদেশ প্রতিপালন না করা অগ্রহণযোগ্য এবং (গ) অতএব ওই কমিটি ও কমিটির প্রতিবেদন বাতিল করে ২০১২ সালের বিইআরসি প্রণীত প্রবিধানমালাগুলো মতে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ হতে হবে। এসব বক্তব্য গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক পত্রে ক্যাব বিইআরসিকে অবগত করে।

৫. গত ১১ অক্টোবর বিইআরসিকে প্রদত্ত পত্রে এলপিজি ব্যবসায়ী কর্তৃক অবৈধভাবে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিইআরসি আইনের ২২(খ), ৩৪, ৪০ ও ৪৩ ধারার আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ক্যাব এক আবেদন করে। আবেদনে বলা হয়, গণশুনানির ভিত্তিতে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে কোর্টে দাখিল করার জন্য গত ২৫ আগস্ট হাইকোর্ট এক আদেশ দেন। সেই আদেশ বলবৎ থাকা অবস্থায় এলপিজি কোম্পানিগুলো এলপিজির মূল্যহার বৃদ্ধি করে নিজেরাই পুনর্নির্ধারণ করেছেন। ফলে মূল্যবৃদ্ধি ও এ মূল্যবৃদ্ধিতে জড়িত লাইসেন্সিদের লাইসেন্স বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে বিইআরসি আইনের ৪৩ ধারা মতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ক্যাব বিইআরসির কাছে আবেদন জানায়। বিইআরসি নিষ্ক্রিয় থাকে এবং কোর্টের আদেশ অকার্যকর করে। ফলে কোর্ট অবমাননা হয়।

৬. কোর্টের আদেশ প্রতিপালন না করা এবং প্রতিপালন না করার জবাব গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় কোর্ট অবমাননার দায়ে বিইআরসির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট গত ২৯ নভেম্বর মামলা নং ৪৭৪/২০২০ রুজু করেন। পরবর্তী সময়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান কোর্টের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান এবং গণশুনানির ভিত্তিতে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ প্রক্রিয়া এখন প্রক্রিয়াধীন। আগামী ১৪, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি গণশুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে।

৭. হাইকোর্টের আদেশ প্রসঙ্গে বিইআরসি থেকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে গত ২ ডিসেম্বর এক পত্র দেয়া হয়। তাতে বলা হয়, পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের (এলপিজিসহ) মূল্যহার (ট্যারিফ) নির্ণয়-সংক্রান্ত (ক) পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের খুচরা ট্যারিফ প্রবিধানমালা, ২০১২, (খ) পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ মজুদকরণ, বিপণন ও বিতরণ ট্যারিফ প্রবিধানমালা, ২০১২ এবং (গ) পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ পরিবহন ট্যারিফ প্রবিধানমালা, ২০১২ ভেটিংয়ের জন্য বিইআরসি থেকে ওই বিভাগে পাঠানো হয়। ২০১৩ সালের  ১৪ মে তাগাদাও দেয়া হয়। অবশ্য পরবর্তী সময়ে বিইআরসি থেকে এ ব্যাপারে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণের ফর্মুলা-সংবলিত একটি প্রতিবেদন বিইআরসি থেকে গত ১৫ নভেম্বর ওই বিভাগের মতামতের জন্য পাঠানো হয়।

৮. ওই পত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, (ক) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক প্রণীত, ‘এলপি গ্যাস অপারেশনাল লাইসেন্সিং নীতিমালা, ২০১৭’ অনেক ক্ষেত্রেই বিইআরসি আইন, ২০০৩-এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী এবং (খ) হাইকোর্টের বর্ণিত আদেশ বাস্তবায়নের জন্য বিইআরসি থেকে প্রেরিত প্রবিধানমালাগুলো, এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণের ফর্মুলা-সংবলিত প্রতিবেদন এবং এলপি গ্যাস অপারেশনাল লাইসেন্সিং নীতিমালা, ২০১৭-এর বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। তবে ফর্মুলার ব্যাপারে ক্যাবের আনুষ্ঠানিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে সে আপত্তি উপেক্ষা করে বিইআরসি এখনো ওই ফর্মুলাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। যদিও জ্বালানি বিভাগের ওই নীতিমালা মতে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ পদ্ধতি প্রণয়ন বিইআরসি আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরস্পরবিরোধী বলে বিইআরসি অভিমত ব্যক্ত করেছে। ক্যাবের অভিমত, কোর্টের আদেশ, বিইআরসি আইন ও প্রক্রিয়াধীন প্রবিধানমালাগুলোর সঙ্গে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ ওই ফর্মুলা বা পদ্ধতি অসংগতিপূর্ণ এবং অগ্রহণযোগ্য।

