Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - ashraful.diss

Pages: [1] 2 3 ... 10
1

এতিম লালন-পালন

এতিম সমাজেরই একজন। সে ছোট অবস্থায় তার বাবাকে হারিয়েছে, হারিয়েছে তার রক্ষণাবেক্ষণকারী ও পথ  প্রদর্শনকারীকে। এজন্য তার বিশেষ প্রয়োজন এমন একজন ব্যক্তির যে তার খরচ যোগাবে, দেখাশুনা করবে, তার সাথে ভাল ব্যবহার করবে, তাকে নসিহত করবে, উপদেশ দিবে এবং সৎপথ প্রদর্শন  করবে।

যাতে সে মানুষের মত মানুষ হতে পারে, পরিবারের জন্য কল্যাণকর কর্মী এবং সমাজের জন্য দরদী ও উপকারী হতে পারে। আর যদি এতিমের প্রতি অবহেলা করা হয়। দায়িত্ব না নিয়ে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দেয়া হয়। তার যদি কোনো পথ প্রদর্শক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী না থাকে, তাহলে সে বিপথগামী হয়ে যেতে পারে।

পরিশেষে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর সে ক্ষেত্রে এ সমাজই দায়ী হবে। কেননা  তার হক আদায়ের ব্যাপারে সমাজ অবহেলা করেছে এবং দায়িত্ব পালনে কমতি করেছে।

তাই এতিম প্রতিপালন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ ও জাতির  ভবিষ্যৎ সুখ ও শান্তিময় হওয়া এ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। তাই দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তির বার্তা আনয়নকারী ইসলাম এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব  আরোপ করেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় হাবিবকে শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও এই জাতির সৌভাগ্যের দিশারী হিসাবে প্রেরণ করেছেন।

এতিম কে?

এতিম শব্দটি আরবি, যার অর্থ নি:সঙ্গ। একটি ঝিনুকের মধ্যে যদি একটি মাত্র মুক্তা জন্ম নেয় তখন একে দুররে এতিম বা নি:সঙ্গ মুক্তা বলা হয়। ইবনু মন্জুর লিসানুল আরব অভিধানে বর্ণনা করেছেন।

اليتيم: الذي يموت أبوه حتى يبلغ الحلم، فإذا بلغ زال عنه اسم اليتيم، واليتيمة ما لم تتزوج، فإذا تزوجت زال عنها اسم اليتيمة.

অর্থ: এতিম এমন সন্তানকে বলা হয় যার পিতা মারা গিয়েছে, বালেগ হওয়া পর্যন্ত সে এতিম হিসাবে গণ্য হবে। বালেগ হবার পর এতিম নামটি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর মেয়ে সন্তান বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত এতিম বলে গণ্য হবে। বিয়ের পর তাকে আর এতিম বলা হবে না।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বালেগ হওয়ার পর আর কেউ এতিম থাকে না। [মেশকাত : পৃষ্ঠা নং ২৮৪]

লিসানুল আরবে আরো বর্ণিত আছে যে, মানুষের মাঝে এতিম হয় পিতার পক্ষ থেকে আর চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে এতিম হয় মায়ের পক্ষ থেকে। যে সন্তানের বাল্যকালে তার মাতা মারা যায়, কিন্তু পিতা বেঁচে থাকে তাকে এতিম বলা হবে না।

চলবে.....................


2

মানুষ মারা যাওয়ার পর আত্মার কি হয়

একদিন নবী করিম (সাঃ) এর একজন সাহাবী মারা গেলেন রাসূল পাক (সাঃ) উনার জানাজা পড়ালেন। তারপর একদল সাহাবী মৃতদেহ কবর দেয়ার জন্য কবরস্থানে নিয়ে আসলেন। সবার সাথে আমাদের নবী করিমও (সাঃ) হেঁটে হেঁটে আসলেন দুই জন সাহাবী কবর খুঁড়তে শুরু করলেন সবাই মৃত দেহকে ঘিরে বসে আছেন কবর খনন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন সবাই চুপচাপ, নীরব ও শান্ত একটি পরিস্থিতি।
 
নবীজি (সাঃ) গভীর মনোযোগ দিয়ে কবর খোঁড়া দেখছিলেন একটু পর সবার দিকে তাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
 
তোমরা কি জানো, মানুষ মারা যাওয়ার পর, তাঁর আত্মার কি হয় ?

সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে নবীজি কে বললেন,

ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমাদেরকে বলুন।
 
নবীজি একটু চুপ করে থাকলেন। সবাই উনার কাছে এসে ঘিরে বসলেন। মৃত্যুর পর আত্মার কি হয়, এই তথ্য তাঁদের জানা ছিল না। আজ সেটা নবীজির মুখে শুনবেন। কত বড় সৌভাগ্য। শুনার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে নবীজির কাছে এসে বসলেন।
 
তিনি একবার কবরের দিকে তাকিয়ে মাথাটা তুলে আকাশের দিকে তাকালেন,

তারপর তিনি গল্পের মত করে বলতে শুরু করলেন,
 
শুনো, যখন মানুষ একেবারেই মৃত্যু শয্যায়, তখন সে মৃত্যুর ফেরেস্তাকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু যে বিশ্বাসী ও ভালো মানুষ তাকে মৃত্যুর ফেরেস্তা হাসি মুখে সালাম দেন। তাকে অভয় দেন এবং মাথার পাশে এসে ধীরে ও যত্ন করে বসেন। তারপর মৃত প্রায় মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলেন,
 
হে পবিত্র আত্মা ! তুমি তোমার পালনকর্তার ক্ষমা ও ভালোবাসা গ্রহণ করো এবং এই দেহ থেকে বের হয়ে আসো।
 
মুমিনের আত্মা যখন বের হয়ে আসে তখন সে কোন ধরণের ব্যথা ও বেদনা অনুভব করে না।

নবী (সাঃ) আরো একটু ভালো করে উদাহরণ দিয়ে বললেন,
 
মনে করো একটা পানির জগ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর উপর থেকে এক ফোঁটা পানি যেমন নিঃশব্দে উপর থেকে নিচে নেমে আসে ঠিক তেমনি নীরবে ও কষ্ট ছাড়াই আত্মাটি তার দেহ থেকে বের হয়ে আসে।
 
সেই সময় দুই জন অন্য ফেরেস্তা বেহেস্ত থেকে খুব সুগন্ধি মাখানো একটা নরম সুতার সাদা চাদর নিয়ে আসেন এবং তারা আত্মাটিকে সেই চাদরে আবৃত করে আকাশের দিকে নিয়ে যান।

তারা যখন আকাশে পৌঁছেন তখন অন্য ফেরেস্তারা সেই আত্মাটিকে দেখার জন্য এগিয়ে আসেন।
 
কাছে এসে সবাই বলেন,

সুবহানাল্লাহ ! কত সুন্দর আত্মা, কি সুন্দর তার ঘ্রান !

তারপর সবাই জানতে চান,

এই আত্মাটি কার ?

উত্তরে আত্মা বহন কারী ফেরেস্তারা বলেন,

উনি হলেন, "ফুলান ইবনে ফুলান"

(নবী আরবিতে বলেছেন, বাংলায় হলো, "অমুকের সন্তান অমুক" )

বাকি ফেরেস্তাগন তখন আত্মাটিকে সালাম দেয়, তারপর আবার জিজ্ঞেস করেন,

উনি কি করেছেন ? উনার আত্মায় এতো সুঘ্রাণ কেন ?

আত্মা বহন কারী ফেরেস্তাগন তখন বলেন,
 
আমরা শুনেছি মানুষজন নিচে বলা-বলি করছে, উনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন, আল্লাহর ভালো বান্দা, অনেক দয়ালু, মানুষের অনেক উপকার করেছেন।
 
এতটুকু বলার পর নবী (সাঃ) একটু থামলেন।

তারপর সবার দিকে ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে, উনার কণ্ঠটা একটু বাড়িয়ে বললেন,

এই কারণেই বলছি, সাবধান ! তোমরা কিন্তু মানুষের সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করবে না।
 
তুমি মারা যাওয়ার পর মানুষ তোমার সম্পর্কে যা যা বলবে, এই আত্মা বহনকারী ফেরেস্তারাও আকাশে গিয়ে ঠিক একই কথা অন্যদেরকে বলবে।
 
এই কথা বলে তিনি আবার একটু চুপ করলেন, কবরটার দিকে দৃষ্টি দিলেন। আবার বলতে শুরু করলেন।
 
এই সময় মানুষ যখন পৃথিবীতে মৃত দেহকে কবর দেয়ার জন্য গোসল দিয়ে প্রস্তুত করবে তখন আল্লাহ তা'আলা আত্মা বহন কারী ফেরেশতাদেরকে বলবেন, "যাও , এখন তোমরা আবার এই আত্মাকে তার শরীরে দিয়ে আসো, মানুষকে আমি মাটি থেকে বানিয়েছি, মাটির দেহেই তার আত্মাকে আবার রেখে আসো। সময় হলে তাকে আমি আবার পুনরায় জীবন দিবো।"

তারপর মৃতদেহকে কবরে রেখে যাওয়ার পর দুই জন ফেরেস্তা আসবেন। তাদের নাম মুনকার ও নাকির।
 
তারা মৃতের সৃষ্টিকর্তা, তার ধর্ম ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন।

মুনকার নাকির চলে যাওয়ার পর,

আত্মাটি আবার অন্ধকার কবরে একাকী হয়ে যাবে।

সে এক ধরণের অজানা আশংকায় অপেক্ষা করবে। কোথায় আছে ? কি করবে ? এক অনিশ্চয়তা এসে তাকে ঘিরে ধরবে।
 
এমন সময় সে দেখবে, খুব সুন্দর একজন তার কবরে তার সাথে দেখা করতে এসেছেন।

তাঁকে দেখার পর আত্মাটি ভীষণ মুগ্ধ হবে। এতো মায়াবী ও সুন্দর তার চেহারা, সে জীবনে কোন দিন দেখেনি।
 
আত্মাটি তাকে দেখে জিজ্ঞেস করবে,

তুমি কে ?

সেই লোকটি বলবে,

আমি তোমার জন্য অনেক বড় সু-সংবাদ নিয়ে এসেছি, তুমি দুনিয়ার পরীক্ষায় উর্তীর্ণ হয়েছো, তোমার জন্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের ব্যবস্থা করেছেন, তুমি কি সেটা একটু দেখতে চাও?

আত্মাটি ভীষণ খুশি হয়ে বলবে,

অবশ্যই আমি দেখতে চাই, আমাকে একটু জান্নাত দেখাও।

লোকটি বলবে,

তোমার ডান দিকে তাকাও।
 
আত্মাটি ডানে তাকিয়ে দেখবে কবরের দেয়ালটি সেখানে আর নেই। সেই দেয়ালের দরজা দিয়ে অনেক দূরে সুন্দর বেহেস্ত দেখা যাচ্ছে।
 
বেহেস্তের এই রূপ দেখে আত্মাটি অনেক মুগ্ধ হবে ও প্রশান্তি লাভ করবে।

এবং সেখানে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে,

আমি সেখানে কখন যাবো ? কিভাবে যাবো ?

লোকটি মৃদু হেসে বলবেন,

যখন সময় হবে, তখনই তুমি সেখানে যাবে ও থাকবে। আপাততঃ শেষ দিবস পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। ভয় পেও না! আমি তোমার সাথেই আছি। তোমাকে আমি সেই দিন পর্যন্ত সঙ্গ দিবো।
 
আত্মাটি তখন তাকে আবারো জিজ্ঞেস করবে,

কিন্তু তুমি কে ?

তখন লোকটি বলবে,
 
আমি তোমার এতদিনের আমল, পৃথিবীতে তোমার সব ভালো কাজের, তোমার সব পুণ্যের রূপ আমি, আজ তুমি আমাকে একজন সঙ্গীর মত করে দেখছো। আমাকে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যই এখানে পাঠিয়েছেন।
 
এই কথা বলে, লোকটি আত্মাটির উপর যত্ন করে হাত বুলিয়ে দিবেন এবং বলবেন,

হে পবিত্র আত্মা ! এখন তুমি শান্তিতে ঘুমাও। নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নাও।
 
এই কথা বলার পর, আত্মাটি এক নজরে বেহেস্তের দিকে তাঁকিয়ে থাকবে এবং একসময় এই তাকানো অবস্থায় গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে।
 
নবীজি এতটুকু বলে আবার একটু থামলেন। সাহাবীরা তখন গায়ের কাপড় দিয়ে ভেজা চোখ মুছলেন। (বুখারী ও মুসনাদের দুইটি হাদিস থেকে নেওয়া)
 
আল্লাহ আমাদের পবিত্র আত্মা হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন!


3

আত্মত্রুটি স্বীকার করে নেয়ার ফযীলত


নিজের ভুলকে স্বীকার করে নেয়ার স্বভাব নিজের মাঝে সৃষ্টি করা উচিত। এর মাঝেই আমাদের উন্নতি রয়েছে। এতে করে আমরা যে কোন ধরনের ভুল থেকে নিরাপদ থাকতে পারব। অথবা আমাদের মাঝে যদি কোন ধরনের ত্রুটি থাকে এবং কেউ আমাদেরকে সতর্ক করে দেয়, তাহলে তাকে নিজের কল্যাণকামী মনে করা এবং নিজের ভুলকে স্বীকার করে নেয়া।

এর মাঝে নিজের অপমান বা হেয় মনে না করা। সাহাবায়ে কেরামের স্বভাব এমনই ছিল। অর্থাৎ কেউ তাদের ভুল ধরিয়ে দিলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন এবং খুশি হয়ে তাদের জন্য দোয়া করতেন। আল্লামা ইবনুল জাওযী (রাহ.) আবু ইসহাক (রাহ.)এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত উমর ফারুক (রাযি.) বর্ণনা করেন-

إنّ احبّ النّاس إلىّ من اهدىٰ إلىّ عيوبى”

অর্থাৎ- “আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ঐ ব্যক্তি, যে আমার ভুল ধরিয়ে দেয়”।
 
আব্দুল জাব্বার বিন আব্দুল ওয়াহেদ আল-তানুখী বলেন, হযরত উমর (রাযি.) একবার মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, আমি আল্লাহর ক্বসম দিয়ে বলছি, যে ব্যক্তি আমার কোন দোষ সম্পর্কে অবগত সে যেন আমাকে তা অবশ্যই বলে দেয়। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার মাঝে দু’টি দোষ রয়েছে। আপনি দু’টি চাদর ব্যবহার করেন এবং খাবারের সময় দুই তরকারি গ্রহণ করেন। অথচ অন্য লোকেরা এর সামর্থ্য রাখে না।

বর্ণনাকারী বলেন, হযরত উমর (রাযি.) তার এই ভুল স্বীকার করে নিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত আর কখনো তিনি দু’টি চাদর এবং খাবারে দুই তরকারি গ্রহণ করেননি। নম্রতা এবং বন্দেগীর চাহিদাও এটাই। যে মানুষ নিজের ভুলকে স্বীকার করে নিবে, এর দ্বারা আল্লাহর নিকট তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

তাওয়াজু এর বরকত সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে-

“وما تواضع أحد لله الّا رفعه اللهُ”

অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা অবশ্যই উঁচু করে দিবেন”।

একবার হযরত উমর (রাযি.) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলছিলেন, হে লোক সকল! নম্রতা অবলম্বন কর। কেননা আমি রাসূল (সা.)কে বলতে শুনেছি যে-

“من تواضع لله رفعه الله فهو في نفسه صغير وفي أعين الناس عظيم”

অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা উঁচু করে দেন। তাই সে নিজের চোখে ছোট থাকলেও মানুষের নিকট তার সম্মান বেড়ে যায়”। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করে নেন। আমীন!


4

মনোমালিন্য, বিবাদ ও সংকট নিরসনে ইনসাফ ভিত্তিক ফায়সালার গুরুত্ব

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের লিডার ও কর্মীদের পারস্পরিক মনোমালিন্য, বিবাদ এবং সমস্যা সমাধানে প্রথমে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের কথা মনোযোগ সহকারে শুনবে। সঠিক-ভুল জানার চেষ্টা করবে। তারপর ঐ সমস্যাকে সর্বদা শরীয়তের আলোকে সমাধান করার চেষ্টা করবে। এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতিত্ব কখনোই কাম্য নয়। বরং শরীয়তের মূলনীতির আলোকে সঠিক ফায়সালা দেয়ার পরিপূর্ণ চেষ্টা করবে। সর্বদা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রতি লক্ষ্য রাখবে। কেননা যিনি দায়িত্বশীল তিনি সকলের জন্য সমান। দায়িত্বশীলদের অধীনস্থ সকলের প্রতিই সমান আচরণ ও সকলের কল্যাণকামী হওয়া উচিত। তিনি কোন দলভুক্ত নন। ইনশা-আল্লাহ্! এভাবে কাজ করলে সকলের অন্তরে দায়িত্বশীলের প্রতি মর্যাদা বহাল থাকবে এবং সকলেই মিলে-মিশে কাজ করলে কাজে বরকত হবে।

স্বরণ রাখা চাই, ভুল ফায়সালা দেয়ার দ্বারা প্রান্তিকতা এসে যায়। এর দ্বারা অকল্যাণ সৃষ্টি হয়। তেমনিভাবে লিডার এবং কর্মীদেরও এই খেয়াল রাখা উচিত যে, দায়িত্বশীলও একজন মানুষ। আমাদের মতো তারও ভুল-ত্রুটি হতে পারে। এজন্য ফায়সালা করতে গিয়ে যদি কোন ভুল হয়ে যায় অথবা তিনি যদি কোন ভুল ফায়সালা দিয়ে দেন, তাহলে যার পক্ষে এই ফায়সালা হয়েছে, সে এই ফায়সালাকে নিজের জন্য বৈধ মনে করবে না। ঐ ফায়সালার উপর সে খুশি না হয়ে পরকালের জবাবদিহীতার কথা চিন্তা করে নিজের ভুল স্বীকার করে নিবে। কেননা ঐ সত্ত্বা যিনি عليم এবং خبير তিনি সবকিছু জানেন। কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল তা তাঁর থেকে লুকায়িত নয়। সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে-

‎عن أم سلمةؓ قلت: قال رسول الله ﷺ: إنكم تختصمون إلى ولعل بعضكم ان يكون الحن بحجته من بعض، فأقضى له على نحو ماأسمع منه فمن قطعت له من حقٍّ أخيه شيئاً فلا يأخذه، فإنما اقطع له به فطعة من النار     
‎وفى رواية عنها إنّ رسول الله ﷺ سمع جلبة خصم بباب حجرته فخرج إليهم، فقال: إنما أنا بشر وإنه يأتيني الخصم فلعل بعضكم أن يكون أبلغ من بعض فأحسب انّه صادق فأقضي له، فمن قضيت له بحق مسلم فإنما هى قطعة مّن النار، فلا يحملها أو يذرها (صحيح مسلم)

অর্থাৎ- হযরত উম্মে সালামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। হযরত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা আমার নিকট নিজেদের বিচার নিয়ে আস। এবং হতে পারে যে তোমাদের মাঝে একজন অপরজন থেকে কথায় বাকপটু। আমি তার কথা সত্য মনে করে নিলাম এবং রায় তার পক্ষে দিয়ে দিলাম। কিন্তু বাস্তবে সে ছিল অপরাধী। তখন সে যেন আমার এই রায়কে লুফে না নেয়। কেননা, এই অবস্থায় মনে করতে হবে যে, আমি তার জন্য জাহান্নামের টুকরা কেটে দিচ্ছি।

হযরত উম্মে সালামা (রাযি.) অন্য হাদীসে রেওয়ায়াত করেন, একবার রাসূলের (সা.) কামরার নিকটে কিছু লোক দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছিল। তা শুনে রাসূল (সা.) বের হলেন এবং বললেন, প্রকৃতপক্ষে আমিও একজন মানুষ। এবং হতে পারে যে কিছু লোক আমার নিকট তাদের মধ্যকার ঝগড়া-ঝাটির বিচার নিয়ে আসল। তাদের মধ্যে একজন লোক অপর পক্ষের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সু-চতুরভাবে শক্ত এবং উপযুক্ত প্রমাণাদি পেশ করল। আমি তার কথাকে সত্য মনে করলাম এবং তার পক্ষে ফায়সালা প্রদান করলাম (যদিও আসলে সে মিথ্যাবাদী ছিল)। তবে এটা তার জন্য জাহান্নামের টুকরা বলে বিবেচিত হবে। এখন তার ইচ্ছা, সে চাইলে এই জাহান্নামের টুকরাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে পারে (আমার দেয়া ফায়সালা ভুল জেনেও তা মেনে নেওয়ার দ্বারা)। আবার রেখেও যেতে পারে (আমর দেয়া ভুল ফায়সালার বিপরীতে নিজের সত্য স্বীকারের দ্বারা)।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সঠিকভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন!



5

যবানের হেফাযতের গুরুত্ব

যবান অনেক দামী নিআমত, আল্লাহ তাআলার মহা দান। তাই এর নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ ব্যবহার কাম্য। কথায় আছে, দামী জিনিসের হেফাযত কঠিন। স্বর্ণ-রৌপ্য তো মানুষ যত্রতত্র ফেলে রাখে না। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে হেফাযতের চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা যবান হেফাযতের তাকীদ করেছেন এভাবে-

مَا یَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَیْهِ رَقِیْبٌ عَتِیْدٌ

মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, যে (লেখার জন্য) সদা প্রস্তুত। -সূরা ক্বফ (৫০) : ১৮

যবানে উচ্চারিত সবকিছুই ফেরেশতারা সংরক্ষণ করে রাখেন। ভালো-মন্দ, ছোট-বড় সবকিছুই তাঁরা লিপিবদ্ধ করেন। কিয়ামতের দিন এগুলোর হিসাব দিতে হবে। সেইদিন জিহ্বা, হাত-পাসহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষী দিবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

یَّوْمَ تَشْهَدُ عَلَیْهِمْ اَلْسِنَتُهُمْ وَ اَیْدِیْهِمْ وَ اَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ

যেদিন তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও পা সাক্ষ্য দেবে। -সূরা নূর (২৪) : ২৪

আল্লাহ তাআলা বিভিন্নভাবে বান্দাকে সতর্ক করেছেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَ قُوْلُوْا قَوْلًا سَدِیْدًا، یُّصْلِحْ لَكُمْ اَعْمَالَكُمْ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ  وَ مَنْ یُّطِعِ اللهَ وَ رَسُوْلَهٗ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِیْمًا.

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য-সঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী শুধরে দেবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করল সে মহা সাফল্য অর্জন করল। -সূরা আহযাব (৩৩) : ৭০

আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাকওয়া অবলম্বন তথা সব ধরনের নাফরমানী ছেড়ে দিতে বলেছেন। এর  সাথে সাথেই যবানের সদ্ব্যবহার তথা সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। কেননা, যবান হল নাফরমানীর বড় হাতিয়ার। তাই তাকওয়ার সাথেই যবানে সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। যবান ঠিক হয়ে গেলে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সংশোধন হয়ে যাবে। তাই এরপরেই সব আমল সংশোধন ও গুনাহ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন।

আর অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত, যারা যবানের হেফাযত করতে পারে, তারা অন্যান্য গুনাহ থেকে সহজেই বাঁচতে পারে। যবানের ব্যাপারে শিথিলতা অনেক বড় বড় বিপদ ডেকে আনে। দেখা যায়, দু-একটি কথার সূত্র ধরে বউ-শ্বাশুড়ি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বড় ধরনের ঝগড়া-বিবাদ হয়ে যায়।

যবান হেফাযতের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন-

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০১৮)

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবী ওকবা ইবনে আমের রা.-কে তিনটি ওসিয়ত করলেন। এর প্রথমটি ছিল-

امْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ

তুমি তোমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখ। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪০৬)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন-

وَالّذِي لَا إِلَهَ غَيْرُهُ مَا عَلَى الْأَرْضِ شَيْءٌ أَحْوَجُ إِلَى طُولِ سَجْنٍ مِنْ لِسَانٍ

অর্থাৎ, সেই সত্তার কসম, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ভূপৃষ্ঠে সবকিছুর চেয়ে জিহ্বাই সবচেয়ে বেশি বন্দিত্ব ও  নিয়ন্ত্রণের মুখাপেক্ষী। (আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, বর্ণনা ৮৭৪৪; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, বর্ণনা ১৮১৮৪)


নবীজী বাচালকে অপছন্দ করেন

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচালকে অপছন্দ করেন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

وَإِنّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ الثّرْثَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ

তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে দূরে থাকবে সে, যে অযথা বেশি কথা বলে এবং যে অহংকার প্রদর্শনের জন্য, দাপট দেখানোর জন্য মুখ ভরে কথা বলে। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২০১৮)

যবানের অপব্যবহারে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়া

হাদীস শরীফে এসেছে-

خَرَجْتُ وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ أُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَى رَجُلَانِ فَاخْتُلِجَتْ مِنِّي فَاطْلُبُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى أَوْ تَاسِعَةٍ تَبْقَى أَوْ خَامِسَةٍ تَبْقَى

আমি তোমাদেরকে কদরের রাত সম্পর্কে সংবাদ দিতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু দুই ব্যক্তির বিতর্কের কারণে আমি তা ভুলে গেছি। তাই তোমরা শেষ দশকে তা অন্বেষণ কর। তেইশ, একুশ, পঁচিশের রাতে।

শবে কদর একটি মহিমান্বিত রজনী। বরকতময় রাত। এ রাতের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এসেছে-

لَیْلَةُ الْقَدْرِ  خَیْرٌ مِّنْ اَلْفِ شَهْرٍ

কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।

যদি একটু বাগবিতণ্ডার কারণে এত বড় সৌভাগ্য লাভ থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাহলে আমরা যেভাবে যবানের অপব্যবহার করি যেমন গীবত, পরনিন্দা অপবাদ, মিথ্যা, কটুকথা, গালি ইত্যাদির কারণে আমরা কত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি!