৯. আইনি বৈধতার প্রশ্নে এই ফর্মুলা এবং বিইআরসি কর্তৃক গঠিত ফর্মুলা প্রণয়নকারী কমিটি ও কমিটি কর্তৃক এলপিজির প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলা বা পদ্ধতির ব্যাপারে ক্যাবের আনুষ্ঠানিক আপত্তি রয়েছে। অথচ বিইআরসির প্রতিবেদনে সে আপত্তির উল্লেখ নেই। উল্লেখ্য, মূল্যহার নির্ধারণ পদ্ধতি প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত হতে হবে। সে প্রবিধান প্রণয়নের এখতিয়ার বিইআরসি আইন মতে বিইআরসির। আর বিইআরসি কর্তৃক প্রণীত এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণসংক্রান্ত সে প্রবিধানমালা ২০১২ সাল থেকে জ্বালানি বিভাগ আটকে রেখেছে। তাছাড়া বিইআরসি আইন উপেক্ষা করে এলপি গ্যাস অপারেশনাল লাইসেন্সিং নীতিমালা ২০১৭ প্রণয়ন করে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি প্রণয়নের ক্ষমতা জ্বালানি বিভাগ নিজে গ্রহণ করে বিইআরসি আইন ও বিইআরসিকে পরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করেছে।

১০. গত বছরের ১৩ জানুয়ারি দায়েরকৃত আরেকটি রিট মামলায় এলপিজি বোতলের গায়ে মূল্য লেখার আদেশ হয়। হাইকোর্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে সেই আদেশ বাস্তবায়নের আদেশ দেন। সেখানে রেসপনডেন্ট হিসেবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিইআরসি এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রয়েছে। কিন্তু বিপিসি নেই। অথচ সে আদেশ বাস্তবায়নের জন্য ওই বিভাগ বিপিসিকেই পত্র দেয়। কিন্তু কোর্টের আদেশ প্রতিপালিত হয়নি।

এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা

১. ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি এলপিজি কোম্পানি, ব্যক্তিমালিকানাধীন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড বিইআরসিতে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দাখিল করেছে। আরো দুটি বেসরকারি এলপিজি কোম্পানি কোনো প্রস্তাব পেশ করেনি। তারা লোয়াবের প্রস্তাবে অভিন্ন মত পোষণ করে পত্র দিয়েছে। অপর আরেকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এলপিজি কোম্পানি কোনো প্রস্তাব দেয়নি। তারা পত্র মারফত আরামকো ঘোষিত এলপিজির একটি মূল্য তালিকা পেশ করেছে মাত্র।

২. লোয়াব একটি সংগঠন। বিইআরসির লাইসেন্সি নয়। বিইআরসি আইন মতে লাইসেন্সি ব্যতীত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো সংগঠন, এমনকি লাইসেন্সিদের সংগঠন হলেও, এরা কেউই বিদ্যুৎ অথবা কোনো জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ অথবা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করার যোগ্য ও উপযুক্ত নয়। ফলে বিইআরসি আইন মতে এদের কারোর এমন কোনো প্রস্তাব আমলে নেয়ার এখতিয়ার বিইআরসির নেই। ফলে লোয়াবের প্রস্তাব গণশুনানির জন্য তালিকাভুক্তির যোগ্য নয় এবং বাতিলযোগ্য। কেবল প্রস্তাব পেশকারী সংশ্লিষ্ট বেসরকারি এলপিজি কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় এলপি গ্যাস লিমিটেড এই দুই লাইসেন্সির প্রস্তাব শুনানির উপযুক্ত বলে গ্রহণ করা যায়। অন্যদের ব্যাপারে ক্যাবের আপত্তি রইল। তবে তারা বা তাদের প্রতিনিধি জেরা এবং/অথবা বিবৃতি পর্বে নাম নিবন্ধিত থাকার শর্তে অংশগ্রহণ করতে পারে।