চুপ থাকতে উৎসাহিত করা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ صَمَتَ نَجَا

যে চুপ থাকে সে বেঁচে যায়। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৫০১

অন্যত্র তিনি বলেন-

إِنّكَ لَمْ تَزَلْ سَالِمًا مَا سَكَتّ، فَإِذَا تَكَلّمتَ كُتِبَ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ

তুমি যখন চুপ থাকবে তখন নিরাপদেই থাকবে। আর যখন কথা বলবে তখন তা তোমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে যাবে। -আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১৩৭
এক দার্শনিকের অভিব্যক্তি-

ما إن ندمت على سكوتي مرة ولقد ندمت على الكلام مرارا

আমি কখনো আমার নীরবতার উপর অনুতপ্ত হইনি।  তবে বহুবার কথার কারণে লজ্জিত হয়েছি। তাই আমাদের উচিত চুপ থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা।

যবানের হেফাযতে বেহেশতের যামানত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যবান হেফাযতের উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন-

مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الجَنّةَ

যে তার যবান ও লজ্জাস্থান হেফাযতের যামানত দিতে পারবে, আমি তার জান্নাতের যামিন হব। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৪

নবীজীর যবানের হেফাযত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য আদর্শ। কথা-বার্তা, চাল-চলন, কাজ-কর্ম সব বিষয়ে তিনি কখনও অযথা অনর্থক কথা বলতেন না, এমনকি বলা পছন্দও করতেন না। শুধু উপকারী ও প্রয়োজনীয় কথা বলতেন। তিনি দীর্ঘসময় নীরব থাকতেন। হাদীসে এসেছে-

كَانَ طَوِيلَ الصّمْتِ قَلِيلَ الضِّحْكِ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘসময় চুপ থাকতেন এবং কম হাসতেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০৮১০

অসচেতনতায় যবানের অপব্যবহার

সরাসরি মিথ্যা, গালমন্দ, অশ্লীল কথা এগুলো থেকে আমরা অনেকেই বিরত থাকতে চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় বেখেয়ালে মিথ্যা বলে ফেলি। যেমন কিছু দেওয়ার বাহানা করে ছোট বাচ্চাকে ডাকা হল অথচ আহ্বানকারীর কাছে দেওয়ার মত কিছুই নেই। এটি মিথ্যার শামিল।

উম্মে আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা. ছোট বাচ্চাকে কিছু দেওয়ার কথা বলে ডাকছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি লক্ষ করলেন। বললেন, তুমি কি তাকে কিছু দেওয়ার জন্য ডাকছ (নাকি কিছু দেওয়ার বাহানা করে তাকে কাছে ডাকছ?)। তিনি বললেন, হাঁ, আমি তাকে খেজুর দেওয়ার জন্য ডাকছি। তখন নবীজী বললেন-

أَمَا إِنّكِ لَوْ لَمْ تُعْطِيهِ شَيْئًا كُتِبَتْ عَلَيْكِ كِذْبَة

জেনে রাখ, তুমি যদি তাকে কিছু না দিতে, তাহলে তোমার গুনাহের খাতায় একটি মিথ্যা লেখা হত। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৯১

গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা ও রসিকতার ছলে অনেক সময় আমরা অলীক, অবাস্তব ও উদ্ভট কথা বলে ফেলি। এমনকি কখনো কখনো মিথ্যাও হয়ে যায়। এ সমস্যাটি ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সর্বশ্রেণীর মানুষের মাঝে মহামারির আকার ধারণ করেছে। কারণ রসিকতায় শ্রোতাদের হাসানোই থাকে মুখ্য বিষয়। তাই মিথ্যা, অলীক, অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক কথা বলার প্রবণতা থাকে। এমনকি এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। অথচ মিথ্যাকে আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যম বানানো মারাত্মক গুনাহ। এর পরিণাম অনেক ভয়াবহ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

وَيْلٌ لِلّذِي يُحَدِّثُ الْقَوْمَ، ثُمّ يَكْذِبُ لِيُضْحِكَهُمْ وَيْلٌ لَهُ. وَوَيْلٌ لَهُ

ধ্বংস ওর! যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে। ধ্বংস ওর! ধ্বংস ওর জন্য!! -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০০২১

কারো কারো মাঝে কথায় কথায় লানত-বদদোয়া দেওয়ার অভ্যাস থাকে। বিশেষভাবে নারীদের মাঝে। অনেক সময় তারা আপনজন এমনকি নিজ সন্তানকেও বদদোয়া দিয়ে চলে। হতে পারে তখন দুআ কবুলের মুহূর্ত ছিল। ফলে খাল কেটে কুমির আনার মত অবস্থা হয়। বদদোয়াটা লেগে যায়। এটা খুবই গর্হিত কাজ। যবানের মারাত্মক অপব্যবহার।

তাই এ ব্যাপারে আমাদের হুঁশিয়ার থাকা উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لاَ تَلاَعَنُوا بِلَعْنَةِ اللهِ، وَلاَ بِغَضَبِهِ، وَلاَ بِالنّارِ

তোমরা একে অপরকে লানত করো না; বলো না- তোমার উপর আল্লাহর লানত হোক, তোমার উপর আল্লাহর গযব পড়ুক, তুমি জাহান্নামে যাও। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৭৬

যবানের অপব্যবহারের আরেকটি ক্ষেত্র হল, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, গীবত-অপবাদ ইত্যাদি। আমাদের কারো কারো কথাবার্তার বড় একটা অংশ থাকে তৃতীয় ব্যক্তিকে নিয়ে। হয়ত কারো দোষ চর্চা করা, না হয় কাউকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা অথবা কারো ব্যাপারে মন্দ বলা বা  অপবাদ আরোপ করা। অথচ কুরআন-হাদীস এগুলো থেকে শক্তভাবে বারণ করেছে। এগুলো প্রত্যেকটাই কবীরা গুনাহ। পাশাপাশি যবানের অপব্যবহারেরও শামিল।

যবানের অপব্যবহারের পরিণাম

যবানের অপব্যবহার মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। দীর্ঘ এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত মুআয রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন-

وَهَلْ نُؤَاخَذُ بِمَا تَكَلّمَتْ بِهِ أَلْسِنَتُنَا؟

কথার কারণেও কি আমাদের পাকড়াও করা হবে? (মুখের কথার কারণেও কি জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে?)

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ রা.-এর উরুতে মৃদু আঘাত করে বললেন-

يَا مُعَاذُ ثَكِلَتْكَ أُمّكَ - أَوْ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ مِنْ ذَلِكَ - وَهَلْ يكَب النّاس عَلَى مَنَاخِرِهِمْ فِي جَهَنّمَ إِلّا مَا نَطَقَتْ بِهِ أَلْسِنَتُهُمْ. فَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَسْكُتْ عَنْ شَرٍّ، قُولُوا خَيْرًا تَغْنَمُوا وَاسْكُتُوا عَنْ شَرٍّ تَسْلَمُوا.

হে মুআয! তুমি এ বিষয়টি বুঝ না! আরে, মানুষকে তো তার যবানের কথাই উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।

যে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী সে যেন ভালো কথা বলে বা অন্তত মন্দ কথা থেকে বিরত থাকে। তোমরা ভালো কথা বল, লাভবান হবে। মন্দকাজ থেকে বিরত থাক, নিরাপদ থাকবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৭৭৭৪)

যবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যবানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। কত পুত-পবিত্র তাঁর যবান! যে যবান আল্লাহর তরফ থেকে বান্দার কাছে ওহী পৌঁছায় এবং আল্লাহর কালামের ব্যাখ্যা দান করে। এ যবানের পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-

وَ مَا یَنْطِقُ عَنِ الْهَوٰی،  اِنْ هُوَ اِلَّا وَحْیٌ یُّوْحٰی

[সে তার নিজ খেয়াল-খুশি থেকে কিছু বলে না। এ তো ওহী, যা তার কাছে পাঠানো হয়। -সূরা আননায্ম (৫৩) : ৩-৪]

তা সত্তে¡ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়কাতর হয়ে আল্লাহ্র কাছে যবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন-

اللّهُمّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِي، وَمِنْ شَرِّ بَصَرِي، وَمِنْ شَرِّ لِسَانِي، وَمِنْ شَرِّ قَلْبِي، وَمِنْ شَرِّ مَنِيِّي

হে আল্লাহ! আমি আমার কান, চোখ, যবান, হৃদয় এবং লজ্জাস্থানের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯২)

আমাদের উচিত যবানের সঠিক ব্যবহারের প্রতি সচেতন ও যত্নবান হওয়া এবং এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা


6

যবানের হেফাযত বেহেশতের যামানত

বাকশক্তি আল্লাহ তাআলার বড় নিআমত ও মহা দান। বান্দার বহুবিধ কল্যাণ এতে নিহিত। বহুমুখী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তিনি এ নিআমত বান্দাকে দান করেছেন। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে এসব প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। যবানের নিআমত থেকে বঞ্চিত হলে অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। কোনো কিছুই যবানের বিকল্প হতে পারে না।

মানুষের মনের ভাব, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-উল্লাস প্রকাশে যবান অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বলতে গেলে যবান সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মুখপাত্র। বোবার মনের কত দুঃখ-কষ্ট, কত আনন্দ-বেদনা, কিন্তু কাউকে জানাতে পারে না, জীবনের প্রতিটি ধাপে যার বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যে বাকশক্তি হারিয়েছে সে-ই উপলদ্ধি করতে পারে- যবান কত বড় নিআমত!