৩. মূল্যহার নির্ধারিত হয় কস্ট প্লাস নীতির ভিত্তিতে। এলপিজি সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে যে ব্যয় সংযোজন হয়, তা ন্যায্য ও যৌক্তিক কিনা, এটি প্রমাণের দায় প্রস্তাবকারীর। সংশ্লিষ্ট বেসরকারি এলপিজি কোম্পানির প্রস্তাবে দেখা যায়, যেসব ব্যয় সংযোজনে বোতল/সিলিন্ডারে ১২ কেজি এলপিজি সরবরাহ ব্যয় ২০১৯ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ১ হাজার ২৫ টাকা এবং ১ হাজার ৬০ টাকা দেখানো হয়েছে, সেসব ব্যয় ন্যায্য ও যৌক্তিক কিনা তার কোনো তথ্যপ্রমাণ প্রস্তাবে নেই। আমদানি পর্যায়ে ২০২০ সালে এলপিজির ক্রয়মূল্য (সিপি) গড়ে টনপ্রতি ৪১৯ দশমিক ৫১ ডলার ধরা হয়েছে। তা প্রমাণসাপেক্ষ। ভারতের হলদীয়া বন্দরে প্রতি টন এলপিজির জাহাজ ভাড়া বাবদ ব্যয় ৪০-৫০ ডলার হলে মোংলা/চট্টগ্রাম বন্দরে সে ব্যয় ১২০ ডলার তথ্য-প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। দেখা যায়, তিন ধাপে ভ্যাট সংযোজন হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে ভ্যাট বাবদ ব্যয় ৪২ টাকা ধরার যৌক্তিক ভিত্তি প্রস্তাবে পাওয়া যায়নি। এলপিজি সাপ্লাই চেইনে কস্ট পয়েন্ট ওয়াইজ কস্ট উল্লেখ করতে হবে এবং সেসব কস্ট সঠিক কিনা, তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সঙ্গে তথ্য-প্রমাণও থাকতে হবে। এসব কোনো কিছুই প্রস্তাবে নেই। অতএব সিলিন্ডারপ্রতি এলপিজির উল্লিখিত সরবরাহ ব্যয় ও ব্যয় বিশ্লেষণ যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয়, এলপি গ্যাস লিমিটেডের লোকসান, বেসরকারি কোম্পানির এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি প্রভৃতি বিবেচনায় এলপি গ্যাস লিমিটেড ১২ দশমিক ৫ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। সিলিন্ডারপ্রতি রাজস্ব চাহিদা নির্ধারণ ব্যতীত এমন প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য। এলপিজির উৎপাদন ব্যয়ও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়নি। লোকসানের পরিমাণও উল্লেখ নেই। এলপিজির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা বেসরকারি কোম্পানির এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বাস্তবে এলপি গ্যাস লিমিটেডের এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কহীন। প্রস্তাব বিশ্লেষণে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি সম্পর্কে এলপি গ্যাস লিমিটেডের অজ্ঞতা ও অবহেলার পরিচয় পাওয়া যায়।

ক্যাবের অভিমত

(ক)  কেবল বিইআরসির চেয়ারম্যানই নন, আদালত অবমাননার দায়ে জ্বালানি সচিবও অভিযুক্ত, (খ) প্রবিধানমালা চূড়ান্তকরণে বিইআরসি ও জ্বালানি বিভাগ উভয়ই নিষ্ক্রিয় থেকে ব্যবসায়ীদের স্বীয় ইচ্ছামাফিক এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণের সুযোগ দিয়েছে, (গ) জ্বালানি বিভাগ নীতিমালা-২০১৭ তৈরি করে এবং বিইআরসি ফর্মুলা/পদ্ধতি তৈরির অজুহাত খাড়া করে সে সুযোগ সুরক্ষা করেছে, (ঘ) আদালতের আদেশ হয়েছে আগস্টে। গণশুনানি হবে জানুয়ারিতে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ অবৈধভাবে সুরক্ষার দায় না থাকলে এবং কোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে এ সময়ের মধ্যে প্রবিধানমালাগুলো চূড়ান্ত করে গণশুনানির আগেই গেজেটে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল, (ঙ) অথচ সে ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই। বিষয়টি রহস্যজনক, (চ) এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ সম্পর্কিত ২০১২ সালে বিইআরসি প্রণীত প্রবিধানমালাগুলো এখনো অন্ধকারে, (ছ) এ ব্যাপারে বিইআরসি ও জ্বালানি বিভাগ উভয়ই এক ও অভিন্ন অবস্থানে আছে। তাতে এলপিজির অনৈতিক ব্যবসা সুরক্ষা পাচ্ছে এবং (জ) সব জ্বালানি সঞ্চালন ও বিতরণকারী বিইআরসির লাইসেন্সি। অথচ তাদের লাইসেন্স দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

ক্যাবের প্রস্তাব/সুপারিশ

১. হাইকোর্টে আদেশ বহাল থাকাকালে অর্থাৎ গত ২৫ আগস্টের পর যেসব লাইসেন্সি এলপিজির মূল্যহার এক বা একাধিকবার বৃদ্ধি করেছে, সেসব মূল্যবৃদ্ধি বাতিল করে তাদের কাছ থেকে মূল্যবৃদ্ধিজনিত সমুদয় অর্থ আদায় করা এবং বিইআরসি আইন ও কোর্টের আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের স্বার্থে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। সেই মর্মে প্রস্তাব করা হলো।