সাধারণত যার মুখে জড়তা আছে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারে না তার জীবনেই তো কত সমস্যা। কত কষ্ট পেতে হয় তাকে। কত জায়গায় লজ্জা পেতে হয়। অথচ আমরা নির্বিচারে যত্রতত্র যবানের অপব্যবহার করে চলেছি। বস্তুত এত বড় নিআমতের উপলদ্ধি আমাদের মাঝে না থাকার কারণ হল, বিনামূল্যে কোনো কষ্ট স্বীকার ছাড়াই এ নিআমত আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন।

হায়! আমরা যদি একটু বুঝতাম, কত দামী এ নিআমত! রব্বে কারীমের কত বড় দান! একটু ভেবেছি কি- কীভাবে কথা বলছি? এত সুন্দর আওয়াজ কীভাবে বের হয়? কোথা থেকে এ ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়? আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কত বড় নিআমত দান করেছেন আর আমরা তাঁর নাফরমানিতে লিপ্ত। এ যবানের কত অপব্যবহার করছি হিসাবও নেই। কত পাপ এ যবান দিয়ে হচ্ছে, আমাদের অনুভূতিও নেই। একটু ভেবেছি কি, কথা বলার জন্য যদি মিনিট হিসাব করে বিল পরিশোধ করতে হত, তাহলে জীবনটা কত দুর্বিষহ হত।

আল্লাহ আমাদের এই নিআমত এমনিতেই দিয়ে দিয়েছেন। কথা বলতে কোনো কষ্টও পোহাতে হয় না। তাই অনেক বেশি শুকরিয়া আদায় করা প্রয়োজন। অথচ আমরা নির্বিচারে যবানের প্রতি জুলুম করে যাচ্ছি। নাফরমানির কাজে ব্যবহার করছি। এ যবান দিয়ে খালেকের বিরুদ্ধাচরণ করছি। এমনকি শিরকী-কুফরী কথাও যারা বলছে এই যবান ব্যবহার করেই বলছে। অনুভূতি-অনুশোচনাও নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنّ العَبْدَ لَيَتَكَلّمُ بِالكَلِمَةِ، مَا يَتَبَيّنُ فِيهَا، يَزِلّ بِهَا فِي النّارِ أَبْعَدَ مِمّا بَيْنَ المَشْرِقِ

অর্থাৎ বান্দা চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন কথা বলে ফেলে, যার কারণে সে (পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ) জাহান্নামের অতলে নিক্ষিপ্ত হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৭)

বহু ক্ষেত্রে যবানের অপব্যবহার গভীর সম্পর্ককেও তছনছ করে দেয়। নিবিড় বন্ধুত্বের মাঝেও ফাটল ধরায়। দীর্ঘদিনের আত্মীয়তাকে মুহূর্তে শেষ করে দেয়। হৃদয়কে জর্জরিত করে। অন্তরকে ক্ষত বিক্ষত করে, যা কখনও মানুষ ভুলতে পারে না। কারণ, যবানের আঘাতের ঘা শুকায় না। কবি বলেছেন-

جراحات السنان لها التئام + ولا يلتام ما جرح اللسان

বর্শার ফলার আঘাতের উপশম হয়। তবে যবানের আঘাতের কোনো উপশম নেই।

যবানের সঠিক ব্যবহার যেমন প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনে তেমনি এর অপব্যবহার ধ্বংস ডেকে আনে। এজন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের যবানের ব্যবহার নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতেন।

عَنْ سُفْيَانَ بْنِ عَبْدِ اللهِ الثّقَفِيِّ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا أَخْوَفُ مَا تَخَافُ عَلَيّ؟ قَالَ: فَأَخَذَ بِلِسَانِ نَفْسِهِ، ثُمّ قَالَ: " هَذَا ".

হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আসসাকাফী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, আমার কোন বিষয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি আশংকা করেন। তখন তিনি নিজ জিহ্বা ধরলেন এরপর বললেন, এটা। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৪১৯)

যবান খুব দামী নিআমত। সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাঝে যবানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। পরস্পরিক কথাবার্তা, লেনদেন, আলাপ-আলোচনা, সব কিছুতেই মুখের ভূমিকা অপরিসীম। এটা সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিনিধি ও মুখপাত্র।

যবানের যথাযথ ব্যবহারের দ্বারা দুনিয়া-আখেরাতে মানুষ যেভাবে উপকৃত হতে পারে তদ্রূপ এর অপব্যবহার দ্বারা ডেকে আনতে পারে ধ্বংস। এই যবান যেমন সত্তর বছরের বৃদ্ধকে ঈমানের স্বীকারোক্তি দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয় তেমনি কুফরের উচ্চারণ দ্বারা তা মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।

যার বাকশক্তি মজবুত এবং যে সুন্দর উপস্থাপনে পারঙ্গম যবানের অপব্যবহারে তার ক্ষতির আশংকাও তত বেশি। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের দরজায় কিছু মানুষকে বিবাদে লিপ্ত দেখে বললেন-

إِنّمَا أَنَا بَشَرٌ، وَإِنّهُ يَأْتِينِي الْخَصْمُ، فَلَعَلّ بَعْضَهُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ، فَأَحْسِبَ أَنّهُ صَادِقٌ، فَأَقْضِيَ لَهُ بِذَلِكَ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَإِنّمَا هِيَ قِطْعَةٌ مِنَ النّارِ فَلْيَأْخُذْهَا أَوْ لِيَتْرُكْهَا.

আমিও মানুষ। আমার কাছে (বিচার নিয়ে) বাদী-বিবাদী আসে। কখনো এমন হয় যে, তোমাদের একজনের চেয়ে অপরজন দলীল উপস্থাপনে বেশি পারঙ্গম। ফলে (দলীল উপস্থাপন থেকে) আমি কাউকে সত্যবাদী মনে করি আর (সেই ভিত্তিতে) কারো পক্ষে ফয়সালা করি। কখনো যদি এমন ঘটে- আমি অপর মুসলিমের হক কারো জন্য ফয়সালা করে দিলাম তাহলে (শুনে রাখ) তা হবে জাহান্নামের আগুনের একটি টুকরা। (এখন তার ইচ্ছা, চাইলে) সে তা গ্রহণ করুক অথবা তা থেকে নিজেকে রক্ষা করুক। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭১৮১)

প্রাঞ্জল ও স্পষ্ট ভাষা আল্লাহর মহা দান। তেমনি এর সঠিক ও যথার্থ ব্যবহার অত্যাবশ্যক। নতুবা জাহান্নামের আগুনই হবে ঠিকানা। সাধারণত আমাদের কথা চার ধরনের হয়।

১. পুরো কথাই কল্যাণকর।
২. পুরো কথাই ক্ষতিকর।
৩. যে কথাতে কল্যাণ-অকল্যাণ মিশ্রিত থাকে।
৪. যে কথাতে দুনিয়া-আখেরাতের লাভ-ক্ষতি কিছুই নেই। অর্থাৎ অনর্থক কথা।

কল্যাণকর কথার ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান হল পুরোপুরি জেনেশুনে কথা বলা। অনুমান করে কথাবার্তা বলবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ لَا تَقْفُ مَا لَیْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌ  اِنَّ السَّمْعَ وَ الْبَصَرَ وَ الْفُؤَادَ كُلُّ اُولٰٓىِٕكَ كَانَ عَنْهُ مَسْـُٔوْلًا

যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পিছে পড়ো না। জেনে রেখো, কান, চোখ হৃদয়- এর প্রতিটি সম্পর্কে  (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে। সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৩৬

আমাদের অনেকের মাঝেই একটি প্রবণতা খুব লক্ষ করা যায়। আমরা যা শুনি তাই বিশ্বাস করি এবং প্রচার করতে শুরু করি। যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন বোধ করি না। কোনো তথ্য বা সংবাদ বর্ণনা করার আগে যাচাই-বাছাই করা কর্তব্য। অন্যথায় মিথ্যা হওয়ার প্রবল আশংকা থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ

ব্যক্তি যা শুনে তা বর্ণনা করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪)

যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা বলতে থাকা কিংবা সে অনুযায়ী কর্মনীতি নির্ধারণ করতে থাকা চরম বোকামী। পরিণামে তা আক্ষেপের কারণ হয় এবং ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে। মহান আল্লাহ বলেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ جَآءَكُمْ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوْۤا اَنْ تُصِیْبُوْا قَوْمًۢا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوْا عَلٰی مَا فَعَلْتُمْ نٰدِمِیْنَ

হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়। -সূরা হুজুরাত (৪৯) : ৬

যে কথায় কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়টাই রয়েছে, বিশেষ প্রয়োজনে তা বলা যাবে। যেমন, বললে কারো গীবত হয়, না বললে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এমন কথা।

ক্ষতিকর ও অনর্থক কথা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। মুমিন তো ক্ষতিকর কথা বলতেই পারে না। এসব বলে মুমিন কেন জাহান্নামে যাবে? মুমিন তো অনর্থক কথা থেকেও বেঁচে থাকে। এজন্যে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-

وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ

যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ৩

বিজ্ঞজনের উক্তি-

في اللسان آفتان عظيمتان، إن خلص من إحداهما لم يخلص من الأخرى، آفة الكلام وآفة السكوت

‘যবানের দুটি বিপদ। কথার বিপদ ও চুপ থাকার বিপদ! একটি থেকে মুক্তি পেলেও অপরটি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।’

কখনো একটি আরেকটির চেয়ে বড় বিপদ হয়ে সামনে আসে। সত্য থেকে যে চুপ থাকে সেও তো অপরাধী। আর যে বাতিল কথা বলে সে আল্লাহর অবাধ্য, শয়তানের মুখপাত্র।

চলবে..............

7

ইনসাফ ভিত্তিক কর্মবণ্টন ও শরীয়ত অনুযায়ী আমলের গুরুত্ব

বর্তমান যামানায় প্রায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানই কর্মীদের এবং লিডারদের মাঝে সম্পর্কের ঘাটতি, ঈর্ষাকাতরতা এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। এর একটি কারণ যেমন, পৃথিবীতে আল্লাহর ভয় কমে যাচ্ছে। ঠিক তেমনিভাবে এর একটি বড় কারণ, পরামর্শের মাধ্যমে কার্য বণ্টন এবং কর্মপন্থা নির্ধারণ না করা বলে আমি মনে করি।

রাসূল (সা.)এর একটি অভ্যাস ছিল যে, সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করে প্রত্যেকের অবস্থা ও সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ বণ্টন করতেন এবং নিজের যিম্মায়ও কিছু কাজ নিতেন।

প্রসিদ্ধ আছে যে, এক সফরে রাসূল (সা.) লাকড়ি কুড়ানোর কাজ নিজের যিম্মায় নিলেন। পরস্পর পরামর্শের মাধ্যমে কাজ বণ্টন করার মাঝে অনেক উপকারিতা রয়েছে। এর দ্বারা কাজ সহজ এবং দ্রুত হয়। সাথিরা সন্তুষ্ট মনে কাজ করে। প্রত্যেকেই একে অপরের সাহায্যকারী হয়। অবিশ্বাস এবং মতবিরোধ থেকে সকলেই হিফাজতে থাকে। কাজের মাঝে বরকত হয়। কুর’আন ও হাদীসে এ বিষয়ের গুরুত্ব এবং তার উত্তম দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে বিদ্যমান।

সংঘাতপূর্ণ মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে মহান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত পথ ও মত অনুসরণ করতে হবে। এক আল্লাহর বিশ্বাস, তিনি জগতের সৃষ্টিকর্তা ও ইবাদতের মালিক এ কথা মেনে চলতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ কি বিচারকদের সর্বোচ্চ বিচারক নয়?’ বিচার দিনের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে মানুষের মাঝে বিচার ফয়সালার দায়িত্ব দিয়ে কিতাব সহকারে হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-‘আমি আপনাকে কিতাব সহকারে প্রেরণ করেছি এ জন্য যে, আপনি মানুষের মাঝে সত্যিকার বিচার করবেন, আল্লাহ যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন ঠিক সেভাবে। আর আপনি খিয়ানতকারীদের পক্ষে বাদানুবাদ করতে যাবেন না। সূরা নিসা, আয়াত: ১০৫

পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনে সঠিক পন্থা অবলম্বন করে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হয়,তা হাতে কলমে শিখিয়েছেন । তিনি নিজের কারণে কখনো কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি। নিজের কারণে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ নেননি। কেবল জনগণের জন্যই অপরাধীর উপর দন্ড কার্যকর করেছেন। জয়নাব বিনতে হারিস নামক খাইবারের ইহুদী মহিলা নবীজিকে হত্যা করার মানসে ছাগল ভুনা করে বিষ মিশ্রিত করে তাঁর নিকট হাদিয়া প্রেরণ করেছিল। সাথে সাথে এ বিষের ক্রিয়া নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সহচররা টের পেলেন। সাহাবীরা তরবারি উঁচিয়ে মহিলার দিকে ধেয়ে আসলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মহিলাকে রক্ষা করেন। তাকে কোন শাস্তি দিলেন না। পরবর্তীতে যখন বিশিষ্ট সাহাবী বিশর ইবনে বারা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিষক্রিয়ায় ইন্তেকাল করলেন, তখন এ হত্যাকান্ডের শাস্তি সরূপ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন। সূরা আলে ইমরান,আয়াত: ১০৩

আমরা যদি প্রিয় নবীর হাতে গড়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র মদীনাতুর রাসূলের দিকে অবলোকন করি তবে বলা যায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত- জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সমাজে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে। যথা-

১. ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া: ভ্রাতৃত্ব হচ্ছে ফুল ও পল্লবে শোভিত এক বরকতপূর্ণ বৃক্ষ, নানাভাবে নিরবধি যা ফলদায়ক। ভ্রাতৃত্বের মৌল ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসা। ইরশাদ হচ্ছেঃ “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো : তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতি সঞ্চার করেন, ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে।” এ প্রসঙ্গে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে যে কল্যাণ নিজের জন্য পছন্দ করে, তার অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে। সহিহ বুখারী; সহিহ মুসলিম

২. প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান ও দয়া প্রদর্শন করা: বিতর্ক করতে হবে সত্য প্রকাশ ও মানুষের প্রতি দয়া-মমতার জন্য। প্রতিপক্ষকে হীন করার উদ্দেশ্যে কিংবা মুর্খ বলার জন্য নয়। মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘‘আর রাহমানের বান্দা তারাই যারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে তখন বলে ‘সালাম।’’ তাই নবীজিকে হত্যার জন্য হাজার বার যারা চেষ্টা করেছিল বরাবরই তাদের সবাইকে তিনি ক্ষমা করে দিয়ে প্রতিপক্ষের সাথে আচরণের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

৩. কারো ওপর জুলুম-অবিচার না করা: যার যা প্রাপ্য তাকে তা না দেয়া হলো জুলুম। এটা ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাৎ, শারীরিক আক্রমণ বা সম্মানহানির মাধ্যমেও হতে পারে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অন্যায় বলে বিবেচিত। আল্লাহর হক আদায় না করলে আল্লাহ ক্ষমা করলেও বান্দার হক বিনষ্টকারীকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না যার ওপর জুলুম করা হয়েছে, সে ক্ষমা করে দেয়। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “হে আমার বান্দা! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের জন্যও একে হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’’ সূরা ফুরকান,আয়াত:৬৩

৪.সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজের নিষেধ করা : এটা সমাজ সংস্কার ও সংশোধনের অনন্য মাধ্যম। এর মাধ্যমে সত্যের জয় হয় এবং মিথ্যা ও বাতিল পরাভূত হয়। যে ব্যাক্তি আন্তরিকতা ও সততার সাথে এ দায়িত্ব পালন করে তার জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার ও মর্যাদাপূর্ণ পারিতোষিক। ইরশাদ হচ্ছে, “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা সৎকাজের প্রতি আহ্বান করবে, নির্দেশ করবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হলো সফলকাম।” সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪

৫. ইনসাফ করা : ইসলামের পরিভাষায় ইনসাফ হচ্ছে কোনো বস্তু তার হকদারদের মধ্যে এমনভাবে বণ্টন করে দেয়া যাতে কারও ভাগে বিন্দুমাত্র কম বেশি না হয়। বসুন্ধরার বুকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার কায়েম নিয়ে আসে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও শান্তির ফল্গুধারা। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জিন্দেগীর সকল পর্যায়ে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে ইসলাম সমধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। এমনকি মুসলমানদের সাথে কাফিরদের লেনদেন ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইনসাফের নীতিতে অবিচল থাকতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দন্ডায়মান হও। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রু তা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জন করতে কোনোভাবেই প্ররোচিত না করে। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” সূরা মায়েদা, আয়াত: ৮

৬. দ্বীনী শিক্ষা অর্জন ও প্রচার-প্রসার : দুনিয়ার নিযাম ও ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার জন্য যেমন জাগতিক শিক্ষার প্রয়োজন তেমনি দ্বীনের হিফাজতের জন্য এবং দুনিয়ার সকল কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক করার জন্য দ্বীনী শিক্ষার প্রয়োজন। কুরআন-সুন্নাহর চর্চা ও অনুসরণের অভাব হলে সমাজের সকল অঙ্গনে দুর্নীতি ও অনাচার দেখা দেয়। দেখা দেয় অশান্তি। শিক্ষিত মানুষ পথভ্রষ্ট হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমাজ যতই উন্নতি লাভ করুক ঈমান ও খোদাভীতি না থাকলে তা মানুষের ক্ষতি ও অকল্যাণে ব্যবহৃত হয়। মানুষের সকল আবিষ্কারকে অর্থপূর্ণ ও কল্যাণমুখী করার জন্যই অপরিহার্য প্রয়োজন ইলমে ওহীর চর্চা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘আল্লাহ তা’আলা যাকে প্রভূত কল্যাণ দিতে চান তাকে দ্বীনের প্রজ্ঞা দান করেন।’’ সহীহ বুখারী, ১/৬

৭. আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা পোষণ করা : শত্রু-মিত্রের বিচার না করে সব মানুষ যদি সঠিক পথের অনুসারী হতো তবে হক্ব-বাতিল, ঈমান-কুফর, আল্লাহর বন্ধু এবং শয়তানের বন্ধুর মাঝে কোনো পার্থক্য থাকতো না। তাই বন্ধু নির্বাচন ও শত্রু তা পোষণ আল্লাহর জন্য হওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “ঈমানের অধিকতর নিরাপদ বন্ধন হলো আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্য শত্রু তা। সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস : ৪৫৯৯

৮. জবাবদিহিতার মানসিকতা থাকা :মানুষকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথভাবে পালন করতে হবে। বিভিন্ন কাজকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশের উপযুক্ত তত্ত্ব-তথ্য, আয়-ব্যয়, হিসাব-নিকাশ ও লেনদেনকে সুস্পষ্টভাবে জানার জন্য উন্মুুক্ত করাই হলো স্বচ্ছতা। ইহকালীন ও পারলৌকিক উভয় জগতে জবাবদিহিতা রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘অন্তত যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে (জবাবদিহি) ভয় করে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’’ সূরা নাজিয়াত, আয়াত: ৪০

এই জন্য আমাদেরও পরামর্শের গুরুত্ব বুঝে এর উপর আমল করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাহায্য করুন এবং সমস্ত অকল্যাণ থেকে হিফজত করুন। আমিন!


8

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে কর্তব্যবোধ ও ইখলাস থাকা গুরুত্বপূর্ণ


দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব: আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে, তিনি আমাদেরকে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের খিদমত করার সুযোগ দিয়েছেন। আমাদের নিজেদের দায়িত্বের প্রতি চিন্তা করা উচিত। গুরুত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করলে কাজের মাঝে বরকত আসে। একটা হচ্ছে চাকুরীর জন্য ডিউটি পালন, অপরটি হচ্ছে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা। এই দু’টির মাঝে পার্থক্য আছে। চাকুরীতে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট রুল মেনে কাজ করা হয়। কিন্তু যখন আপনি এটিকে দায়িত্ব হিসেবে নেবেন, তখন সেটা পালনের ক্ষেত্রে আপনার চেষ্ঠা থাকবে সর্বাত্মক।

নির্ধারিত সময়ের কাজ সময়ে না করলে বা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলে, পরে আর সেই কাজের কোন উদ্দেশ্য থাকে না। আর ‘দায়িত্ব’ সময় দেখে না। কাজের চিন্তা করতে থাকে। যাদের দায়িত্ব পালন করার অনুভূতি থাকে, তারা সর্বদা চেষ্ঠা চালিয়ে যেতে থাকে। তারা অযুহাত দেয় না। তারা সর্বদা তাদের অন্তরকে কাজের মাঝে লাগিয়ে রাখেন।

প্রতিষ্ঠানের কাজ দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে না হওয়ার গুরুত্ব: শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহের (শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দ্বীনি জযবার অবনতি, প্রতিটি কাজে জাগতিক লাভের চিন্তা) অবস্থা দেখে এমন মনে হয় যে, এক যামানা আসবে যে, কোন মানুষকে সালাম দিলেও বলবে টাকা দাও তবে উত্তর দেব। অন্যথায় উত্তর দেব না। (উদ্দেশ্য এই যে, প্রত্যেক বিষয়ে বিনিময়ের প্রতি মানুষের মনোযোগ থাকবে। যা জ্ঞান ও ইলমের শান নয়। এই উদ্দেশ্যও হতে পারে যে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে সালাম এবং পরস্পর মুহাব্বতের চর্চা হারিয়ে যাবে। তাই এই সমস্ত সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সুদূরপ্রসারী চিন্তা থাকা উচিত। বাকীটা মহান সৃষ্টিকর্তা ভালো জানেন)।

প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার গুরুত্ব: প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কর্মীর উচিত, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের উপর প্রাধান্য দেয়া। নিজের সত্ত্বাকে দেখবে না। নিজের সত্ত্বার কী ভরসা আছে? আজ আছে তো কাল নেই। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান তো একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, যা সর্বদা দায়েমী থাকবে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করবে তো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান উন্নতি হবে এবং প্রতিষ্ঠানের উত্তর উত্তর সাফলু আসবে। সুনাম হবে।

ইখলাসের গুরুত্ব: আমাদের সকলেরই প্রতিষ্ঠানের জন্যও কিছু কাজ করা উচিত। নিজের জন্য ও দুনিয়ার জন্যই সব কাজ না করা চাই। ইখলাস বিহীন কোনো কিছুই আসমানি দরবারে কবুলযোগ্য নয় বরং কখনো এমন আমল বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পার্থিব মোহ ও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণের যাবতীয় লোভ থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ পাকের জন্য সমর্পিত আত্মার সামান্য আমলও ইখলাসের কারণে অনেক বেশি মূল্যবান।

চারিদিকে সৌজন্যের ছড়াছড়ির এমন অস্থির সময়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি সাধারণ উদাসীনতা আমাদের সবার জন্য বড়ই বেমানান। “সারা জীবন তো অভিজ্ঞতা, ধোকা-বাজী ও চাপাবাজী করেই পেট পুষলাম। হায় আফসোস!” আল্লাহ আমাদের এসব কাজকর্ম থেকে হেফাজত করুন।

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে করণীয়: বছরের শুরুতেই সকলে একত্রে বসে হিসাব-নিকাশ করে নেবে যে, গত বছর আমাদের কী কী ভুল-ত্রুটি হয়েছে, যেগুলোর প্রতি আমরা লক্ষ্য রাখতে পারিনি। সে ভুলগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে পরস্পরে আলোচনার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসা। এবং বছরের শুরুতেই সেগুলোকে পরিশূদ্ধ করার চেষ্টা করা। ইন্শাআল্লাহ্! প্রতিষ্ঠানের নেযাম ঠিক হয়ে যাবে।

9

শিক্ষনণীয় গল্প

এক স্বর্ণকারের মৃত্যুর পর তার পরিবারটা বেশ সংকটে পড়ে গেলো, খাদ্য-বস্ত্রে দেখা দিল চরম অভাব!

স্বর্ণকারের বিধবা স্ত্রী তার বড় ছেলেকে একটা হীরের হার দিয়ে বললো--এটা তোমার কাকার দোকানে নিয়ে যাও সে যেন এটা বেচে কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দেয়!

ছেলেটা হারটি নিয়ে কাকার কাছে গেল! কাকা হারটা ভালো করে পরীক্ষা করে বললো- বেটা, তোমার মাকে গিয়ে বলবে যে এখন বাজার খুবই মন্দা, কয়েকদিন পর বিক্রি করলে ভাল দাম পাওয়া যাবে! কাকা কিছু টাকা ছেলেটিকে দিয়ে বললেন--আপাতত এটা নিয়ে যাও আর কাল থেকে তুমি প্রতিদিন দোকানে আসবে আমি কোন ১দিন ভাল খদ্দোর পেলেই যেন তুমি দৌড়ে হার নিয়ে আসতে পার তাই সারাদিন থাকবে!

পরের দিন থেকে ছেলেটা রোজ দোকানে যেতে লাগলো! সময়ের সাথে সাথে সেখানে সোনা-রুপা-হীরে কাজ শিখতে আরম্ভ করলো!

ভাল শিক্ষার ফলে অল্প দিনেই খুব নামি জহুরত বনে গেল! দূর দূরান্ত থেকে লোক তার কাছে সোনাদানা বানাতে ও পরীক্ষা করাতে আসত। খুবই প্রসংশীত হচ্ছিল তার কাজ!
একদিন ছেলেটির কাকা বললো--তোমার মাকে গিয়ে বলবে যে এখন বাজারের অবস্থা বেশ ভালো, তাই সেই হারটা যেন তোমার হাতে দিয়ে দেন! এখন এটা বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে!

ছেলেটি ঘরে গিয়ে মায়ের কাছ থেকে হারটি নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো যে এটা একটা নকল হীরের হার! তাই সে হারটা আর কাকার কাছে না নিয়ে বাড়িতেই. রেখে দিলো!
কাকা জিজ্ঞেস করলো-- হারটি এনেছো ?ছেলেটি বললো-- না কাকা পরীক্ষা করে দেখলাম এটা একটা নকল হার!

তখন কাকা বললো- তুমি যেদিন আমার কাছে হারটি প্রথম নিয়ে এসেছিলে সেদিন আমি দেখেই বুঝে নিয়েছিলাম যে এটা নকল, কিন্তু তখন যদি আমি তোমাকে এই কথাটা বলে দিতাম, তাহলে তোমরা হয়তো ভাবতে যে আজ আমাদের মন্দা সময় বলেই কাকা আমাদের আসল জিনিষকে নকল বলছে!

আজ যখন এ ব্যাপারে তোমার পুরো জ্ঞান হয়ে গেছে, তখন তুমি নিজেই বলছো এটা নকল হার!

এই দুনিয়াতে প্রকৃত জ্ঞান ছাড়া তুমি যা কিছু দেখছো যা কিছু ভাবছো সবটাই এই হারের মতই নকল মিথ্যে!

জ্ঞান ছাড়া কোন জিনিসের বিচার সম্ভব নয়! আর এই ভ্রমের শিকার হয়েই অনেক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়! তোমাদের সাথে আমার সেই সম্পর্কটা নষ্ট হোক আমি তা চাইনি!
-সংগ্রহিত পোস্ট!

10

সব কাজের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল


ইখলাস ও নিয়তের গুরুত্ব ইসলামে অপরিহার্য। নিয়ত ছাড়া কোনো আমলই মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশুদ্ধ নিয়ত ইখলাস সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের হাদীসে সতর্ক করা হয়েছে। হাদীসের পাতা থেকে ইখলাসের কতোগুলো হাদীস তুলে ধরা হলো।

সবকাজে ইখলাস ও নিয়তের পরিশুদ্ধতা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

عمر بن الخطاب رضي الله عنه على المنبر قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : ( إنما الأعمال بالنيات وإنما لكل امرىء ما نوى فمن كانت هجرته إلى دنيا يصيبها أو إلى امرأة ينكحها فهجرته إلى ما هاجر إليه) رواه البخاري والمسلم
 
অর্থ : ‘নিশ্চয় সমস্ত আমলের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং প্রত্যেক মানুষ (পরকালে) তাই পাবে যা সে নিয়ত করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তার রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করে, তার হিরজত আল্লাহ এবং তার রাসূলের উদ্দেশেই হবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়া হাসিলের কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে হিজরত করে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।’ (বুখারি হাদিস নং ৫২)

এই হাদিসের সঙ্গে একটি ঘটনাও উল্লেখ করা হয় যে, যখন মুসলমানরা মক্কার কাফের সম্প্রদায়ের দেওয়া জুলুম নির্যাতন আর কষ্ট সহ্য করতে পারছিলো না, তখন মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হিজরত করে। সবার উদ্দেশ্য ছিল মদীনায় সহজভাবে মহান আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) আনুগত্য করা যাবে তাই হিজরত করে মদীনায় গমন করেন। কিন্তু তাদের মাঝে একজন লোক এই কারণে হিজরত করে যে, হিজরতকারীদের মাঝে একজন মহিলা ছিল ওই মহিলাকে বিয়ে করার জন্য সকলের সঙ্গে হিজরত করে। এই কথা রাসূল (সা.) জানার পর তিনি বলেন- যে আল্লাহ ও তার রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করেছে তার হিজরত সেই হিসাবেই গন্য হবে, অর্থাৎ তার উত্তম বিনিময় পাবে। আর যে দুনিয়া লাভ বা কোনো নারীকে বিয়ে করা হিজরত করেছে, তার হিজরতও সেই ভাবেই গ্রহণ করা হবে; পরকালে তার কোনো উত্তম বিনিময় থাকবেনা।

ইখলাস ব্যতীত কোনো কিছুই কবুল হয় না

হজরত আবু উমামা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- 

عن أبي أمامة رضي الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن الله لا يقبل من العمل إلا ما كان له خالصا وابتغي به وجهه، رواه النسائي

অর্থ : ‘আল্লাহ তায়ালা সমস্ত আমলের মধ্যে শুধু সেই আমলটুকুই কবুল করেন, যা ইখলাসের সঙ্গে শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য-ই করা হয়।’ (নাসাই শরীফ হাদীস নং ৩১৪২।)

এখানে আরবি ব্যাকরণিক যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তা ওই সমস্ত স্থানে ব্যবহার করা হয়, সেখানে সীমাবদ্ধতার প্রয়োজন। একমাত্র তার আমলই কবুল হবে যে ‘ইখলাস’ এর সঙ্গে করেছে। আমল কবুল হওয়ার বিষয়টি ইখলাসের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মানুষ প্রচুর আমল করতে পারে, কিন্তু কবুলের প্রশ্ন আসবে ওই সমস্ত আমলে যেখানে ইখলাস আছে। যে আমলে ইখলাস নেই তাতে কবুলেই প্রশ্নই আসবে না। কারণ কবুল শুধুমাত্র ওই আমলের সঙ্গে খাস করে দেওয়া হয়েছে যেখানে ইখলাসের ভারি উপস্থিতি আছে।

বুখারির এক হাদিসে আছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কাল কিয়ামতের ময়দানে একজন শহীদ দাতা ও আলেমকে তাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাস করবেন। তখন এদের সবাই নিজ নিজ আমল দান-সদকা আল্লাহর রাস্তায় কোরবানসহ যতপ্রকার আমল আছে সব উল্লেখ করবে, আর বলবে হে পরওয়াদেগার এই আমলগুলো করেছি। তখন মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলবেন তোমরা মিথ্যা বলছো। তোমরা ওই সব আমল করেছিল দুনিয়ায় খ্যতি অর্জন করার জন্য, সুনাম আর প্রসিদ্ধির জন্য, লোক মুখে তোমাদের নাম প্রচার হওয়ার জন্য। তোমরা তা দুনিয়ায় পেয়েছো। এরপর আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষিপ করার জন্য ফেরেস্তাদের ডাকবেন। ফেরেস্তারা তাদেরকে পায়ে শিকল পয়ে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।

মহান আল্লাহ শুধু মানুষের অন্তর দেখেন অন্য কিছু নয়

একজন মানুষ জানে না অপর মানুষের আমলগুলোর কি উদ্দেশ্য। কারণ আমলগুলোর উদ্দেশ্য অন্তরে লুক্কায়িত থাকে। মহান আল্লাহ সেই অন্তরই দেখেন। সেই কথা রাসূল (সা.) তার এক হাদিসে বলছেন। হজরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن الله لا ينظر إلي صوركم وأموالكم ولكن ينظر إلى قلوبكم وأعمالكم رواه المسلم

 অর্থ : ‘আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক আকার আকৃতি এবং ধন-সম্পত্তির দিকে দৃষ্টিপাত করেন না, বরং তিনি দৃষ্টিপাত করেন শুধু তোমাদের অন্তর আমলের দিকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৫৪৩)

এই হাদিস দ্বারা বুঝা গেল কোন হুজুর কোন আমল করলো, কোন ইমামসাব কোন আমল করলো, কোন রিক্সা চালক কোন আমল করলো কিভাবে করলো, তা ধর্তব্য নয়, ধর্তব্য হলো কার অন্তরের অবস্থা কি? কার আমলের নিয়ত রয়েছে মহান আল্লাহর জন্য, কার আমলের নিয়ত রয়েছে অন্য কারো জন্য।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকেই আরো একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إنما يبعث الناس على نياتهم، رواه ابن ماجة

অর্থ : ‘নিশ্চয়ই (কিয়ামত দিবসে) মানুষেদেরকে উঠানো হবে তাদের ইখলাসের ওপর।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস  নং ৪২২৯)

অন্যকে দেখানো উদ্দেশ্যে আমল করা শিরক

হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- 

عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن يسير الرياء شرك، رواه ابن ماجة

অর্থ : ‘রিয়া (লোক দেখানো উদ্দেশ্যে আমল করা)- এর সামান্য পরিমাণও ‘শিরক’। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪৫৫)

আমলের মাঝে যদি মহান আল্লাহ ব্যতীত কারো নিয়ত থাকে তাহলে তা হবে শিরক ও কুফরির নামান্তর। শিরক কাকে বলে? শিরক বলে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক মনে করা, বা আল্লাহর গুণে কাউকে গুনান্বিত করা। যে অন্যকে দেখানোর জন্য আমল করলো সে শিরক করলো অর্থ সে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করলো। কত বড় হুমকির কথা। আর শিরকের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘শিরক আল্লাহ কখনো মাফ করেন না।’ (সূরা: নিসা)

শুধু আমল নয় লোক দেখানো উদ্দেশ্যে দান করাও শিরক। হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

عن شداد بن أوس رضي الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من تصدق يرائي فقد أشرك، رواه أحمد

অর্থ : ‘যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করলো সে শিরক করলো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ৪৫৫)।

শুধু দান করাও নয়, লোক দেখানো উদ্দেশ্যে কাপড় পরিধান করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত, যার কারণে মহান আল্লাহ তাতে কিয়ামতের দিন আগুন ধরিয়ে দিবেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من لبس ثوب شهرة في الدنيا، ألبسه الله ثوب مذلة يوم القيامة ثم ألهب فيه نارا، رواه ابن ماجة 

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে রিয়া ও শাহওয়াতের পোশাক পরিধান করবে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে অপমানের পোশাক পরিধান করাবেন, অতপর তাতে আগুন ধরিয়ে দিবেন।’ (সুনানে ইবনে মাযাহ, হাদিস নং ৩৬০৭)।

ইখলাসের সঙ্গে আমল করার ফজিলত

হজরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ( مَا قَالَ عَبْدٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ قَطُّ مُخْلِصًا إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ 

অর্থ : ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইখলাসের সঙ্গে কালিমা لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ পড়ে তবে তার জন্য আকাশের দরোজাসমূহ খুলে দেয়া হয়।’ (তিরমিযি, হাদিস: ৬৮)

হজরত সাওবান রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 

عن ثوبان رضي الله عنه قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم : طوبى للمخلصين اولئك مصابيح الدجى، تتجلى عنهم كل فتنة ظلماء

অর্থ : ‘তোমরা মুখলিসদেরকে (ইখলাসের সঙ্গে আমলকারীদেরকে) সুসংবাদ দাও। কেননা তারা অন্ধকারে প্রদীপস্বরূপ। তাদের দ্বারা সকল ফেৎনার অন্ধকার দূর হযে যায়।’ (বায়হাকী, হাদিস নং ৩৪৩)

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ যেন আমাদেরকে আমাদের সব কাজ ইখলাসের সঙ্গে করার তৌফিক দান করেন। আল্লাহুম্মা আমিন।


11

শোকার্ত ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দেবো

জাফর ইবনু আবী তালিব (রাঃ) মূতার যুদ্ধে গেলেন। যুদ্ধ শেষে সবাই বাড়ি ফিরে আসছিলেন। জাফরের স্বী আসমা ভাবলেন, তাঁর স্বামীও ফিরে আসবেন যুদ্ধ থেকে। তাই তিনি রুটি বানালেন। ছেলে-মেয়েদের গোসল করিয়ে নতুন জামা পরালেন। তাদের মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দিলেন। আর অপেক্ষা করতে লাগলেন জাফরের জন্য।

এমন সময় নবি (সাঃ) এলেন জাফরের বাড়িতে। নবিজিকে দেখে জাফরের ছোট ছেলে-মেয়েগুলো দৌড়ে এল। নবিজি তাদের জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন। কিন্তু আসমা দেখলেন, নবিজির চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে! এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেলেন আসমা। তিনি বললেন, ‘আপনি কাঁদছেন কেন? কোনো দুঃসংবাদ আছে?’ নবিজি বললেন, “হ্যা! জাফর শহীদ হয়েছে!” একথা শুনে আসমা কাঁদতে লাগলেন। মায়ের কান্না দেখে ছোট বাচ্চারা চুপ হয়ে গেল। প্রতিবেশী মহিলারা এসে আসমাকে সান্ত্বনা জানাতে লাগল। নবিজি বাড়ি ফিরে তাঁর স্ত্রীদের বললেন, “তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খাবার বানাও। আজ ওদের দুঃখের দিন।”

বন্ধুরা, মুমিনের দুঃখে সান্ত্বনা দেওয়া অনেক সাওয়াবের কাজ। তাই নবিজি সেদিন জাফর ইবনু আবী তালিবের বাড়িতে গিয়েছিলেন সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। নবি (সাঃ) বলেন, “যে মুমিন অন্য মুমিনের দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামাতের দিন তাঁকে জান্নাতের পোশাক পরাবেন।”

কথা বলব সুন্নাহ মেনে

১। হাই বা হ্যালো নয়;
বলবে,
আস-সালামু আলাইকুম
২। ‘থ্যাংক ইউ’ বা ‘ধন্যবাদ’ নয়;
 বলবে,
জাযাকাল্লাহ খাইরান!
মানে, আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দিন!
৩। ‘বাই! ভালো থেকো!’ বলবে না।
 বলবে,
ফী আমানিল্লাহ
আল্লাহ হাফেজ
আল্লহর নিরাপত্তায় থাকো!
আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুন!
৪। ‘বাহ, বাহ! ওয়াও!’ বলে কী লাভ?
বরং সুন্দর ও আশ্চর্যজনক কিছু দেখলে বলবে, সুবহানাল্লাহ!
৫। ‘ওকে, ঠিক আছে’ না বলে
বলবে,
ইনশা আল্লাহ!
৬। বেশি বেশি আলহামদুলিল্লাহ বলবে,
তুমি কেমন আছ?
আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি!