২. ব্যক্তিমালিকানাধীন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বিইআরসির লাইসেন্সি না হওয়ায় বিইআরসি আইন মতে তাদের প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করার কোনো এখতিয়ার বিইআরসির নেই। প্রস্তাব জমা দেয়া সংশ্লিষ্ট বেসরকারি এলপিজি কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় এলপি গ্যাস লিমিটেড—কেবল এই দুই কোম্পানির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করা যেতে পারে।

৩. প্রস্তাবে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেডের যেসব অজ্ঞতা/অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেসব বিইআরসির নথিতে নথিভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব করা হলো।

৪. এলপিজি সাপ্লাই চেইনে কস্ট পয়েন্ট ওয়াইজ কস্টগুলো উল্লেখ করে সেসব কস্টের ভিত্তিতে রাজস্ব চাহিদা নির্ধারণ করে মূল্যহার নির্ধারণ প্রস্তাব করা হয়নি। তাছাড়া প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তথ্য-প্রমাণও নেই। ফলে মূল্যহার নির্ধারণ প্রস্তাব ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়। গণশুনানিতে প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণাদি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৫. মূল্যহার নির্ধারণ যেন ন্যায্য ও যৌক্তিক হয়, সেজন্য এলপিজি সাপ্লাই চেইনে নিম্নে উল্লিখিত কস্ট পয়েন্ট ওয়াইজ কস্টগুলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইক্রমে বিবেচনায় নিয়ে মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রস্তাবগুলোর ওপর গণশুনানি করা আবশ্যক:

ক. Import cost: (a) Bulk purchase cost (PC), (b) shipment cost: (i) freight + (ii) insurance, (c) (i) duties + (ii) taxes, (d) (i)port + (ii) handling charges upto mother bulk storage,

খ. Supply cost: (a)(i) mother storage + (ii) bottling charges, (b) transportation charges upto distributor, (c) handling charge for distributor, (d) transportation charges upto retailer, (e) handling charge for retailer,

গ. (i) tax + (ii) VAT (at different stages) are also to be added besides duties and taxes levied at port of entry.

৬. রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেডের মূল্যহার নির্ধারণে ইমপোর্ট কস্টের স্থলে প্রডাকশন কস্ট হবে। সেই সঙ্গে অন্যান্য প্রযোজ্য কস্ট বিবেচনায় নিতে হবে। প্রডাকশন কস্টে পয়েন্ট ওয়াইজ নিম্নরূপ কস্টগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে:

উৎপাদন ব্যয়: (ক) ফিড স্টক খরচ, (খ) প্রক্রিয়াকরণ (গ)  বোতলজাত (ঘ) মজুদ (ঙ) হ্যান্ডলিং... এবং কর ও ভ্যাট।

৭. অটো-গ্যাস সাপ্লাই চেইনে ওপরে বর্ণিত মতে কস্ট পয়েন্ট ওয়াইজ কস্টগুলো তথ্য-প্রমাণাদির ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইক্রমে বিবেচনায় নিয়ে অটোগ্যাসের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রস্তাবগুলোর ওপর গণশুনানি করা যেতে পারে।

৮. তবে অটোগ্যাস ও এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ সম্পর্কিত বর্ণিত বিতর্কিত ফর্মুলা/পদ্ধতি বাতিল হতে হবে। সেই সঙ্গে জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক প্রণীত ‘এলপি গ্যাস অপারেশনাল লাইসেন্সিং নীতিমালা ২০১৭’ বাতিল করতে হবে। অতঃপর ২০১২ সালে বিইআরসি প্রণীত প্রবিধানমালাগুলো মতে গণশুনানি ও মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ নিশ্চিত হতে হবে।

পরিশেষে ভোক্তাদের প্রত্যাশা কোর্টের আদেশ  বাস্তবায়নের  তাগিদে  আইন ও  বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণে বিইআরসি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে এবং বিইআরসি আইন সমুন্নত রাখবে। তাতে ভোক্তাস্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষা পাবে।

 
এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ


© Daily Bonik Barta ( বণিক বার্তা )
Md. Abdullah-Al-Mamun (Badshah)
Assistant Director, Daffodil International University
01811-458850
cmoffice@daffodilvarsity.edu.bd
www.daffodilvarsity.edu.bd

www.fb.com/badshahmamun.ju
www.linkedin.com/in/badshahmamun
www.twitter.com/badshahmamun