রাস্তায় বসারও আদব আছে

একদিন নবি (সাঃ) দেখলেন কয়েকজন সাহাবি রাস্তায় বসে কথাবার্তা বলছেন। তিনি বললেন, “তোমরা রাস্তায় বসা ছেড়ে দাও।” সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল, এখানে বসা ছাড়া আমাদের আর কোনো ঊপায় নেই। এটাই আমাদের বসার জায়গা। এখানেই আমরা কথাবার্তা বলি।’ নবিজি বললেন, “যদি রাস্তায় বসতেই হয়, তাহলে রাস্তার হক আদায় করবে।” তারা বললেন, ‘রাস্তার হক কী?’ তিনি বললেন,

১। কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।
২। দৃষ্টি নামিয়ে রাখা।
৩। সালামের জবাব দেওয়া।
৪। ভালো কাজে আদেশ করা।
৫। মন্দ কাজে নিষেধ করা।

আরেকদিন নবি (সাঃ) বলেন, “আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। লোকটি রাস্তা থেকে একটি কাঁটাওয়ালা ডাল সরিয়ে দিয়েছিল। এই কাজে খুশি হয়ে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং জান্নাত দিয়েছেন।”

সফরের আদব

১। সফরে যাওয়ার আগে বলবে, سُبْحَانَ الَّذِيْ سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَه مُقْرِنِيْنَ
“আল্লাহ এই বাহনকে আমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। তিনি মহাপবিত্র। (তিনি না চাইলে) আমরা একে অনুগত করার ক্ষমতা রাখি না।”
২। সফরে যাওয়ার আগে পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিদায় নেবে। ঋণ পরিশোধ করবে, আমানত ফিরিয়ে দেবে, কারও প্রতি জুলুম করলে মাফ চেয়ে নেবে। কারণ এ সফর থেকে তুমি নাও ফিরতে পারো!
৩। সফর থেকে ফেরার সময় বলবে, اٰيِبُوْنَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُوْنَ
“ফিরে আসছি, তাওবা করছি, ইবাদাত করছি আল্লাহর, প্রশংসাও করছি তার।”
৪। বৃহস্পতিবার সফরে বের হওয়া পছন্দনীয়, ভোরে রওনা দেওয়া উত্তম। দু’আ ও যিকরের সাথে পথ চলবে।
৫। নিরুপায় না হলে জুমু’আর দিনে সফর করা উচিত নয়। কারণ এতে অনেক সময় জুমু’আর সালাত ছুটে যায়।
৬। একসাথে কয়েকজন সফরে গেলে একজনকে আমীর বানিয়ে নেবে। দূরের যাত্রায় একাকী সফর করবে না, কুকুর ও ঘণ্টা নিয়ে সফর করবে না।
৭। অচেনা স্থানে বিশ্রাম নিলে এবং রাতে ঘুমালে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে। যে পথে হিংস্র প্রাণী ও বিষাক্ত কীটপতঙ্গ চলে, সেখানে ঘুমাবে না।
৮। সফর শেষে দ্রুত বাড়ি ফিরবে। ফেরার আগে বাড়ির লোককে জানিয়ে আসবে।
৯। মেয়েদের একা সফরে যাওয়া নিষেধ। সাথে মাহরাম-পুরুষ থাকতে হবে।

পথ চলব আদবের সাথে

১। বিনয়ের সাথে পথ চলবে। অহংকার করবে না, জাঁকজমক দেখিয়ে চলবে না। আল্লাহ বলেছেন, “রহমানের বান্দারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।” তুমিও তা-ই করবে।
২। দৃষ্টি নত করে রাখবে, বেপর্দা নারীদের দিকে তাকাবে না। মেয়েরাও পরপুরুষের দিকে তাকাবে না।
৩। পথে ময়লা-আবর্জনা ফেলবে না। পেশাব-পায়খানা করবে না। মানুষের কষ্ট হয় এমন কাজ করবে না।
৪। পথে কারও সাহায্য লাগলে সাহায্য করবে।যেমনঃ পথিককে পথ চিনিয়ে দেবে, অন্ধকে রাস্তা পার করে দেবে।
৫। মানুষকে সালাম দেবে, সালামের জবাব দেবে। সৎ কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজে বাধা দেবে, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেবে।
৬। নারী-পুরুষ মিলেমিশে পথ চলবে না। মেয়েরা চলবে রাস্তার কিনারা দিয়ে আর পুরুষরা চলবে মাঝখান দিয়ে।
৭। পথ চলবে মধ্যম গতিতে। একেবারে ধীরেও নয় আবার অতি দ্রুতও নয়।
৮। মেয়েরা মাহরাম ছাড়া একাকী পথ চলবে না। পর্দা করে মাহরামের সাথে বের হবে; যেমনঃ তোমার বাবা, আপন ভাই, চাচা, মামা।
৯। মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটা সুন্নত।



12

সাক্ষাৎ করব সময়মতো

ইবনু আব্বাস (রাঃ) ছিলেন জ্ঞান পিপাসু। হাদীসের খোঁজে বিভিন্ন মানুষের কাছে যেতেন তিনি। যেন তাদের মুখে নবিজির হাদীস শুনতে পারেন।

একদিন তিনি গেলেন এক ব্যক্তির বাড়িতে। কিন্তু ঘরের সামনে গিয়ে থেমে গেলেন। দরজায় কড়া নাড়লেন না। গায়ের চাদর বিছিয়ে সেখানেই শুয়ে পড়লেন তিনি! একসময় বাতাসের সাথে উড়ে আসা ধূলোবালি পড়তে লাগল ইবনু আব্বাসের মুখে। তবুও ইনবু আব্বাস সেখানেই শুয়ে রইলেন।

অনেকক্ষণ পর লোকটি বের হলো। দরজার সামনে ইবনু আব্বাসকে শুয়ে থাকতে দেখে সে খুব অবাক হলো। এরপর ইবনু আব্বাস তাকে জানালেন যে, তার কাছে তিনি হাদীস শুনতে এসেছেন।

বন্ধুরা, তখন ছিল দুপুরবেলা। বিশ্রামের সময়। তাই ইবনু আব্বাস দরজার কড়া নাড়েননি। অপেক্ষা করেছেন।

ফজরের আগে, দুপুরে এবং ইশার পর মানুষ বিশ্রাম নেয়। এই তিন-সময়ে কারও সাথে সাক্ষাৎ করতে যাবে না। এই  তিন-সময়ে অনুমতি ছাড়া বাবা-মা, ভাই-বোনের ঘরেও প্রবেশ করবে না। তুমি ছোট, তবুও অনুমতি নিতে হবে তোমাকে। এটাই যে আল্লাহর নির্দেশ!

অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাব

একটি ছেলে নবিজির সেবাযত্ন করত। ছেলেটি ছিল ইয়াহূদি। একবার সে অসুস্থ হয়ে গেল। নবি (সাঃ) তাকে দেখতে গেলেন। তিনি ছেলেটির মাথার কাছে বসে বললেন, “তুমি ইসলাম গ্রহণ করো” একথা শুনে ছেলেটি তার বাবার দিকে তাকাল। ছেলেটির বাবা তার কাছেই ছিল। বাবা বলল, ‘তুমি তাঁর কথা মেনে নাও।’ সাথে সাথে ছেলেটি ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবিজি খুশি হয়ে বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচালেন।”

কেউ অসুস্থ হলে নবিজি তাকে দেখতে যেতেন। নবিজি বলেছেন, “যে ব্যক্তি সন্ধ্যাবেলায় রোগী দেখতে যায়, তার সাথে ৭০ হাজার ফেরেশতা বের হয়। তারা ওই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে সকাল হওয়া পর্যন্ত। আর যে ব্যক্তি সকালে রোগী দেখতে যায়,তার সাথেও ৭০ হাজার ফেরেশতা বের হয়। তারাও ওই ব্যক্তির জন্য ক্ষমা চাইতে থাকে সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত।”

নবি (সাঃ) আরোও বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো রোগীকে দেখতে যায়, তার খোঁজ-খবর নেয় অথবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো মুসলিম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে, সেই ব্যক্তিকে ডাক দিয়ে বলা হয়, ‘তুমি খুশি হও! তোমার এই সাক্ষাৎ সুখময় হোক! আর তোমার ঠিকানা হোক জান্নাতের প্রাসাদ!’’’

রোগী দেখার আদব

১। রোগীর বিশ্রামের সময় তাকে দেখতে যাবে না। অবসর সময়ে যাবে।
২। রোগীর কাছে লম্বা সময় বসে থাকবে না। একটু দেখা করেই চলে আসবে। তবে রোগী চাইলে বেশি সময় থাকতে পারো।
৩। রোগী কষ্ট পায় এমন কথা বলবে না। রোগীকে কোনো দুঃসংবাদ দেবে না।
৪। রোগীর কষ্ট হলে তার সামনে হাসি-তামাশা করবে না, অযথা কথা বলবে না।
৫। রোগীর জন্য সুস্থতার দু’আ করবে। রোগী ও তার পরিবারকে সান্ত্বনা দেবে।
৬। রোগীকে আশা দেবে, সাহস জোগাবে। তাকে বলবে, ‘চিন্তা করো না, ভালো হয়ে যাবে, ইনশা আল্লাহ! আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করে দেবেন।’
৭। রোগীর কাছে অসুখের বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাইবে না। ডাক্তার বা চিকিৎসার সমালোচনা করবে না।
৮। নিজে ডাক্তার না হয়ে  রোগীকে এটা-ওটা খেতে বলবে না।
৯। রোগীর ব্যাপারে মন্দ ধারণা করবে না। আল্লাহর নবিরাও রোগে ভুগেছেন। রোগের কারণে মুমিনের গুনাহ মাফ হয়, মর্যাদা বেড়ে যায়।

13
Common Forum/Request/Suggestions / সাক্ষাতের আদব
« on: September 07, 2022, 05:00:42 PM »

সাক্ষাতের আদব

একবার এক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, ‘আল্লাহর রাসূল, কারও ভাই বা বন্ধুর সাথে দেখা হলে, সে কি তার সামনে মাথা ঝুঁকাবে?’ নবি (সাঃ) বললেন, “না!” সাহাবি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে কি তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে?’ তিনি বললেন, “না।” সাহাবি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে কি তার হাত ধরে মুসাফাহা করবে?’ তিনি বললেন, “হ্যাঁ!”

দুজন মুসলিম একসাথে মুসাফাহা করলে আল্লাহ তাদের দুজনকেই ক্ষমা করে দেন। যদি এই মুসাফাহা করা হয় একমাত্র আল্লাহর জন্য। তাই মুসলিম ভাইয়ের সাথে দেখা হলে প্রথমে সালাম দেবো। এরপর হাত মেলাব। এটাই মুসাফাহা করা। মানে একজনের হাতের তালুর সাথে আরেকজনের হাতের তালু স্পর্শ করা।

মুসাফাহা মানে কিন্তু ‘হ্যান্ডশেইক’ করা নয় বা হাত ঝাঁকানো নয়! মুসাফাহা করা সুন্নাহ। আর ‘হ্যান্ডশেইক’ করা অমুসলিমদের রীতি। তাই মুসাফাহার সময় হাত ঝাঁকাবে না। হাতে হাত ধরে কুশলাদি জিজ্ঞেস করবে। আগে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে না। যখন অন্যজন হাত ছেড়ে দেবে, তখন তুমিও ছেড়ে দেবে। নবিজিও তা-ই করতেন।

ওহ! আরেকটা কথা! মুসলিম ভাইয়ের সাথে দেখা করবে হাসিমুখে। নবিজি বলেছেন, “তোমার ভাইয়ের প্রতি মুচকি হাসাও সদাকা।”

দরজায় কড়া নাড়ার আদব

একদিন ইমাম আহমাদ বসে ছিলেন তাঁর ঘরে। হঠাৎ অনেক জোরে শব্দ হলো দরজায়। ইমাম আহমাদ দ্রুত বের হয়ে এলেন ঘর থেকে। আর বললেন, ‘বাড়িতে পুলিশ এসেছে নাকি!’

দেখা গেল পুলিশ নয়, এক মহিলা এসেছে তাঁর কাছে মাসআলা জানতে!

হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে মানুষ ভয় পেয়ে যায়। মনে হয় যেন বাড়িতে চোর-ডাকাত এসেছে অথবা পুলিশ এসেছে! তাই উচ্চ শব্দে কড়া নাড়া উচিত নয়।

সাহাবিরা কড়া নাড়তেন মৃদুশব্দে। নবিজির দরজায় টোকা দিতেন নখ দিয়ে। ঘরের বাইরে থেকে নাম ধরে ডাকাডাকি করতেন না।

তুমিও তা-ই করবে। কারও বাড়িতে গেলে প্রথমে টোকা দেবে দরজায়। কেউ কাছে থাকলে এটুকু শব্দই যথেষ্ট। আর যদি বুঝতে পারো দরজার কাছে কেউ নেই, তাহলে কড়া নাড়তে পারো। অথবা কলিং বেল চাপতে পারো। তবে হাতের তালু দিয়ে দরজায় ধাক্কা দেবে না। জেনে রেখো, “যে কাজে কোমলতা থাকে সেটি সুন্দর হয়।”, নবিজি বলেছেন। এভাবে তিনবার শব্দ করবে। প্রতিবার শব্দ করার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে। হয়তো ভেতরের লোক খাওয়া-দাওয়া করছে, ওজু-গোসল করছে কিংবা সালাত পড়ছে। তাই এতটুকু সময় অপেক্ষা করবে, যেন একজন ব্যক্তি চার রাকাআত সালাত শেষ করতে পারে!

তিনবার শব্দ করার পরেও সাড়া না পেলে আর দরজা ধাক্কাবে না। সেখান থেকে চলে আসবে।

নবি (সাঃ) বলেছেন, “তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরেও অনুমতি না পেলে চলে আসবে।”

না জানিয়ে দেখতে আসা

একবার একলোক বিশ্রাম নিচ্ছিল তার ঘরে। এমন সময় দেখা করতে এল এক বন্ধু। ঘরে-থাকা লোকটি তার ছেলেকে বলল, ‘তুমি বলে দাও, আমি বাসায় নেই!’ছেলেটি বলল, ‘আব্বু বলেছে, আব্বু বাসায় নেই!’

একথা শুনে বাইরে-থাকা-লোকটি বুঝে ফেলল, তার বন্ধু বাসাতেই আছে, কিন্তু সে মিথ্যা বলছে!
এতে সে রাগ করে চলে গেল। আর কিছুটা দুঃখও পেল। এভাবে দুজনের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে গেল।

তাই সরাসরি  বলে দেওয়াই ভালো, ‘কিছু মনে করো না। আমি এখন ব্যস্ত! পরে তোমার সাথে দেখা করব, ইনশা আল্লাহ।’

কাউকে চলে যেতে বললে তারও উচিত খুশি মনে চলে যাওয়া। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ‘ফিরে যাও, তাহলে ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্য বেশি পবিত্র’। (সূরা নূর, ২৮ নং আয়াত)

কাউকে না জানিয়ে দেখা করতে আসা ঠিক নয়। কারণ সবারই ব্যস্ততা থাকে। হয়তো ভাবছো, কীসের এত ব্যস্ততা! না! ব্যস্ততার কথা জানতে চাওয়াও ঠিক নয়।

পরিচয় দেবো নাম বলে

একদিন জাবির (রাঃ) এসে কড়া নাড়লেন নবিজির দরজায়। নবিজি (সাঃ) বললেন, ‘আমি!’ এই জবাব শুনে নবিজি অখুশি হলেন। তিনি বললেন, “আমি! আমি কে?” তাই সাহাবিরা দরজায় শব্দ করার পর নিজেদের নাম বলতেন। যেন ভেতরের লোক বুঝতে পারে কে এসেছে।

দরজার ওপাশ থেকে পরিচয় জানতে চাইলে নিজের পুরো নাম বলবে। কারণ একজনের সাথে আরেকজনের কন্ঠের মিল থাকে। তা ছাড়া এক-দু কথায় চেনাও যায় না। তাই শুধু ‘আমি’ বললে পরিচয় বোঝা কঠিন।

ইমাম হব না অতিথি হলে

একদিন মালিক ইবনু হুয়াইরিস (রাঃ) গেলেন তাঁর বন্ধুর বাড়িতে। সালাতের সময় তারা মসজিদে গেলেন। সালাতের ইকামাত দেওয়া হলো। তখন মুসল্লিরা ইমামতি করতে বললেন মালিককে। তিনি এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন বিনয়ের সাথে। আর বললেন, ‘আপনারা কেউ ইমামতি করুন!’

মালিক বললেন, ‘নবি (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা কারও সাক্ষাতে গিয়ে ইমামতি কোরো না। তাদের মধ্যেই কোনো ব্যক্তি যেন ইমামতি করে।” তাই কোথাও বেড়াতে গিয়ে নিজে থেকে ইমামতি করবে না।

জুতা খুলে সাজিয়ে রাখব

কারও বাড়িতে প্রবেশ করার সময় তাড়াহুড়া করবে না। বের হওয়ার সময়েও ধীরেসুস্থে বের হবে।

ময়লা জুতা নিয়ে ঘরে ঢুকবে না। জুতা খোলার আগে দেখবে, জুতায় কাদামাটি লেগে আছে কিনা। পাপোশ বা মাটিতে ঘষা দিয়ে জুতার তলা পরিস্কার করে নেবে। জুতা খোলার আদব খেয়াল রাখবে।

নবি (সাঃ) বলেছেন, “পরার সময় ডান পায়ের জুতা আগে পরবে, আর খোলার সময় বাম পায়ের জুতা আগে খুলবে।”

জুতা রাখার জায়গায় জুতা রাখবে। দরজার সামনে এলোমেলো করে ফেলে রাখবে না। অন্যের জুতার ওপর জুতা রাখবে না। নইলে তার জুতায় কাদামাটি ও ময়লা লেগে যাবে।

বসার আগে অনুমতি নেব

হাতিম তাঈ ছিলেন আরবের বিক্ষ্যাত দানশীন। তার ছেলের নাম আদি। আদি ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় এলেন। এরপর নবিজির সাথে দেখা করলেন। নবি (সাঃ) তাকে বসতে দিলেন গদিতে। আর নিজে বসলেন মাটিতে।

আদি বললেন, ‘আপনিই গদিতে বসুন!’ নবিজি বললেন, “না তুমি বসো!” আদি আবারও একই কথা বললেন। নবিজি বললেন, “না, তুমিই বসো।” শেষে গদির ওপরেই বসলেন আদি। গদিটি ছিল চামড়ার। ভেতরের ছিল খেজুর পাতা।

মেজবান যেখানে বসতে দেবে, মেহমানকে সেখানেই বসতে হবে। কারও বাসায় গিয়ে যেখানে-সেখানে বসবে না। ঘরের ভেতর চোখ পড়ে, এমন জায়গায়ও বসবে না।


14

সালাম দেবো আদব মেনে

করণীয়

মুখে হাসি রাখবে।
চেহারার দিকে তাকাবে।
সালামের পর হাতে হাত মিলিয়ে মুসাফাহা করবে।
স্পষ্ট আওয়াজে সালাম দেবে। কেউ শুনতে না পেলে সর্বোচ্চ তিনবার সালাম দেবে। এরপর থেমে যাবে।
অমুসলিমদের সালাম দেবে না, তবে কুশলাদি জিজ্ঞেস করবে।
আগে সালাম দেবে, এরপর অন্য কথা বলবে। যে আগে সালাম দেয়, তার অহংকার কম।
সাক্ষাতের শুরুতে ও শেষে সালাম দেবে।

বর্জনীয়

সালাম দেওয়া-নেওয়ার সময় মুখ ভার করে রাখবে না।
অন্যদিকে তাকিয়ে থাকবে না।
হাতের ইশারায় সালাম দেবে না। মাথা ঝুঁকাবে না। কুর্নিশ করবে না।
চিৎকার করে সালাম দেবে না। ‘আমি আপনাকে সালাম দিয়েছি’ এভাবে বলবে না!
পর্দা করতে হয় এমন নারী-পুরুষ একে অন্যকে সালাম দেবে না।
সালাম না দিয়ে কথা বলা শুরু করবে না।
সালাম না দিয়ে বিদায় নেবে না।

চলবে............

15
Common Forum/Request/Suggestions / সালামের আদব
« on: August 28, 2022, 01:25:10 PM »

সালামের আদব


নবি (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে আগে সালাম দেয়।”

আগে-আগে সালাম দিই


বাহনে-থাকা-লোক সালাম দেবে পায়ে-হাঁটা-লোককে।
পায়ে-হাঁটা-লোক সালাম দেবে বসে-থাকা-লোককে।
অল্প সংখ্যক লোক সালাম দেবে বেশি সংখ্যক লোককে।
বাইরে থেকে-আসা-লোক সালাম দেবে ঘরে-থাকা-লোককে।
ছোটরা সালাম দেবে বড়দেরকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর বিপরীত হলেও দোষের কিছু নেই। যেমনঃ নবিজি ছোটদের আগে সালাম দিতেন।
একসাথে অনেকে থাকলে, একজন জবাব দিলেই সবার সালামের জবাব হয়ে যায়।

যখন সালাম দেওয়া ঠিক নয় (মাকরুহ)

আযান-ইকামাতের সময়।
পেশাব-পায়খানা করার সময়।
মুখে খাবার থাকা অবস্থায়। যদি কথা বললে গলায় খাবার আটকে যাবার ভয় থাকে।
ইবাদাতরত অবস্থায়। যেমনঃ কেউ সালাত পড়ছে, কুরআন তিলাওয়াত করছে, যিকর করছে বা ওজু করছে।
খুতবা চলা অবস্থায় খতীবকে সালাম দেবে না। ক্লাস চলা অবস্থায় একে অন্যকে সালাম দেবে না। এতে সকলের মনোযোগ নষ্ট হয়।
দ্বীনি কাজে ব্যস্ত ব্যক্তিকে আগে সালাম দেবে না। যেমনঃ ইলমি গবেষণায় ব্যস্ত গবেষক (ফকীহ), বিচার কাজে ব্যস্ত বিচারক।
প্রকাশ্যে গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে আগে সালাম দেওয়া মাকরুহ। যেমনঃ যারা দাড়ি কামায়, বেপর্দায় চলাচল করে, নাচ-গান করে, নাটক-সিনেমা দেখে কিংবা সবার সামনে হারাম কাজ করে।

আলোচনাটি আবূ দাউদ-এর ৫১৯৭ এবং সহীহ বুখারী-এর ৬২৩৩ নং হাদীস অনুসারে সাজানো হয়েছে।


Pages: [1] 2 3 ... 10